সিলেটটুডে ডেস্ক | ১৮ মে, ২০২৬
এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর গালি শুনতে শুনতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন।
সোমবার রিপোর্টার্স ফোরাম ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসির (আরএফইডি) নবনির্বাচিত কমিটির অভিষেক ও বিদায়ী কমিটির সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করে।
সিইসি বলেছেন, মিটিং শেষ করে বাইরে গিয়ে আমাদের গালাগাল করেছেন তিনি (নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী)। তবে আমরা একদমই ক্ষুব্ধ নই। আমরা পাটওয়ারীর গালিতে অভ্যস্ত। আপনাদের কাছে নতুন হতে পারে। আমাদের কাছে না। তার কথা শুনতে শুনতে আমরা রেজিস্ট্যান্স হয়ে গেছি। তবে এটা রেয়ার কোয়ালিটি।
সিইসি বলেন, ‘যে নির্বাচন হয়েছে তার বিচারের ভার দেশবাসীর ওপরে। ওইটা মূল্যায়নে যাচ্ছি না। অতীতে সবাই একজনের পক্ষে বলতে বিপ্লবের পর্যায়ে নিয়ে এসেছে।’
তিনি বলেন, ‘আপনারা বসে ফয়সালা করুন। আমাদের পক্ষে শতভাগ স্বচ্ছতার আশ্বাস দিতে পারি। আমাদের বোঝার ঘাটতি হতে পারে। কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো ঘাটতি নেই।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘সবার সহযোগিতা ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব না। একবার বোরকা পরা মহিলারা এসেছিলেন ঘেরাও করতে। কারণ তারা ছবি না তুলে ভোটার হবেন। কাজেই এ নিয়ে আপনারা একটু কাজ করেন। কারণ মহিলাদের একটা অংশ এখনো ভোটার তালিকার বাইরে রয়েছে।’
সিইসি বলেন, ‘যেহেতু দলীয়ভাবে স্থানীয়ভাবে হবে না, এ জন্য বিধি-বিধান করতে হবে। এগুলো করে আমরা সরকারের সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ তাদেরও কিছু কাজ থাকে তো।’
তিনি বলেন, ‘১৩ কোটি ভোটার তো খুব কম দেশে আছে। ১৩ কোটি ভোটার আর ১০ লাখ ভোটার কি এক কথা? কিভাবে করলে এত সফল নির্বাচন। ইউএন ওমেন থেকে আমাদের এমন বলেছে।’
সিইসি বলেন, ‘বিপ্লবের পরে পুলিশসহ কোনো প্রতিষ্ঠান ফাংশন করেনি। কাজেই কেউ ফাংশন করবে না, কেবল নির্বাচন সুষ্ঠু হবে, এমন দাবি ছিল সবার। আমি যেখানে গেছি জনগণকে মোটিভেট করার চেষ্টা করেছি।’
তিনি আরও বলেন, কাজেই বিচারের ভার দেশবাসীর কাছে রইল। সর্বোপরি আল্লাহ তো বিচার করবেনই।
সিইসি স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেছেন, গণমাধ্যমে দেখছি, বিভিন্ন দল থেকে অলরেডি মনোনয়নের ঘোষণা দিচ্ছে। এটা আমার জন্য চিন্তার, আমার কপালে ভাঁজ পড়েছে। যদি ইনডিপেডেন্ট হয়ে যেত, পার্টির মালিকানা থাকত না, ওনারশিপ থাকত না, দলে দলে গোলমাল হত না। এজন্য মনে করি, দলগুলোর উচিত হবে নিজেরা বসে ফায়সালা করা; আমাদের সহায়তা থাকবে।
তিনি বলেন, শুধু জাতীয় নির্বাচন নয়, সব ধরনের নির্বাচনই ‘ভালো’ করতে হবে। ভালো নির্বাচনের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। আর ‘রক্তপাতহীন’ স্থানীয় সরকার নির্বাচন করতে রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা দরকার।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে আয়োজনের ক্ষেত্রে অন্তবর্তী সরকারের ‘পূর্ণ সহায়তার’ কথা তুলে ধরেন সিইসি বলেন, “স্থানীয় সরকারের নির্বাচন সামনে আসছে। প্রয়োজনীয় আইন-বিধি সংস্কার করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে দুটি রাজনৈতিক দলের নেতা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। রাজনৈতিক দলের সহযোগিতা ছাড়া কোনো নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্ভব হয় না।
“আমরাও দলের সহযোগিতা চাই। প্রয়োজনে আপনারা নিজেরা নিজেরা বসেন। একটা ফায়সালায় আসেন, আমরা রক্তপাত দেখতে চাই না। রক্তপাতহীন স্থানীয় সরকার নির্বাচন চাই।”
