মৌলভীবাজার প্রতিনিধি | ০৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২০
চা শ্রমিকদের ন্যূনতম দৈনিক ৬৭০ টাকা মজুরি নির্ধারণসহ ১১ দফা দাবিতে চা শ্রমিক সংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির উদ্যোগে নিম্নমত মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।
এ উপলক্ষে রোববার (৯ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে শহরের মনুসেতু সংলগ্ন কোর্টরোডস্থ বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের কার্যালয়ে চা-শ্রমিক সংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির উদ্যোগে এক শ্রমিকসভা অনুষ্ঠিত হয়।
চা-শ্রমিক সংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির যুগ্ম-আহবায়ক হরিনারায়ণ হাজরার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বক্তব্য রাখেন জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট-এনডিএফ জেলা কমিটির সভাপতি কবি শহীদ সাগ্নিক, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক রজত বিশ্বাস, ধ্রুবতারা সাংস্কৃতিক সংসদ মৌলভীবাজার জেলা সাধারণ সম্পাদক অমলেশ শর্ম্মা, মৌলভীবাজার জেলা হোটেল শ্রমিক ইউনিয়ন রেজিস্ট্রেশন নং চট্টগ্রাম ২৩০৫ এর সাধারণ সম্পাদক মো. শাহিন মিয়া, মৌলভীবাজার জেলা রিকশা শ্রমিক ইউনিয়ন রেজিস্ট্রেশন নং চট্টগ্রাম ২৪৫৩ এর সভাপতি মো. সোহেল মিয়া, চা শ্রমিক সংঘের রাজনগর চাবাগানের নেতা নারায়ণ গোড়াইত, সুনছড়া চা-বাগানের নেতা প্রশান্ত কৈরী, লংলা চা-বাগানের নেতা সন্ন্যাসী নাইড়, ডাবলছড়া চা বাগানের নেতা বাবুল রাজভর, নয়াপাড়া চা বাগানের নারয়ন নায়েক, দীনেশ কর্মকার, রঞ্জু নাইড়ু প্রমুখ।
পরে কোর্ট রোড হতে এক বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে চৌমুহান চত্বরে সংক্ষিপ্ত পথসভার মাধ্যমে শেষ হয়।
পথসভা শেষে মৌলভীবাজার জেলা বিভিন্ন বাগানের ৬৯২ জন চা শ্রমিকের গণস্বাক্ষরিত স্মারকলিপিটি মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর পেশ করা হয়।
স্মারকলিপির অনুলিপি শ্রম প্রতিমন্ত্রী, শ্রম সচিব, সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক, শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রেরণ করা হয়।
১১ দফা দাবিতে যা রয়েছে,
১) (ক) চা শ্রমিকদের সুস্থভাবে বেঁচে থাকা ও উৎপাদনে সক্রিয় থাকার প্রয়োজনে বর্তমান বাজারদরের সাথে সংগতিপূর্ণভাবে চা শ্রমিকের দৈনিক (সকালের নাস্তা ২০ টাকা + দুপুরের খাবার ৪০ টাকা + রাতের খাবার ৪০ টাকা) ১০০ টাকা হিসেবে ৬ সদস্যের পরিবারের জন্য শুধু খাবার খরচ ৬০০ টাকা প্রয়োজন। এর সাথে আনুষঙ্গিক খরচযুক্ত করে এ পর্যায়ে ন্যূনতম মজুরি দৈনিক ৬৭০ টাকা নির্ধারণ করতে হবে। চা-শিল্পের মজুরি নির্ধারণে দ্বি-পাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে চলমান নামকাওয়াস্তে মজুরি বৃদ্ধির ধারা বাতিল করে নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে নিয়মিত মজুরি নির্ধারণ করা।
