মাসুদ পারভেজ | ২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩
একটা আর্জেন্টিনাময় রূপকথার রাত শেষে ভোরের সুবাস অঙ্গে মেখে যখন এই লেখা লিখছি তখন মনে পড়ে যাচ্ছে সেইসব হতাশার রাতের অব্যক্ত কথামালা। যে রাতগুলো ছিল না ফুরানোর ইস্পাত-কঠিন শপথে বলীয়ানের মতো, বারবার হেরে যাওয়ার পরে নতুন করে মনোবল সামলে নেওয়ার মতো, কাছে গিয়েও ছুঁতে না পারার মতো আর সব শেষে আকাশ-কুসুম স্বপ্নের বাস্তবায়ন নিয়ে বারবার দৃঢ় মনোবল রপ্ত করার মতো।
দর্শকনন্দিত দলের কথা বলতে গেলে প্রথম সারিতে আসে আর্জেন্টিনার কথা। শিরোপা জিততে না পারাটা যাদের জন্য ধরাবাঁধা নিয়ম হয়ে গিয়েছিলো, যাদের টানা ফাইনাল হারাটা মিথরাসের সাবধানবাণী মেনে চলার মতো হয়ে গিয়েছিলো তারাই কিনা টানা শিরোপা জিতে চলেছে! কিন্তু মাঠের বাইরে যাদের নির্ঘুম-রাত কাটে তাদের মনোবল কোন জাদুবলে অটুট থেকেছে; এই উত্তর একেকজনের কাছে একেকরকম মনে হলেও সমর্থকেরা আদতে একটা স্বপ্নের দীর্ঘবুনন করছিল।
সমর্থকেরা আশা হারায়নি। তারা জানতো সোনালি দিন আসবেই...শুধু একটা টনিকের অপেক্ষা মাত্র। আবারও আনন্দে ভাসবে আকাশী-সাদা বাহিনী।
“You can change your wife, your politics, your religion, but never, never can you change your favorite football team.” Eric Cantona এই অমর উক্তিটি কি আর্জেন্টিনার বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি সমর্থকদের ভেবে বলেছিলেন? তর্কসাপেক্ষে হয়তোবা না কারণ এটা আসলে সবার জন্য সত্য। যারা সত্যিকার অর্থে সমর্থক তারা দলের খারাপ অবস্থায়ও সমর্থন দেয়। শিরোপা জিততে পারছে না বলে সমর্থন পাল্টাবে তা নয়। কিন্তু সবাই কি সমর্থক!
১৯৯৩ সালে যখন কোপা আমেরিকা শিরোপা জিতে তখন নেহাত আমি শিশু। ২০০৭ সালে ফাইনাল হারের অশ্রু তখন সংবরণ করেছি কারণ মনে হয়েছিল শিরোপা আসতেছে... এক ফাইনাল হার কোন ব্যাপার না। তারও আগে শেষ আটের বিশ্বকাপ ম্যাচে জার্মানির সাথে অযৌক্তিক হারে খুব কষ্ট পেয়েছি কিন্তু ২০০৬ পেরিয়ে যেতে যেতে আরও যে যাবে তা বুঝতে পারিনি।
আর্জেন্টিনা সমর্থনের শুরুতে যে দুঃখ ও হতাশা পেয়েছি তাতে দল পাল্টানো খুব স্বাভাবিক বলে মনে হতো। কিন্তু ঐ যে হোয়ান রোমান রিকুয়েলমকে দেখে ভালো লেগেছিলো, আয়ালাকে ডিফেন্সের কিপার মনে হয়েছিলো, ভেরনের মারদাঙ্গা মনোভাবে মজেছিলাম আর পুঁচকে মেসির আগমনী সৌরভে মজেছিলাম সেখান থেকে আর বের হতে পারিনি, বের হইনি। কারণ এটা প্রথম ভালবাসার মতো। ভুলা যায় না।
আর্জেন্টিনার সাথে সেই যে ভালোলাগা শুরু তা সময়ের পরিক্রমায় আমাকে এনে দিয়েছে কোপা আমেরিকা, লা ফাইনালিসসিমা এবং বহু সাধনার বিশ্বকাপ। যার আগমনী সুবাস মেখেছিলাম চোখেমুখে সেই লিও মেসি সময়ের সাথে সাথে পরিণত হয়ে ফুটবলের ইতিহাস লিখে ফেলেছে, সার্বিয়া এন্ড মন্টেনেগ্রোর বিরুদ্ধে সেই প্রথম বিশ্বকাপ গোলের পর সেই ছোট্ট মেসিকে এখন 'গ্রেটেস্ট এভার ফুটবলার' বলা হচ্ছে! অথচ এই কণ্টকাকীর্ণ এবং বন্ধুর রাস্তা মসৃণ ছিলো না তো বটেই বরং ছিলো খানাখন্দে ভরপুর, ভীষণ আত্মঘাতী এবং না পাওয়ার হতাশার প্রতিচ্ছবি।
এখন আর্জেন্টিনার দীর্ঘ অপ্রাপ্তির রাত ফুরিয়েছে। এরই মধ্যে যারা মেসির জাদুতে মজেছে তারা অপেক্ষা করেছে একটা বিশ্বকাপের, তা তারা পেয়েছে। যারা অপেক্ষা করেছে ম্যারাদোনার বাটন নতুন কারও হাতে দেখার, তা তারা পেয়েছে, যারা অপেক্ষা করেছে বিশ্বকাপ না জিতেই যাকে সেরাদের সেরা বলছে ফুটবলপণ্ডিতরা তার হাতে সোনালি ট্রফি দেখার, তা তারা দেখতে পেয়েছে, যারা শৈল্পিক ফুটবলের জয়গান গেয়েছে তারা দেখতে পেয়েছে ফুটবল কতটা সুন্দর, লোমহর্ষক ও বেদনাদায়ক হতে পারে এবং কতটা কাঙ্ক্ষিত হতে পারে একটা ট্রফি...সব পাওয়া হয়ে গেছে।
সমর্থক হিসেবে কেউ যদি বলে, ফুটবল থেকে আমার আর কিছু চাওয়া-পাওয়া নেই তাহলে তাকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই, অবজ্ঞা করার সুযোগ নেই; কারণ, এক আর্জেন্টিনা যে মহাকাব্য রচনা করেছে তারপর ফুটবল পানসে মনে হতেই পারে।
অদূর ভবিষ্যতে লেস্টারসিটির মতো কোন দল প্রিমিয়ার লিগ জিততে পারলে (উইথআউট বিলিয়ন ডলার্স শর্টটার্ম ইনভেস্টমেন্ট), আফ্রিকা মহাদেশ থেকে প্রথম কেউ বিশ্বকাপ জিতলে কিংবা এশিয়ার কোন দল যদি সোনালি ট্রফি উঁচিয়ে ধরতে পারে অথবা ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের তলানির দল বাংলাদেশ যদি বিশ্বকাপে সুযোগ পায়, তাহলে ভিন্নকথা...তার আগে না।
তাই, ফুটবল সমর্থক হিসেবে এই পুরষ্কার কিংবা স্বীকৃতির অংশীদার আমিও। আনন্দে ভেলায় চড়ে আমি বলতেই পারি; হাস্তা লা ভিক্তোরিয়া সিয়েম্প্রে।
মাসুদ পারভেজ: কবি; আর্জেন্টিনা ফুটবল সমর্থক।