সিলেটটুডে ডেস্ক | ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৫
গত ২৪ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের মিনায় 'শয়তান'কে পাথর ছুড়তে গিয়ে হুড়োহুড়িতে পদপিষ্ট হয়ে মারা গেছেন সহস্ত্রাধিক হাজি। ওই ঘটনার সময় জামারাতে পাথর ছুড়তে গিয়েছিলেন বাংলাদেশি হাজি আতাউর রহমান। তবে বড় কোনো অঘটন ছাড়াই রক্ষা পেয়েছেন সেদিনের বিভীষিকা থেকে।
সোমবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে তিনি সুস্থ অবস্থায় ফিরেছেন দেশে। কিন্তু মানিকগঞ্জের আতাউর রহমান নিরাপদে স্বজনের কাছে ফিরেও ফেলতে পারছেন না স্বস্তির নিঃশ্বাস, চোখের সামনে দেখা মিনা ট্র্যাজেডির দুঃসহ স্মৃতি এখনও তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে তাকে।
শুধু আতাউর রহমান নন, মিনা ট্র্যাজেডির বিভীষিকা এখনও দগদগে হয়ে আছে বাংলাদেশে ফেরা অধিকাংশ হাজির মনে। মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ফিরতি হজ ফ্লাইটে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরেছেন প্রায় সাড়ে ৪ হাজার হাজি। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন মিনার ভয়াবহতার প্রত্যক্ষদর্শী।
তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন সঙ্গে আলাপকালে প্রশ্ন তুলেছেন সৌদি প্রশাসনের অব্যবস্থাপনা নিয়ে।
অবশ্য মৃত্যুপুরী পেরিয়ে দেশে ফিরে এই হাজিরা শিকার হচ্ছেন নতুন অব্যবস্থাপনার। সৌদি এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে ১০-১২ ঘণ্টা বিলম্বে দেশে ফিরছেন হাজিরা। বিমানবন্দরে পৌঁছে ব্যাগেজ-লাগেজ তো দূরের কথা, পবিত্র নগরী থেকে পরিবারের সদস্যদের জন্য আনা জমজমের পানির বোতলও হাতে পাচ্ছেন না হাজিরা। দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তির ধকলে বাধ্য হয়ে মালপত্র না নিয়েই তারা ফিরছেন গন্তব্যে।
মঙ্গলবার ফিরতি ফ্লাইটে ঢাকায় অবতরণ করেন গাজীপুর জেলার শ্রীপুরের দমদমা গ্রামের হাজি আজিজুল ইসলাম। দুর্ঘটনার দিন তিনি ছিলেন মিনার এক কিলোমিটার এলাকার মধ্যে। হুড়োহুড়ি শুরু হওয়ার ঘণ্টাখানেক আগে 'শয়তানের স্তম্ভে' পাথর নিক্ষেপ করে ফেরেন তিনি। নিজে প্রাণে বাঁচলেও বিপুল সংখ্যক হাজির মৃত্যু কাতর করে তুলেছে তাকে। নিরাপদে দেশে ফিরে বিমানবন্দরেই হাত তুলে আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া আদায় করেন তিনি।
এদিন বিকেলে দেশে ফেরা হাজি মজিবুর রহমান ঘটনার দেড় ঘণ্টা আগে পাথর ছুড়ে ফিরে আসায় প্রাণে রক্ষা পান। ঘটনাস্থলের খুব কাছ থেকেও বেঁচে যাওয়া কয়েকজন হাজির সঙ্গে কথা হয়েছে তার। তাদের বরাত দিয়ে মজিবুর বলেন, জামারাত থেকে বের হওয়ার দুটি রাস্তা বন্ধ করে দেওয়ার কারণেই হুড়োহুড়ি হয়েছে বলে শুনেছি সে সময় ওখানে থাকা হাজিদের কাছে। তারা বলেছেন, রাস্তা খোলা থাকলে এ ঘটনা ঘটত না।
