Sylhet Today 24 PRINT

‘স্বৈরাচার’ বিতাড়িত হওয়ার পর একটি ‘গুপ্ত বাহিনী’ ধীরে ধীরে আত্মপ্রকাশ করেছিল: প্রধানমন্ত্রী

যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর নৈশভোজ

সিলেটটুডে ডেস্ক |  ২১ জুলাই, ২০২৬

যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতভিন্নতা থাকতে পারে, তবে ‘কোনো বিভেদ নেই’ বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, স্বৈরাচার বিতাড়িত হওয়ার পর একটি গুপ্ত বাহিনী ধীরে ধীরে আত্মপ্রকাশ করেছিল। ১২ তারিখের নির্বাচনে এবং এর আগে তারা কীভাবে স্বৈরাচারী কায়দায়, ডিজিটাল মাধ্যমে নিজেদের কাজ চালিয়েছিল, তা আপনাদের স্পষ্ট মনে আছে। 

সোমবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সম্মানে আয়োজিত নৈশভোজের আগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। সরকার গঠনের পর শরিক নেতাদের সঙ্গে এটাই তার প্রথম এ ধরনের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ।

তারেক রহমান বলেন, আমরা একসঙ্গে ছিলাম, আছি এবং ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতেও একসঙ্গেই থাকব। আমাদের মধ্যে মতের পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু ভুল বোঝাবুঝির কোনো কারণ আমাদের মধ্যে আছে বলে আমি মনে করি না।

তিনি বলেন, ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা এবং জুলাই সনদের লক্ষ্য বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে ভিন্নমত থাকতে পারে। কিন্তু আমাদের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই। আমাদের মধ্যে যেহেতু কোনো বিভেদ নেই, ৩১ দফার আলোকে হোক, জুলাই সনাদের আলোকে হোক আমরা ইনশআল্লাহ দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাব।

আওয়ামী লীগের সময় রাজপথের আন্দোলনের কথা স্মরণ করতে গিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সমালোচনা করেন বিএনপি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, আজকে অনেকেই দাবি করে, কারো নাম আমি উল্লেখ করতে চাই না, যাদেরকে একটি শব্দ ‘গুপ্ত’ বললেই মানুষ চেনে। এদের কিন্তু ওই সময়ে আমরা অনেক খুঁজেছি, তাদেরকে আমরা পাইনি। আমি পাইনি দূরে থেকে। আপনারা কি কেউ পেয়েছিলেন রাজপথে তাদেরকে? তাদেরকে কিন্তু রাজপথে আমরা দেখিনি।

তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে তাদের দেখেছি, যারা এ দেশ থেকে পালিয়ে গেছে, তাদের সঙ্গে। শেষের দিকে কিছু কিছু জায়গায় তাদের দেখেছি, কিন্তু গত ১৭ বছর বিভিন্ন জায়গায় আমরা তাদের দেখিনি। কাজেই দেশের মানুষ আমাদের ওপরেই আস্থা রেখেছে, আমরাই দেশকে এগিয়ে নিতে পারব বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষের আস্থা ধরে রাখার জন্য যে কোনো মূল্যে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। দেশের মানুষের আস্থা ধরে রাখার জন্য আমরা সকলে একসঙ্গে কাজ করব, কারণ জনগণের প্রত্যাশা আমাদের ওপর। জনগণ প্রত্যাশা নিয়েই আমাদের দায়িত্ব দিয়েছে। আসুন, আগে আমরা দায়িত্বটা পালন করি; তারপর আমরা নিজেদের নিয়ে ভাবি।

সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় যমুনার অনুষ্ঠানস্থলে এসে প্রধানমন্ত্রী শরিক নেতাদের টেবিলে টেবিলে গিয়ে কুশল বিনিময় করেন এবং তাদের খোঁজখবর নেন। কুশল বিনিময় পর্বের পর নেতাদের নিয়ে নৈশভোজে বসেন প্রধানমন্ত্রী।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়।

বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বেশ অনেক দিন পর আপনাদের সঙ্গে আজকে দেখা হলো। আমরা একসঙ্গে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি, অত্যাচারিত-নির্যাতিত হয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ, আমরা বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সফল হয়েছি। মানুষের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার যে দাবি নিয়ে আমরা সাধারণ মানুষের কাছে গিয়েছিলাম, সেই অধিকার নিয়ে আমরা বিজয় অর্জন করেছি। বাংলাদেশের মানুষ তাদের রায় দিয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে।

তিনি বলেন, অনেকগুলো রাজনৈতিক দল একসঙ্গে বসে আমরা বাংলাদেশের মানুষের সামনে ৩১ দফা উপস্থাপন করেছিলাম। আমরা যখন এটি দিয়েছিলাম, তখন অন্য অনেক রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তিকে সংস্কারের ‘স’ বলতেও দেখিনি, যারা পরে সংস্কার নিয়ে অনেক বড় বড় কথা বলেছেন। কিন্তু আজকে এই প্যান্ডেলের নিচে যারা বসে আছি, আমরাই তখন স্বৈরাচারের চোখরাঙানি উপেক্ষা করে রাষ্ট্র সংস্কারের দফাগুলো দিয়েছিলাম।

