স্পোর্টস ডেস্ক | ০২ সেপ্টেম্বর, ২০২১
দেশের প্রয়োজনের মুহূর্তে গোলের পর গোল, দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অন্য যেকোনো ফুটবলারের চাইতে অনন্য রেকর্ডের অধিকারী এখন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। জাতীয় দলের হয়ে গোল করার রেকর্ডে তার ধারেকাছেও নেই এইসময়ে ফুটবল খেলা কেউ, এমনকি নেই ফুটবল ইতিহাসে আর কেউ।
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, আধুনিক ফুটবলের এক অনন্য বিজ্ঞাপন। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ভেঙেছেন তিনি ইরানের আলী দাইয়ীর রেকর্ড। এতদিন আলী দাইয়ীর সঙ্গে যৌথভাবে রেকর্ডের ভাগাভাগি করেছিলেন তিনি, দুজনের গোল সংখ্যা ছিল সমান ১০৯। কাল রাতে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে আয়ারল্যান্ড বিপক্ষে জোড়া গোল করেছেন তিনি। রোনালদোর গোলসংখ্যা এখন ১১১!
রেকর্ড গড়তে দরকার ছিল এক গোল, সেটি ৮৯ মিনিটে দারুণ হেডে পেয়ে গেছেন তিনি। কিন্তু সে গোলে রেকর্ড হলেও দল তো জেতেনি, সমতায় ফিরেছে মাত্র। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর তা সইবে কেন! রেকর্ড গড়ার রাতে দলকে না জিতিয়ে মাঠ ছাড়লে যে রাতটা পূর্ণতা পায় না। যোগ করা সময়ের ছয় মিনিটে আবারও হেড রোনালদোর, আরেক গোল।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপের ইউরো অঞ্চলের বাছাইপর্বে নিজেদের মাটিতে আয়ারল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারাল পর্তুগাল। রেকর্ড গড়ার পাশাপাশি আরও অনেকবারের মতো এবারও দলের জয়ের নায়ক রোনালদো।
ইরানের আলী দাইয়ীর ১০৯ গোলের রেকর্ড ছুঁয়েছিলেন ইউরোতেই, কাল আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ৪৫ মিনিটে পিছিয়ে পড়া পর্তুগালকে ৮৯ মিনিটে সমতায় ফিরিয়েই রেকর্ড গড়া হয়ে যায় রোনালদোর। ৯৬ মিনিটের গোলটি নিয়ে পর্তুগালের জার্সিতে এখন রোনালদোর গোলসংখ্যা
ফুটবলবিষয়ক ওয়েবসাইট ইএসপিএন জানাচ্ছে, ১১১ গোল করতে পর্তুগালের জার্সিতে রোনালদোকে খেলেছেন ১৮০ ম্যাচ।
১১১ গোলের মধ্যে ১৪টি রোনালদো করেছেন পেনাল্টি থেকে। এত লম্বা আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে পেনাল্টি থেকে গোল করতে রোনালদো ব্যর্থ হয়েছেন সাতবার (এর একটি গতকাল আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষেই)! গতকালের দুই গোল নিয়ে ইউরোপ অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ইতিহাসে রোনালদোর গোল হলো ৩৩টি (৪২ ম্যাচে), যা ইউরোপে সর্বোচ্চ।
বয়স ৩০ হওয়ার আগে পর্তুগালের জার্সিতে ম্যাচপ্রতি গড়ে রোনালদোর গোল ছিল ০.৪৪টি (১১৮ ম্যাচে ৫২টি)। আর ৩০ পেরোনোর পর? ৬২ ম্যাচে ৫৯টি, ম্যাচপ্রতি গড়ে ০.৯৫টি।
সব মহাদেশ মিলিয়ে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে গোলের রেকর্ডে রোনালদো অবশ্য আছেন ৩ নম্বরে, তাঁর ওপরে আছেন গুয়াতেমালার কার্লোস রুইজ (৩৯ গোল) ও ইরানের আলী দাইয়ি (৩৫)। এই রেকর্ড ভাঙতেও যে রোনালদোর খুব একটা সময় লাগবে না, এ নিয়ে বাজি ধরার লোকের অভাব হবে না।