(খ) দ্রব্য মূল্যের ঊর্ধ্বগতি, মূল্যস্ফীতি, শ্রমিকদের অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতা বিবেচনা করে বার্ষিক ১০% হারে ইনক্রিমেন্ট প্রদান।
২) সাপ্তাহিক ছুটির দিনের মজুরি প্রদানে বেআইনি শর্ত বাতিল করে বাংলাদেশ শ্রমআইন-২০০৬(অদ্যাবধি সংশোধিত) এর ১০৩(গ) ধারা অনুযায়ী বিনাশর্তে মজুরি প্রদান।
৩) কর্মে উপস্থিতির উপর নির্ভর করে উৎসব বোনাসের নামে উৎসাহ বোনাস দিয়ে শ্রমিক ঠকানোর অপকৌশল বন্ধ করে সকল শ্রমিককে এক মাসের মজুরির সমপরিমাণ বছরে দুইটি উৎসব বোনাস ও একটি উৎসাহ বোনাস প্রদান।
৪) চা শিল্পে শ্রম আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে। বাংলাদেশ শ্রমআইন-২০০৬ এর ২৩৪ ধারা মোতাবেক কোম্পানির লভ্যাংশের ৫% শ্রমিকদের কল্যাণ তহবিল ও অংশগ্রহণ তহবিলে প্রদান এবং অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারসহ সংগঠন করার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
৫) চা শিল্পে নৈমিত্তিক ছুটি(বছরে ১০ দিন) কার্যকর ও অর্জিত ছুটি(প্রতি ২২ দিনে ১ দিন) প্রদানে বৈষম্যসহ শ্রম আইনের বৈষম্য নিরসন।
৬) ২০০৯ সালে নিম্নতম মজুরি বোর্ড কর্তৃক খসড়া সুপারিশ অনুযায়ী প্রাথমিক চিকিৎসা কর্মী ও যোগালি সর্দারকে মাসিক বেতনধারী, ১ বিঘা জমি পর্যন্ত ক্ষেতে জমির জন্য রেশন কর্তন বন্ধ, প্রতি ২০ পরিবারে জন্য একটি টিউবওয়েল, কোম্পানির লভ্যাংশ ৫% প্রদান, মাসিক মজুরির সমান উৎসব দুইটি উৎসব বোনাস(কর্মে উপস্থিতির উপর নির্ভর করে উৎসাহ বোনাস নয়), গ্রাচুয়েটি, শ্রমআইনের ৫৯ ধারা অনুযায়ী পায়খানা নির্মাণ ইত্যাদি সুবিধা বাস্তবায়ন এবং ক্ষেতের জমির জন্য রেশন কর্তন সম্পূর্ণ বন্ধ করা।
৭) চা ও রাবার শ্রমিকদের পূর্ণাঙ্গ রেশন হিসেবে একটি পরিবারের সাপ্তাহিক প্রয়োজনের অনুপাতে চাল, আটা, ডাল, তেল, চিনি/গুড, সাবান, চা-পাতা, কেরোসিন প্রদান।
৮) চা বাগানে বসবাসকারী শ্রমিকদের ভোগদখলকৃত ভ‚মির উপর স্বত্ব অধিকার।
৯) সরকারি আইন মোতাবেক মাতৃত্বকালীন ভাতা ৬ মাস এবং প্রত্যেক চা বাগানে এম্বুলেন্স প্রদানসহ একজন এমবিবিএস ও একজন এমবিবিএস (প্রসূতি বিশেষঞ্জ ) ডাক্তার, প্রশিক্ষিত নার্স নিয়োগ করে চা শ্রমিকদের সুস্বাস্থ্য ও সুস্থ জীবনের জন্য সুচিকিৎসার ব্যবস্থাসহ চা-শ্রমিক সন্তানদের সুশিক্ষার জন্য সকল বাগানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং প্রতি ভ্যালীতে সরকারি কলেজিয়েট স্কুল স্থাপন।
১০) ভারতের বিনাশুল্কে বা কম শুল্কে চা রপ্তানি এবং শ্রীমঙ্গল নিলাম কেন্দ্র ব্যবহারের প্রস্তাব গ্রহণ করা যাবে না। নোম্যান্স ল্যান্ডে ত্রিপুরা রাজ্যের চা-বাগান গড়ে তোলার উদ্যোগ আইনগতভাবে বন্ধ করার প্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ।
১১) অবিলম্বে শ্রীমঙ্গলে স্থায়ী শ্রম আদালত কার্যালয় স্থাপন এবং শ্রম আদালতের দীর্ঘসূত্রিতা নিরসনে ৯০ দিনের মধ্যে সকল মামলা নিষ্পত্তি করা।