Sylhet Today 24 PRINT

বব মার্লের ফুটবলপ্রেম

মাসুদ পারভেজ রূপাই |  ০৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

কিংবদন্তী শিল্পী বব মার্লের ফুটবল-প্রীতি নিয়ে আমরা অনেকেই অবগত আছি। বব মার্লে দুর্দান্ত লেভেলের একজন ফুটবলপ্রেমী ছিলেন।গান ও ফুটবলকে সমানে ভালোবাসতেন এবং ক্ষেত্রেবিশেষে ফুটবলকে প্রাধান্য দিতেন। লিওনেল মেসির টোটাল ক্যারিয়ারের আখ্যান নিয়ে লেখা “আর্ট অফ ফুটবল” বইয়ে ‘ফুটবল মোর দ্যান অ্যা গেইম’ নামে লেখায় বব মার্লেকে নিয়ে লেখার চুম্বকাংশ সিলেটটুডে২৪-এর পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হল। প্রসঙ্গে বলে রাখি, ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ৬ই ফেব্রুয়ারি জ্যামাইকায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন জগৎবিখ্যাত সংগীতসাধক বব মার্লে।

ফুটবল নিছক গোলের খেলাতে সীমাবদ্ধ নেই। সময়ের সাথে সাথে একেকটা পাস, কিপারের সেইভ, রক্ষণের ট্যাকল আর সাফল্য-ব্যর্থতার সাথে জড়িয়ে গেছে নানা সমীকরণ। নানা অংশ আর অংশের শেষে হাসি-কান্না। ফুটবলের হার-জিতের সাথে আমাদের যাপিত জীবনের নানা ঘটনা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। মুক্তিকামী মানুষ, নিষ্পেষিত মানুষ, বঞ্চিত মানুষ ফুটবলেও খুঁজে নিয়েছে নিজেদের অব্যক্ত কথামালা। যা বলতে পারছে না, যা বুঝাতে পারছে না কিংবা মনের সুপ্ত আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ থেকে যারা তাদের বঞ্চিত রেখেছে তাদের বিরুদ্ধে ফুটবলের মাঠ, গ্যালারি হয়ে গেছে একেকটা জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি। যেখান থেকে দ্রোহের কাব্য রচিত হয় সেখান থেকে বিপ্লবের অগ্নিফুল ফোটে।

বিশ্বসংগীতের অন্যতম পুরোধা বব মার্লে। ফুটবল আর গানের সুতো একত্রিত করে বব মার্লে নাটাই বেঁধেছিলেন শান্তির সুবাতাস বইয়ে দেওয়ার জন্য। ববের কাছে ফুটবল ছিল নিপীড়িত ও নিষ্পেষিত মানুষের স্বাধীনতার জায়গা। মাঠে নেমে ফুটবলে কিক দেওয়ার মাঝে বব মার্লে খুঁজে নিয়েছিলেন নিজের অপ্রকাশিত সব কথামালা। ববের ভাষায়-'আমি মুক্তি চাই, ফুটবল মানে হলো মুক্তি'।

বব মার্লের ফুটবলের সাথে সখ্যতার আগে গানের সাথে সখ্যতা হয়েছিল। কিন্তু গানের সাথে সমানতালে চলেছে ফুটবল। যেখানে যেতেন সেখানে কোন না কোনভাবে ফুটবল খেলার একটা ব্যবস্থা থাকতো। ট্যুর ম্যানেজার হিসেবে যাকে নিয়োগ দিয়েছিলেন সেও ফুটবলার। অর্থাৎ বব মার্লের ফুটবল-প্রীতি চমক জাগানিয়া।

বব মার্লে ফুটবল খেলতেন। সিরিয়াস ফুটবলের সংজ্ঞায় হয়তোবা বব মার্লেকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু ফুটবল মাঠে ববের অবিশ্বাস্য সব কারিকুরি কেউ দেখলে নিশ্চিত বলবে-প্রফেশনাল ফুটবলারের সব যোগ্যতা বব মার্লের ছিল। কিন্তু তিনি খেলাটাকে উপভোগ করতে চেয়েছেন আর আমৃত্যু তা করে গেছেন। এ কজন জগৎবিখ্যাত সংগীত-শিল্পী যখন ফুটবলে খুঁজে নেয় তার অনুপ্রেরণা আর বিশ্ববাসীর জন্য লড়াকু স্বাধীনতার মন্ত্র যেখানে খুঁজে পান সেটা নিশ্চয়ই হেলায় ফেলার মতো না। বিপ্লবের সূতিকাগার হিসেবে বব মার্লের গান স্মরণীয় হলে ফুটবলকে সেই বব মার্লে বলেছেন-“ফুটবল হল স্বাধীনতা, ফুটবল হল গোটা একটি বিশ্ব।”

