নিজস্ব প্রতিবেদক | ২০ অক্টোবর, ২০২৬
ফটো গ্রিড: সিলেটটুডে
অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে নেমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের পর তার পাশে দাঁড়িয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শীর্ষ নেতারা। গত শনিবারের পিস্তল-কাণ্ডকে কেন্দ্র করে রোববার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনার পর সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেন ইশরাক।
ইশরাকের এই পদত্যাগের ঘটনায় তার প্রতি সমর্থন ও সহানুভূতি জানানোর পাশাপাশি দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের ব্যর্থতাকে দায়ী করে তার পদত্যাগ দাবি করেছেন এনসিপি নেতারা।
সোমবার বাড্ডার নিমতলা কালীমন্দির পরিদর্শনের সময় এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম বলেন, "মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীকে পদত্যাগ করানো হলেও আইনশৃঙ্খলার জন্য প্রধানত দায়ী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে না। দেশবাসী তাকিয়ে আছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কবে পদত্যাগ করবেন।"
একই দিন ঢাকেশ্বরী মন্দিরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এনসিপির সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্পষ্ট অবনতি হয়েছে এবং মাদক, চাঁদাবাজি, গুম, খুন ও ধর্ষণের মতো ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতা ইশরাক-কাণ্ডের মাধ্যমে আবার সামনে এসেছে। সীমান্ত অরক্ষিত থাকা ও মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থাসমূহ অকার্যকর হয়ে পড়ার কথা উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, "ইশরাকের পদত্যাগ কী শুধু অস্ত্র সামনে নিয়ে আসার বিষয়, নাকি এর সঙ্গে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলেরও কোনো বিষয় রয়েছে?"
শ্রী শ্রী ঢাকেশ্বরী মন্দিরে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, "আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যর্থতায় ফাঁদে পড়লেন ইশরাক হোসেন। তিনি নতুনভাবে রাজনীতিতে নেমেছেন এবং মাদকের বিস্তার বন্ধের চেষ্টা করছিলেন। সমস্যাটা তো হলো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর। অর্থাৎ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দোষ করেন, আরেকজন এই পাপে ভোগেন।"
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে এনসিপির শীর্ষ নেতা ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ সরকারের কাছে প্রশ্ন রেখে বলেন, একজন প্রতিমন্ত্রী হয়েও কেন জনাব ইশরাক হোসেনকে নিজেই অস্ত্র হাতে নিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামতে হলো,সরকারের কাছে এই প্রশ্নের জবাব চাওয়া জরুরি। এর পেছনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। মাদক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব যেসব প্রতিষ্ঠানের, তারা যদি যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করত, তাহলে একজন প্রতিমন্ত্রীকে কেন সরাসরি এভাবে মাঠে নামতে হবে?
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, এই পরিস্থিতির দায় কি শুধু ইশরাক হোসেনের, নাকি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যর্থতারও দায় রয়েছে? যদি মাদক নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়ে থাকে, তাহলে সেই ব্যর্থতার দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ওপরও বর্তায়। একজন প্রতিমন্ত্রীকে সরিয়ে দেওয়াই যদি সমস্যার সমাধান হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত হবে কীভাবে? রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর থাকলে একজন প্রতিমন্ত্রীকে কেন নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার মতো পরিস্থিতিতে পড়তে হবে?
হাসনাত বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যদি এভাবেই পরিচালিত হতে থাকে এবং একসময় জনগণই যদি পরিস্থিতির প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে, তখন সরকার কী করবে? তখন কাকে পদত্যাগ করিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা করবে? ব্যক্তিকে সরিয়ে দিয়ে সাময়িকভাবে সংকট সামাল দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার সমাধান হয় না। রাষ্ট্রকে কার্যকর করতে হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে, ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। অন্যথায়, একজনকে সরিয়ে দিয়ে সমস্যার মূল জায়গাটি আড়াল করা ছাড়া আর কিছুই অর্জিত হবে না।
হাসনাত আবদুল্লাহর অভিযোগ, দিনশেষে ঘের দখল, দুর্নীতি ও ঘুষের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদের ব্যর্থতার বলি হতে হবে জনাব ইশরাক হোসেনদের।
ইশরাকের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, অতীতে তার ও তার পরিবারের মারাত্মক ক্ষতিসাধনকারী ব্যক্তির জায়গায় নিজেকে বসিয়ে চিন্তা করলেও তিনি কারও ক্ষতিতে উল্লাস অনুভব করেন না। এমন মানুষেরাও যেন অন্যায়ের শিকার না হন এবং ন্যায়বিচার পান—সে আশা ব্যক্ত করেন তিনি।
এদিকে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতির কড়া সমালোচনা করে লেখেন, রোম যখন পুড়ছিল, নিরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিল; আর দেশের মানুষ বেঘোরে প্রাণ হারাচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থায়; স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তখন একদলীয় সংবিধান সংশোধনী কমিটি সাজিয়ে জ্ঞানের ঝাঁপি খুলে বসেছেন।