ইউরোপ অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের রেকর্ডে তো বটেই, ইউরোর বাছাইপর্বেও গোলের রেকর্ডে সবার ওপরে রোনালদো। সেখানে ৩৫ ম্যাচে তাঁর গোল ৩১টি। শুধু কি বাছাইপর্ব! ইউরোর মূল পর্বে রোনালদোর গোল ২৫ ম্যাচে ১৪টি, গত জুনে ইউরোতেই মিশেল প্লাতিনির ৯ গোলের রেকর্ড ভেঙে নতুন এই রেকর্ড গড়েছেন রোনালদো।
পর্তুগালের জার্সিতে রোনালদোর হ্যাটট্রিকের সংখ্যা, ইউরোপে আর কোনো খেলোয়াড়ের জাতীয় দলে এত হ্যাটট্রিক নেই। এই ৯ হ্যাটট্রিকের মধ্যে দুই ম্যাচে রোনালদো গোল করেছেন ৪টি করে! ৯টি হ্যাটট্রিকের বাইরে আরও ১৮ বার পর্তুগালের জার্সিতে ম্যাচে একাধিক গোল করেছেন রোনালদো। অর্থাৎ সব মিলিয়ে ২৭ বার ম্যাচে দুই বা তার বেশি গোল করেছেন পর্তুগিজ ফরোয়ার্ড।
পর্তুগালের জার্সিতে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে এই প্রথম ম্যাচের ৮৯ মিনিটের পর একাধিক গোল করেছেন রোনালদো। এর আগেও একবার ৮৯ মিনিটের পর পর্তুগালের হয়ে দুই বা তার বেশি গোল করেছিলেন রোনালদো, তবে সেটি ২০১৮ সালে মিসরের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে। সেবার দুই গোলই রোনালদো করেছিলেন যোগ করা সময়ে।
আয়ারল্যান্ডকে নিয়ে পর্তুগালের জার্সিতে ৪৫টি ভিন্ন দেশের বিপক্ষে গোল করলেন রোনালদো। গতকালের আগে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে দুই ম্যাচে গোল করতে পারেননি পর্তুগাল অধিনায়ক। তিন বা তার বেশি ম্যাচ খেলে এখনো গোল করতে পারেননি রোনালদো, এমন দেশ আছে শুধু তিনটি—আলবেনিয়া (৪ ম্যাচ), ব্রাজিল (৩) ও ইংল্যান্ড (৩)।
পর্তুগালের জার্সিতে ম্যাচের প্রথমার্ধে রোনালদোর গোল ৪৪টি। প্রথমার্ধে সবচেয়ে বেশি গোল এসেছে ২১ থেকে ৩০ মিনিট সময়ের মধ্যে (১৪টি)। ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে রোনালদোর গোল ৬৭টি। দ্বিতীয়ার্ধে সবচেয়ে বেশি গোল এসেছে ৭৬ থেকে ৮৫ মিনিটের মধ্যে (১৯টি)।
রোনালদোর ১১১ গোলের ৫৯টি করেছেন ডান পায়ে, ২৫টি বাঁ পায়ে, ২৭টি এসেছে হেডে। আর ম্যাচের পরিস্থিতি বিবেচনায় গেলে এই ১১১ গোলের ৮৭টি এসেছে দলের আক্রমণের শেষ আঁচড় হয়ে (ওপেন প্লে), ১০টি গোল এসেছে ফ্রি-কিকে, ১৪টি পেনাল্টিতে।
অবশ্য এর ফুটবলীয় ব্যাখ্যাও আছে। রোনালদোর বয়স ৩০ হওয়ার আশপাশের সময়ে পর্তুগালে প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের বান ডেকেছে। বের্নার্দো সিলভা, গনসালো গেদেস, দিয়োগো জোতা, রুবেন নেভেস, রেনাতো সানচেস, উইলিয়াম কারভালিও, জোয়াও কানসেলো, রাফায়েল গেরেইরোর মতো প্রতিভাবান তরুণেরা একে একে রোনালদোর সতীর্থ হয়েছেন। রোনালদোও বাঁ পাশের উইং ছেড়ে সে সময়ে মূলত স্ট্রাইকার হিসেবে খেলতে শুরু করেন। কিন্তু স্ট্রাইকার হিসেবে তো অনেকেই খেলেন, সবাই তো আর রোনালদো নন!
এখনও খেলছেন এমন খেলোয়াড়দের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গোল স্বাভাবিকভাবেই রোনালদোর। এইসময়ের প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে আছেন আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের আলী মাবখুত, দুজনের গোলসংখ্যা সমান ৭৬। এরবাইরে আছেন ভারতের সুনীল ছেত্রী, যার গোল সংখ্যা ৭৪; এবং পোল্যান্ডের রবার্ট লেভানডফস্কি, তার গোলসংখ্যা ৬৯।