নির্বাচনে জনগণ ৩১ দফার ‘পক্ষে’ রায় দিয়েছে দাবি করে তারেক রহমান বলেন, এখন এটি শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর নয়, বরং বাংলাদেশের জনগণের ৩১ দফায় পরিণত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা নিশ্চয় দেখেছেন, ৫ আগস্ট স্বৈরাচার বিতাড়িত হওয়ার পর একটি গুপ্ত বাহিনী ধীরে ধীরে আত্মপ্রকাশ করেছিল। ১২ তারিখের নির্বাচনে এবং এর আগে তারা কীভাবে স্বৈরাচারী কায়দায়, ডিজিটাল মাধ্যমে নিজেদের কাজ চালিয়েছিল, তা আপনাদের স্পষ্ট মনে আছে। তারা বাংলাদেশের জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিল। তবে ঐতিহাসিকভাবে সত্য যে, বাংলাদেশের জনগণ স্বাধীনভাবে মতামত দেওয়ার সুযোগ পেলে সবসময় সঠিক সিদ্ধান্তই গ্রহণ করে। ১২ তারিখের নির্বাচনেও তারা সেটিই করেছে।

বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এক উপদেষ্টার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কয়েক দিন আগে সেই সাবেক উপদেষ্টার সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়েছিল। কথা প্রসঙ্গে তিনি বলছিলেন যে, তারা ১৮ মাসের মত দেশ পরিচালনা করেছেন, এই সময়ে তারা কতটা অসহায়ের মত ছিলেন। তিনি বলেছেন, সরকারে ৬০ শতাংশের বেশি সেই গুপ্ত বাহিনীর প্রভাব ছিল।

তিনি বলেন, নির্বাচনের পরে এই গুপ্ত বাহিনীকে দিশাহারা হয়ে বক্তব্য রাখতে দেখেছি। তারা এখনো পত্রপত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন রকম বক্তব্য দিচ্ছে। ওই উপদেষ্টার বক্তব্য হল, এরা দিশাহারা হয়ে গেছে। ১৮ মাস তারা পুরো ব্যবস্থাকে নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করেছে। কিন্তু ১২ তারিখে জনগণ রায় দেওয়ার পর থেকে তাদের মাথা খারাপ হয়ে গেছে।

এ সময় প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬-১৭ বছরে রেখে যাওয়া বিধ্বস্ত অর্থনীতি, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত, শিক্ষাব্যবস্থা, যোগাযোগ ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরেন এবং তা মোকাবিলার কথা বলেন।

তারেক রহমান বলেন, আমরা এতদিন একসঙ্গে ছিলাম। আমরা একসঙ্গেই থাকব। চলতে গেলে এদিক-ওদিক হতেই পারে। এত বড় সমস্যা, দুই কোটি মানুষের এই ঢাকা শহর এখন পরিষ্কার করাই একটা সমস্যা, যেদিকে তাকাবেন ময়লা। কেউ একজন বলেছেন, এটা ফেয়ারওয়েল ডিনার কি না? কেন ফেয়ারওয়েল হবে! ফেয়ারওয়েল ডিনার যদি দিতে হয়, গুপ্ত-সুপ্তদের বা স্বৈরাচারকে দিতে পারি। কিন্তু আমরা যারা ছিলাম, আমরা ইনশাআল্লাহ একসঙ্গেই থাকব।

শরিক নেতাদের প্রতি সম্মান জানিয়ে বিএনপি চেয়ার‌ম্যান বলেন, অনেক দিন বসার সুযোগ হয়নি, তাই এ আয়োজন। মুরুব্বিরা যা বলেছেন, তার সঙ্গে আমি মোটেও দ্বিমত করব না। তাদের মনে যে কষ্টের কথাগুলো আছে, তা স্বাভাবিক। তারা বয়সে আমার চেয়ে বড়; ছোট ভাই হিসেবে আমি তাদের সব বিষয় মেনে নিচ্ছি এবং দুঃখ প্রকাশ করছি।

তিনি বলেন, মাহমুদুর রহমান মান্না ভাই বলেছেন যে, জনগণের প্রত্যাশা অনেক। আমি শুধু এতটুকুই অনুরোধ করব, আমাদের একটু ধৈর্য ধরতে হবে। আসুন, সকলে মিলে আগে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করি।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বক্তব্য দেন জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মুফতি মহিউদ্দিন ইকরাম।

শরিক নেতাদের সঙ্গে ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু, মোহাম্মদ শাহজাহান, আবদুল আউয়াল মিন্টু।

প্রধানমন্ত্রী বুফেতে দাঁড়িয়ে অন্য সবার সঙ্গে খাবার নেন এবং শরিক নেতাদের সঙ্গে একটি টেবিলে বসে খাবার খান। নাগরিক ঐক্যের মাহবুবুর রহমান মান্না, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) মোস্তফা জামাল হায়দার, বিজেপির আন্দালিব রহমান পার্থ, বিএনপির মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, গণফোরামের সুব্রত চৌধুরী, ভাসানী জনশক্তি পার্টির শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু ওই টেবিলে ছিলেন ।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.