মাসুদ পারভেজ রূপাই | ০৭ অক্টোবর, ২০২৬
বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে পর্দা নেমেছে লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে। আর্জেন্টিনার হয়ে প্রায় সব রেকর্ড নিজের করে নেওয়ার পরে মেসির এই বিদায় ঘটনাবহুল এবং সাফল্যের ছোঁয়ায় মোড়ানো। একটা ঋদ্ধ ক্যারিয়ার শেষে যদি মেসি পেছনে ফিরে তাকায়, তাহলে দেখতে পাবে- জাতীয় দলে খেলার স্বপ্নে বিভোর ছোট্ট মেসি ফুটবলের গ্রেটেস্ট এভার ফুটবলার হিসেবে ক্যারিয়ার শেষ করতে পেরেছে, দেশের হয়ে সর্বোচ্চ গোল, অ্যাসিস্ট, ম্যাচ, বিশ্বকাপের সেরা প্লেয়ার, মহাদেশের সেরা প্লেয়ারের তকমার চাইতে মেসির আবেশ ছড়িয়ে গেছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
যারা তাকে দেখে ফুটবল ভালোবাসতে শিখেছে, বুঝতে শিখেছে তাদের সাথে নিয়েই দেশকে দীর্ঘ ছত্রিশ বছর পর জিতিয়েছে বিশ্বকাপ। এর চেয়ে বড় আইকনিক আর কী হতে পারে!
বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচ শেষ হতেই এনজো ফার্নান্দেজের কান্না সবার দৃষ্টিগোচর হওয়ার কথা। এই সেই এনজো, যে কি-না কোপা আমেরিকার ফাইনাল হারের পর হতাশায় অবসর নেওয়া মেসিকে জাতীয় দলে ফিরে আসার আকুতি জানিয়ে চিঠি লিখেছিল। সময়ের আবর্তে এনজোদের সংখ্যা কেবলই বেড়েছে। বাড়তে-বাড়তে বিশ্বব্যাপী মেসির বিশ্বায়ন ঘটেছে জ্যামিতিক হারে। এত দীর্ঘ সময় যাবত সারা বিশ্বের অসংখ্য এনজোদের উজ্জীবিত আর কোন প্লেয়ারই রাখতে পারেনি। ফলত: মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামের প্রায় লক্ষাধিক দর্শক একটা বিরল মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে গেছে। স্টেডিয়ামে মেসি মেসি আওয়াজ, দুই হাত ছড়িয়ে ঐতিহ্যবাহী আনন্দের ফল্গুধারা আর মোহাবিষ্ট হওয়ার অপরূপ নিদর্শন তাদের মানসে আজীবন অনুরণন ঘটাবে। মেসি তেমনই একজন; যাকে একবারই পাওয়া যায়...
জাতীয় দলের হয়ে হতাশার অধ্যায় শেষ করে মেসি যখন বেনিনের বিপক্ষে শেষ ম্যাচটা খেলেছে তখন তার নামে জ্বলজ্বল করছে অগণিত ফুট-রেকর্ড। টানা তিন ফাইনাল হারের আগে ছোট্ট মেসির প্রথম ফাইনাল হার কোপা আমেরিকা-২০০৭ সংস্করণে। তার আগে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জেতা হয় তার। ফাইনাল হারের পরে ২০০৮ অলিম্পিক সোনার পদক জয়ের পরেও তাকে সইতে হয়েছে নন-আর্জেন্টাইন তকমা। ছোট্ট মেসির সুযোগ ছিল স্পেনের হয়ে খেলার কিন্তু দেশের হয়ে খেলার তাড়নায় মেসি বেছে নেয় নিজ দেশ আর্জেন্টিনাকে। ধীরে ধীরে মেসি দলে নিজের উপস্থিতি জোরালো করতে থাকে কিন্তু সাফল্য ধরা দিয়েছে বড্ড যন্ত্রণা ও ক্লিশে অভিজ্ঞতা শেষে। কিন্তু ঐ যে ঐতিহাসিক প্রবাদ বাক্যের যথার্থতা: শেষ ভালো যার সব ভালো তার।
মেসি যেভাবে দীর্ঘকাল অর্থাৎ বছরের পর বছর, মৌসুমের পর মৌসুম ফুটবলে রাজত্ব করেছে, নিজের স্ট্যান্ডার্ড সেট করেছে অমন স্ট্যান্ডার্ড অদূর ভবিষ্যতে অন্য কোন প্লেয়ারের পক্ষে করা সম্ভবপর হবে না। হয়তোবা কেউ এসে মুড়িমুড়কির মতো গোল করবে, হয়তোবা কেউ এসে টপাটপ শিরোপা জিতবে হয়তোবা কেউ এসে অসম্ভব ভালো ড্রিবল করবে কিন্তু টোটাল ফুটবলে মেসির কাছাকাছি কেউই আসবে না! গোলে, অ্যাসিস্টে, ফ্রি-কিকে, ড্রিবলিং-এ এবং দুর্দান্ত ফুটবলসেন্সের যদি নতুন কেউ আসে তাহলে সেটা পৃথিবীর অতি-আশ্চর্যজনক ঘটনা হিসেবে খ্যাত হবে।
ফুটবলের অনিন্দ্যসুন্দর সব ক্ষণ উপহার দেওয়ার জন্য এই লেখা মূলত তাকে ধন্যবাদ দেওয়ার জন্য, মেসিকে নিয়ে নাহলে বহুবার লিখেছি, বহুবার তাকে প্রশংসায় ভাসিয়েছি। আমাদের শৈশব, কৈশোর রাঙ্গিয়ে দেওয়ার জন্য লিওনেল মেসি; আপনাকে ধন্যবাদ। কৃতজ্ঞচিত্তে আপনার অজস্র ফুট মুহূর্ত স্মরণে রাখব আজীবন।