একই ফ্লাইটে দেশে ফিরেছেন রংপুর থেকে হজ করতে যাওয়া ৫৯ হাজির একটি গ্রুপ। এই গ্রুপের দুই হাজি আজাহারুল ইসলাম ও ইসমাইল হোসেন জানান, তাদের বেঁচে ফেরার কাহিনী। তারা জানান, হুড়োহুড়ির সময় তারা ছিলেন ঘটনাস্থলেই। সৌদি আরবের বাদশাহর ছেলে পাথর ছুড়তে যাওয়ায় গেট বন্ধ করে দিলে এ বিশৃঙ্খলা শুরু হয়। তখন মনে হয়েছিল এখান থেকে বেঁচে ফিরতে পারবেন না। প্রথমে মাটিতে পড়ে গেলেও নানা কসরত করে উঠে দাঁড়ান তারা। একটু এগোতেই আবারও ধাক্কা খেয়ে পড়ে যান। তবে শরীরের শক্তি দিয়ে আবারও উঠে দাঁড়ান এবং হুড়োহুড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন।
মানিকগঞ্জের আতাউর রহমান বেঁচে ফিরেছেন ভাগ্যের জোরে। তিনি জানান, পাথর ছুড়তে জামারাতের তৃতীয় তলায় তিনি অবস্থান করছিলেন ওই ঘটনার সময়। নিচের অমানবিক পরিস্থিতি দেখে ভয়ে তিন তলা থেকে নিজে তাঁবুর ওপর লাফ দিয়ে পড়ে জ্ঞান হারান। জ্ঞান ফেরার পর নিজেকে আবিষ্কার করেন হাসপাতালে।
প্রত্যক্ষদর্শী এসব হাজির একেকজনের অভিজ্ঞতা হয়েছে একেক রকম। তবে একবাক্যে তারা প্রত্যেকেই এই মর্মান্তিক ঘটনা ও প্রাণহানির জন্য দায়ী করেছেন সৌদি প্রশাসনের অব্যবস্থাপনাকেই।
প্রাণঘাতী ওই অব্যবস্থাপনা পাড়ি দিয়ে দেশে ফিরে হাজিরা পড়ছেন নতুন অব্যবস্থাপনার ধকলে।
বিমানবন্দর সূত্র জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের চেয়ে ১৫-১৬ ঘণ্টা বিলম্বে অবতরণ করছে অনেক হজ ফ্লাইট। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সহকারী ব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) তাছমিন আকতার বলেন, জেদ্দা হজ টার্মিনালে হাজিদের অস্বাভাবিক চাপ এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের বিশেষ নিরাপত্তাজনিত ব্যবস্থায় হাজিদের রিপোর্টিংয়ে দেরি হওয়ায় ফ্লাইট ছাড়তে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। আগামী দুই-একদিন এ অবস্থা অব্যাহত থাকবে। এরপর হজ ফ্লাইট স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে।
দেশে ফেরা হাজিদের দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তাদের স্বজনরা। বিমানবন্দরজুড়ে তৈরি হয়েছে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি। এর মধ্যে নতুন ভোগান্তি হিসেবে যুক্ত হচ্ছে লাগেজ নিয়ে জটিলতা। সৌদি এয়ারলাইন্সে ফেরত আসা হাজিরা জমজমের পানির বোতল পর্যন্ত পাচ্ছেন না হাতে। লাগেজে থাকা অন্যান্য সামগ্রীও নিতে পারছেন না স্বজনদের জন্য। এমনকি এসব লাগেজ কবে নাগাদ পাওয়া যাবে সে বিষয়েও সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য তাদের দিতে পারছে না বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। কনভেয়ার বেল্ট এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে তাই বাধ্য হয়ে লাগেজ ছাড়া বাড়ি ফিরছেন হাজিরা। হজ ও বিমান কর্তৃপক্ষের এমন অব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ডে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
উল্লেখ্য, এ বছর এক লাখ ৭ হাজার ২৯০ হজযাত্রীর মধ্যে বাংলাদেশ বিমানের ১৪০ ফিরতি ফ্লাইটে ৫৪ হাজার ৮৪৫ হাজির দেশে ফেরার কথা। এর মধ্যে নির্ধারিত ৩১ ফ্লাইটসহ ১০৯ বিশেষ ফ্লাইট রয়েছে। বাকি হাজিরা সৌদি এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে দেশে ফিরবেন বলে জানা গেছে।
সূত্র : সমকাল