সিলেটটুডে ডেস্ক | ৩০ আগস্ট, ২০১৮
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) দিয়ে ভোটগ্রহণে আপত্তি জানিয়েছে বিএনপি। দলটি বলছে এরমাধ্যমে ‘ডিজিটাল কারচুপি’ সম্ভব।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ইভিএমে বিরোধিতার কারণ জানতে চাওয়ার প্রেক্ষাপটে বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে নিজেদের যুক্তি তুলে ধরেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
ফখরুল বলেন, “ইভিএমের মাধ্যমে যে ভোট ডাকাতি করা যায়, তা আজ বিশ্ব স্বীকৃত। নির্বাচন কমিশন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে স্বল্প পরিসরে যে ইভিএম ব্যবহার করেছে তাতেও কোনো জায়গায় বিশেষ করে বরিশাল, রাজশাহী, রংপুর ও খুলনায় ইভিএম কখনও কখনও বন্ধ হয়ে গেছে। একজনের ভোট আরেকজন দিয়েছে। কোথাও ইভিএম বাদ দিয়ে ব্যালট পেপারেও ভোট গ্রহণ সম্পন্ন করতে হয়েছে।”
এই যন্ত্রে ভোটের ফলাফল পাল্টে দেওয়া ‘সম্ভব’ দাবি করে ফখরুল বলেন, ‘‘ইভিএম সহজেই ম্যানিপুলেট করা যায়। ভোটার ছাড়াও চাইলে সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার তার নিজের বায়োমেট্রিকের মাধ্যমে ইভিএমকে ভোটদানের উপযোগী করতে পারে। ফলে অসাধু সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারের মাধ্যমে যে কোনো প্রার্থীর পক্ষে সকল ভোট সহজেই কাস্ট করা সম্ভব। পোল কার্ডের মাধ্যমে ভোটের ফলাফল সম্পূর্ণ পাল্টে দেওয়া সম্ভব।”
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন ইভিএমে ভোটগ্রহণ হচ্ছে- ওবায়দুল কাদেরের এই বক্তব্যের পাল্টায় বিএনপি মহাসচিব বলেন, “পৃথিবীর ৯০ ভাগ গণতান্ত্রিক দেশে ই-ভোটিং, ইভিএম, ডিভিএম পদ্ধতি চালু নেই।
“হাতেগোনা যে কয়টি দেশ এই পদ্ধতি চালু করেছিল, প্রচণ্ড সন্দেহ ও বিতর্কের পর তারা এটি থেকে সরে এসেছে। জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স ইত্যাদি উন্নত গণতান্ত্রিক দেশ এই পদ্ধতি ইতোমধ্যে পরিত্যাগ করেছে।”
ফখরুল বলেন, ‘‘আমরা নির্বাচন কমিশনকে আবার হুঁশিয়ার করছি, অবিলম্বে ইভিএম, ডিভিএম ক্রয়ের উদ্যোগ পরিত্যাগ করুন। আপনাদের প্রতি জনগণের আস্থাহীনতাকে আর ঘনীভূত করবেন না।
“ডিজিটাল কারচুপির পথ থেকে সরে আসুন। অন্যথায় ষড়যন্ত্রকারীদের প্রত্যেককে ব্যক্তিগতভাবে এই অপতৎপরতার জন্য মূল্য দিতে হবে।”
আওয়ামী লীগ এখন জনগণের উপর আস্থা হারিয়ে যন্ত্রের ওপর ভর করেছে বলেও মন্তব্য করেন বিএনপি মহাসচিব।
ইভিএম নিয়ে আলোচনার এই পর্যায়ে নির্বাচন কমিশন বৃহস্পতিবার (৩০ আগস্ট) আরপিও সংশোধন বিষয়ক বৈঠকে বসে। জাতীয় নির্বাচনে ইভিএমে ভোটগ্রহণের বিরোধিতা করে সে সভা ত্যাগ করেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার।
পরে বৈঠক শেষে নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা ইভিএম নিয়ে তাদের সিদ্ধান্তের কথা জানান।
সিইসি বলেন, নির্বাচন কমিশন ইভিএমে (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) ভোট গ্রহণের বিধান রেখে আরপিও সংশোধনের প্রস্তাব করেছে। কয়েক দিনের মধ্যে এই প্রস্তাব আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। মন্ত্রণালয়ের প্রক্রিয়া অনুয়ায়ী তা সংসদে উত্থাপন করা হবে। আইন পাস হলে সারা দেশে ইভিএম প্রদর্শনী হবে। এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা হবে।
তিনি বলেন, সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে, পরিস্থিতি কিন্তু সে রকম নয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচন ভালো ফল পেয়েছি। প্রয়োজনে যাতে সংসদ নির্বাচন তা ব্যবহার করা যায়, সে প্রস্তুতি নিতেই আমরা আইন সংশোধনের প্রস্তাব করেছি।
সিইসি বলেন, নির্বাচনে যে ইভিএম ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি। রাজনীতিবিদেরা সম্মতি দিলে ইভিএম ব্যবহার করা হবে। এ বিষয়ে কমশিন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সুতরাং ইভিএম ব্যবহার হবে সে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি।
ইভিএম নিয়ে আলোচনার এই সময়ে দেড় লাখ ইভিএম কিনতে প্রায় চার হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাবও ইসি তৈরি করেছে। ইতোমধ্যে তিনশ আসনের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ অর্থ্যাৎ একশটি আসনে ইভিএম ব্যবহারের উদ্যোগের কথাও জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
এদিকে, ইভিএম প্রকল্পের ‘নামে অর্থ লুটের উদ্যোগ’ নেওয়া হয়েছেও বলে অভিযোগ বিএনপির। তিনি বলেন, “সরকারি আর্থিক শৃঙ্খলা ও নিয়মনীতি উপেক্ষা করে অতি দ্রুত ইভিএম প্রকল্প বাস্তবায়নের অপপ্রয়াস চালাচ্ছে। ইসি যেখানে ২০১০ সালে ১০ হাজার টাকা মূল্যে একটি ইভিএম মেশিন ক্রয় করেছিল, সেখানে আজ ২০ গুণ বেশি দামে প্রতিটি ইভিএম মেশিন দুই লাখ পাঁচ হাজার টাকায় ক্রয় করতে হচ্ছে। এটা জনগণের অর্থ লোপাটের আরেকটি উদ্যোগ বৈ আর কিছু না। এটি সরকার ও ইসির একটি অশুভ পার্টনারশিপ।”
ইভিএম প্রকল্প বাদ দিয়ে চার হাজার কোটি টাকার অর্থ নির্বাচন সুষ্ঠু করার কাজে ব্যয়ের জন্য নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানান ফখরুল।