বাংলাদেশে স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে সহিংসতার যে ইতিহাস, সে কথা তুলে ধরে নাসির উদ্দিন বলেন, “অতীতে দেখা গেছে অনেক মার্ডার হয়, একই পরিবারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়, খুব স্বল্প ব্যবধানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়।”
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের বর্শা নিয়ে মারামারির প্রসঙ্গ টেনে সিইসি বলেন, “টেঁটা মেরে দুই পাড়ায় মারামারি হয়। এখন দুই পাড়ায় যদি প্রার্থী দাঁড়ায়, তাহলে কি হবে? কারবালা হয়ে যাবে। এ ধরনের সিচুয়েশনে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া করা উচিত, স্থানীয় নির্বাচনে কোনো ধরনের ঝামেলায় যাবে না।”
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ভালোভাবে আয়োজনের পর স্থানীয় নির্বাচনও ‘সুন্দরভাবে’ করে নির্বাচনি সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনতে চান এএমএম নাসির উদ্দিন।
তিনি বলেন, এক নির্বাচন ভালো হল। এটার মানে এ নয় যে বাংলাদেশের নির্বাচন সবসময় ভালো হবে। আমরা ভালো নির্বাচনের সংস্কৃতি চালু করতে চাই। শুধু একটা নয়, সব নির্বাচন ভালো হবে। নির্বাচনের ভালো সংস্কৃতি যেন গড়তে পারি, এজন্য দলগুলো নিজেরাও বসেন। আমরা চাই, সত্যিকার অর্থে শতভাগ ভালো একটা স্থানীয় নির্বাচন।
সরকারের মন্ত্রী, উপদেষ্টারা এ বছরের শেষে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন করার আভাস দিয়ে এসেছেন। এ বিষয়ে সিইসি বলেন, স্থানীয় নির্বাচন কবে হবে এখনও ফাইনাল হয়নি। নির্বাচন যেহেতু দলীয় প্রতীকে হবে না, আমাদের কিছু বিধিবিধান সংস্কার করতে হবে। এ নিয়ে কাজ শেষ করে আমরা সরকারের সঙ্গে বসব। সরকার তো চাই-ঘোষণা দিয়েছে এ বছরের মধ্যে শুরু করবে। এটার জন্য সময় লাগে।
অন্যদের মধ্যে জাতীয় সংসদের সরকার দলীয় হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, এনসিপির নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টার-বিজেসির চেয়ারম্যান ফাহিম আহমেদ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। আরএফইডির সভাপতি কাজী এমাদ উদ্দীন জেবেল ও সাধারণ সম্পাদক ইকরাম-উদ দৌলার নেতৃত্বাধীন নতুন নির্বাচিত কমিটি এ অনুষ্ঠানে দায়িত্ব গ্রহণ করে।
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীউদ্দীন পাটওয়ারী ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, আমি একজন প্রার্থী হিসেবে এই ইলেকশনে যেটা দেখেছি, আমি নির্বাচন কমিশনে ফোন দিয়েছিলাম। উনারা মামুনুল হকের আসনে একটা নির্দেশনা দিয়েছিল যে ব্যালট পেপারে বক্সের বাইরে যদি সিল পড়ে, সেটা কাউন্ট হবে না। কিন্তু আমার আসনে নির্দেশনা দিয়েছিল যে বক্সের বাইরে যদি সিল পড়ে, সেটা কাউন্ট হবে। সেখানে নির্বাচনের দিন ডিজিএফআই, এনএসআই এবং অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা থেকে শুরু করে কীভাবে ডিসি অফিসে নগ্নভাবে একটা ইলেকশনের ইঞ্জিনিয়ারিং করতে পারে, সেটা এই বাংলাদেশ দেখেছে। সে রিপোর্টগুলো আমরা বিভিন্ন জায়গায় ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিটির কাছেও দিয়েছি।
এর ‘বিচার’ দেশেই হবে মন্তব্য করে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, এ নির্বাচনে যারা নেতৃত্ব দিয়েছে, এর বিচার বাংলার মাটিতে আমরা করেব। আরেকটা গণঅভ্যুত্থান হলে প্রথমে নির্বাচন কমিশনে হাত দেব, যাতে আপাদমস্তকে পরিবর্তন করব, ফাস্ট টার্গেট হবে এটা।
পরে প্রধান অতিথির বক্তব্য দিতে গিয়ে সিইসি বলেন, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করেন উল্লেখ করেন। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর গালি শুনতে শুনতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন বলে মন্তব্য করেন।