নিজস্ব প্রতিবেদক | ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আজ ১ সেপ্টেম্বর। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালের এই দিনে বিএনপি গঠন করেন। তিনি ছিলেন দলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান।
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে বিএনপির নেতৃত্বে উঠে আসেন তার স্ত্রী খালেদা জিয়া; ১৯৮৪ সালে তিনি দলের চেয়ারপারসন হন। গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর তার মৃত্যু হলে দলের নেতৃত্বে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। এরপর দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন তার বড় ছেলে তারেক রহমান।
দলীয় নেতারা বলছেন, বিএনপি পুরোনো রাজনৈতিক বৃত্ত ভেঙে রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনতে চায়। তবে গণতন্ত্রে উত্তরণ ও পরিবর্তনের এ পথও সহজ নয়। তাদের ভাষ্য, নানা চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র চলমান। এ কারণে আগামী দিনে রাজনৈতিক ঐক্যের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন দলের নেতারা।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল প্রতিষ্ঠা করেন। এর আগে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে তিনি জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গঠন করেছিলেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে পরে বিএনপি গঠিত হয়। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন দলের প্রথম চেয়ারম্যান। অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ছিলেন প্রথম মহাসচিব।
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্য, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জনগণের মধ্যে স্বনির্ভরতার চেতনা জাগিয়ে তোলা এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ছিল বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি। জিয়াউর রহমানের ঘোষিত ১৯ দফা দল ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে পরিচিতি পায়।
প্রতিষ্ঠার অল্প সময়ের মধ্যেই বিএনপি দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করে। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের সমন্বয় দলটির জনভিত্তি সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখে।
১৯৮১ সালের ৩০ মে বিপথগামী কিছু সেনাসদস্যের হাতে জিয়াউর রহমানের মৃত্যু হয়। এরপর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিএনপির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে সামনে আসেন বেগম খালেদা জিয়া।
১৯৯০ সালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর ১৯৯১, ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৬ সালের জুন এবং ২০০১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এসব নির্বাচনের মধ্যে ১৯৯১, ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি ও ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করে। এক-এগারোর সেনা-সমর্থিত সরকারের দুই বছর পর ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দলটি পরাজিত হয়।
নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি পূরণ না হওয়ায় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নেয়নি বিএনপি। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয় দলটি। ওই নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ তুলে ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে বিএনপি।
দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের পর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ২৯৯টি ঘোষিত আসনের মধ্যে বিএনপি ২০৯টিতে জয় পায়। বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট জয় পায় মোট ২১২টি আসনে। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। এরপর তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। নির্বাচনে বিএনপি অনুমিতভাবে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। নির্বাচনে বিজয়ের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। জাতীয় সংসদে বিরোধীদল হিসেবে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। শক্ত কোনো রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় জাতীয় সংসদ ও মাঠের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বিএনপিই বাংলাদেশের একমাত্র শক্তিশালী দল হিসেবে বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত।
তারেক রহমানের বাণী
দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলের সর্বস্তরের নেতা-কর্মী, শুভানুধ্যায়ী এবং দেশবাসীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল বিএনপির সাহস, সংগ্রাম, ত্যাগ ও সাফল্যের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বাংলাদেশি মানুষের জন্য আনন্দ, উদ্দীপনা ও প্রেরণার দিন।
তারেক রহমান বলেন, মানুষের বাকস্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ করে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। পরে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন এবং নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনীতি করার অধিকার ফিরিয়ে দেন।
তিনি বলেন, সময়ের প্রয়োজনে বিএনপি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে দেশে বহুমাত্রিক গণতন্ত্রের নতুন পথচলা শুরু হয়।
তারেক রহমান আরও বলেন, দেশে গণতন্ত্র সমুন্নত রাখা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির লক্ষ্যে বিএনপির উদ্যম ও উদ্যোগ দলটিকে জনগণের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছে। বেগম খালেদা জিয়া তার ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বের মাধ্যমে বিএনপিকে দেশের প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দিয়েছিলেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
পাঁচ দিনব্যাপী কর্মসূচি
বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে পাঁচ দিনব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে দলটি। গত ২৬ আগস্ট দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
কর্মসূচির অংশ হিসেবে আজ সকাল ৬টায় নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ দেশব্যাপী দলীয় কার্যালয়গুলোতে দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে।
সকাল ৯টায় বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবসহ কেন্দ্রীয় নেতারা এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা দলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিস্থলে ফাতেহা পাঠ ও পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন।
আগামী ৫ সেপ্টেম্বর বেলা ৩টায় কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ মিলনায়তনে ‘বিএনপি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের পাশাপাশি দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবীরা এতে অংশ নেবেন।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে পোস্টার প্রকাশের পাশাপাশি বৃক্ষরোপণ ও মৎস্য অবমুক্তকরণ কর্মসূচিও গ্রহণ করা হয়েছে। মৎস্য অবমুক্তকরণ কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেবেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল। বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেবেন দলের যুগ্ম মহাসচিব ও পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। এ ছাড়া সারা দেশে জেলা ও মহানগর বিএনপি এবং দলটির বিভিন্ন ইউনিট আলোচনা সভাসহ নানা কর্মসূচি পালন করবে