আমৃত্যু বব মার্লে তিনটা জিনিসের অনুরাগী ছিলেন। মার্লের লাল রঙয়ের গিবসন গিটার, মারিজুয়ানার কুঁড়ি, এবং ফুটবল! গানের সাথে তিনি খুঁজে নিয়েছিলেন গিটার, মারিজুয়ানা এবং চামড়ার গোলক। যেন একেকটা কিক উড়িয়ে দিচ্ছে পৃথিবীর একেকটা অনাচার। যেন ফুটবলের একেকটা শট লক্ষ্যভেদ করে যাচ্ছে সাম্রাজ্যবাদীদের চোয়াল। আর আঁচড়ে পড়ছে মুখোশের আড়ালে মানুষের।

"বব কখনো বল হারাতে চাইতো না। ওর দৌড়, শক্তিমত্তা অন্য সবার চেয়ে আলাদা ছিল। মিডফিল্ডে তার প্রভাব ছিল প্রফেশনাল ফুটবলারদের মতোই। সে ছিল আগ্রাসী মনোভাবের মানুষ। যখন কিক করতো তখন সত্যিকার অর্থেই কঠিনভাবে কিক করতো। মার্লের ক্ষিপ্রগতির কিক আমাদেরকে ভুগাতো। বড় মাঠে মার্লে খুবই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতো। যখনই সুযোগ পেতো, গোল করার চেষ্টা করতো।" কথাগুলো বব মার্লের বন্ধু নেভিল গ্যারিকের বলা। গানে গানে মার্লে জীবনের জয়গান গেয়েছেন। আর ফুটবলের মাধ্যমে স্বাধীনতার সর্বোচ্চটা উপলব্ধি করেছেন। কিন্তু তার জীবন থেকে ফুটবল কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে সবসময়ই। তার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত বব মার্লে ফুটবল খেলে বেড়িয়েছেন মাঠে, গানের ফাঁকে, মঞ্চে, পার্কে কিংবা স্টেশনে। বব মার্লের জীবনের প্রতিটা মুহূর্তের সাথে ফুটবল জড়িয়ে ছিল, যে বন্ধন তিনি কখনোই আলগা করেননি। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী থাবা তার কাছ থেকে ফুটবল কেড়ে নিতে সচেষ্ট ছিল সর্বদা। সহজিয়া রাস্তার পথিক হিসেবে বব মার্লে ‘রাস্তাফারিয়ান’ মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। যা আফ্রিকা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজে প্রচলিত ‘রাস্তাফারি‘ নামে একটি সহজিয়া লোকধর্ম। মানুষের মধ্যেই ঈশ্বর খুঁজে ফেরা বব মার্লেরা বিশ্বাস করেন ‘পৃথিবীতে সবার সমান অধিকার’। জটা চুলের বব মার্লে সেখানে খুঁজে পেয়েছিলেন জীবন।

বব মার্লে ছিলেন জন্মলগ্ন থেকে বর্ণবৈষম্যের শিকার। সাদা-কালো ভেদ করে তিনি বলেছিলেন-আমি ঈশ্বরের দলে। মুক্তিকামী মানুষের দলে তিনি সবসময় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। কিন্তু মুক্তিকামী মানুষের তো শত্রুর অভাব নেই। তাঁরও কোনকালে ছিল না। ১৯৭৭ সালে উপহার পাওয়া এক জোড়া বুট হয়েছিল তাঁর হন্তারক! ডান পায়ে বুটের সাথে থাকা তামার তার ক্ষত তৈরি করেছিল। শুরুতে পাত্তা না দিলেও একটা সময় ডাক্তার তাঁকে বলেছিল পায়ের পাতা বাদ দিতে। কিন্তু ঈশ্বরের দেওয়া কোন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বাদ দিবে না বব মার্লে। চিকিৎসক এরই মাঝে পরীক্ষা করে জানালো ‘লেন্টিজিনাস মেলানোমা’ নামের ত্বকের ক্যানসারের কথা। ফুটবল খেলতে পারবে না বলে বব মার্লে পায়ের পাতায় হাত দিতে দেয়নি ডাক্তারকে। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখালিখি হয়েছিল-বব মার্লেকে গুলি করে মারতে ব্যর্থ হয়ে সিআইএ মার্লের জন্য তেজস্ক্রিয় তামার তারের বুট পাঠিয়েছিল। সেখান থেকে তিন বছরের মধ্যে বব মার্লের সারা শরীরে ছড়িয়েছে ক্যানসার।

গানে গানে নতুন বিশ্ব গড়ে তোলার দাবিদার বব মার্লের কাছে ফুটবল ছিল মুক্তির সংগীত। নিপীড়িত মানুষের মুক্তি খুঁজে বেড়ানো সেই বব মার্লেকে পৃথিবী থেকে মুছে ফেলতে যারা চেয়েছে তারাও আশ্রয় নিয়েছে ফুটবলের কাছে। কারণ ফুটবল আর গান, এই দুইটাই ছিল বব মার্লের প্রাণ। যে ফুটবলকে তিনি প্রাণাধিক ভালোবাসতেন সেই ফুটবলের বুটই তাঁর মৃত্যুর উৎপত্তি! "আমি গান ভালোবেসেছিলাম, ফুটবলকে ভালোবাসারও আগে। যদি আমি ফুটবলকেই আগে ভালোবাসতাম তবে তা ভয়ংকর হতে পারত। ফুটবল খেলা আবার একই সাথে গান গাওয়া মারাত্মক ব্যাপার হতো। আমি শান্তির গান গাই, ভালোবাসার সুর ছড়াই; কিন্তু ফুটবল এমন এক খেলা যেখানে ডিফেন্ডার ট্যাকেল করলে একটা যুদ্ধের আবেশ ছড়িয়ে দেয়।

যুদ্ধ আর শান্তি একই বিন্দুতে চলতে পারে না!" কথাগুলো ১৯৮০ সালে এক ইন্টারভিউতে বলেছিলেন বব মার্লে। বব মার্লে পেশাদার ফুটবলার ছিলেন না কিন্তু ফুটবল খেলার সময় তাঁর দেখা মিলতো প্রাণোচ্ছল। জন্মভূমি জ্যামাইকান ফুটবলার কার্ল ব্রাউন বলেন- "বয়েজ টাউনে আমি মার্লেকে ফুটবল খেলতে দেখতাম। সেই সকাল আটটা থেকে বিকেল তিনটে অবধি৷ ট্রেঞ্চ টাউনের তরুণদের কাছে বয়েজ টাউনে ফুটবল খেলতে পারা'টা স্বপ্নের মতো। সত্যি কথা বলতে কি, আমি এখনো খুঁজে বের করতে পারিনি মার্লে কোনটা বেশি ভালোবাসতো- ফুটবল নাকি গান!

কিংবদন্তী বব মার্লে প্রয়াত হয়েছেন ১৯৮১ সালের ১১ই মে। মাত্র ছত্রিশ বছরের বয়সে তিনি জয় করেছেন গানের মুদ্রা আর ফুটবলের গান। গানকে তিনি গেয়েছেন ফুটবলের মাঠে। আর ফুটবলের বাঁক তিনি মুদ্রিত করেছেন গানের গলায় আর ভাবনায়। ট্যুর ম্যানেজার এলান কোল ছিলেন পেশাদার ফুটবলার। উত্তর আমেরিকায় ফুটবল খেলেছেন, জ্যামাইকায় খেলেছেন, খেলেছেন হাইতিতে। বিশ্বকাপেও জ্যামাইকার হয়ে খেলেছেন। মার্লের আফসোস ছিল, এলান যেভাবে ফুটবল খেলে সেভাবে গান গাওয়ার!

জগৎবিখ্যাত এক শিল্পীর আফসোস জ্যামাইকার এক ফুটবলারের মতো খেলতে পারার! কী ভীষণ ভালোবাসা ফুটবলের জন্য...এভাবেই বিশ্বসংগীতের অন্যতম পুরোধা বব মার্লে একটা ফুটবলময় জীবন পার করেছেন। দ্য গ্রেটেস্ট গেইম ফুটবলে খুঁজে ফিরেছেন জীবন, আর জীবনকে যাপনের গান। সংগীত ও ফুটবল মিলেমিশে তৈরি করেছে মোর দ্যান অ্যা গেইমের জয়গান। এখানেই ফুটবল অনন্য, এখানেই ফুটবল জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফুটবল ক্লাব বার্সেলোনা বলে-মোর দ্যান অ্যা ক্লাব, প্রিমিয়ার লিগের দল লিভারপুল বলে-ইয়ু উইল নেভার ওয়াক এলোন আর বব মার্লে দুইটাকে নিয়ে গেছেন মোর দ্যান অ্যা গেইম-এ।

  • মাসুদ পারভেজ রূপাই: কবি, প্রাবন্ধিক ও প্রকাশিতব্য আর্ট অফ ফুটবল বইয়ের লেখক বিস্তারিত কমেন্টে
  • e-mail: masud.khan121@gmail.com

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.