Sylhet Today 24 PRINT

‘ওহে শাস্ত্রী, কথাটা একটু কম বলো তো’

সিলেটটুডে স্পোর্টস ডেস্ক |  ২৩ জুন, ২০১৫

এক ম্যাচ বাকি থাকতে বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজ হেরে যাওয়ার পর ভারতীয় দলকে রীতিমত ধুয়ে দিচ্ছে তাদের গণমাধ্যম ও সাবেক ক্রিকেটারেরা। সব মাধ্যম থেকে সমালোচনা আসছে। ভারতীয় টিম ডিরেক্টর রবী শাস্ত্রীকে সরাসরি আক্রমণও করে কৃষ্ণমাচারি শ্রীকান্ত টিভিতে উত্তেজিত হয়ে বলে ওঠলেন- ‘ওহে শাস্ত্রী, কথাটা একটু কম বলো তো।’

ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা ভারতের অধিনায়ক ধোনিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করালেও রেহাই পাচ্ছেন না দলের টিম ডিরেক্টর রবি শাস্ত্রী। হারের কারণ ব্যবচ্ছেদ করতে গিয়ে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডকেও (বিসিসিআইকে) দোষারোপ করা হচ্ছে।

সমালোচনামুখর কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা। সেখানকার ক্রীড়া সাংবাদিক গৌতম ভট্টাচার্যের লেখা ‘ব্যর্থতার দায় ধোনির বোর্ডেরও’ শিরোনামে ধোনি গ্যাংকে ধুয়ে দিলেও বাংলাদেশেরও প্রশংসা করেছেন তিনি।

বিরাট কোহলির কোচ (রবি শাস্ত্রী) যখন বলেন, ‘কালো রবিবার’, তখন আসলে বুঝতে হবে, ধোনির অধিনায়কত্বে কালো রবিবারের আগমন।

মিরপুরের রবিবারের মাঝরাত ভারতীয় ক্রিকেটকে আতঙ্কে-ক্ষোভে-সংশয়ে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়েছে। ২০০৭-এ পোর্ট অব স্পেনের বাংলাদেশি দুঃস্বপ্নের পরেও বলার সুযোগ ছিল, একটা খারাপ দিন গেছে। আবার যে দিন দেখা হবে, হারাব। এবার সেই সুযোগও নেই। পরপর দু’বার এবং ময়দানি ভাষায় দাঁড় করিয়ে হার।

ধোনিকে মুস্তাফিজুর সম্পর্কে বলতে শোনা গেছে, ওর রিস্ট স্পিডটা খুব ভাল। একই অ্যাকশনে যে গতির হেরফের করছে বোঝাই যায় না। তাই স্লোয়ারটা এত মারাত্মক হয়ে যায়। শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল প্রথম ম্যাচে রান নিতে যাওয়া ধোনির বাহাতি পেসারকে মহাবিতর্কিত বলশালী ধাক্কার চেয়েও তো এটা বেশি জোরালো পাল্টা ধাক্কা। বলছেন কী ধোনি! তিনি ব্রেট লি খেলেছেন, অ্যান্ডারসন খেলেছেন। মালিঙ্গাকে দিনের পর দিন দেখেছেন। কে এক মুস্তাফিজুর দেখে এমন ‘আবিষ্ট’ হয়ে গেলেন!

ভারতীয় সহ-অধিনায়কেরও কী অবস্থা! যে কোহলি ব্যাটসম্যান হিসেবে ভারতের সর্বকালের সেরা ওয়ানডে টিমে ঢুকে যাবেন, তিনি কিনা কাল ফ্রি হিট পেয়েও ডিফেন্স করলেন। নিউটন জন্মানোর পর এমন আজব কিছু বিশেষ ঘটেনি!

ভারতীয় ওয়ানডে দৃষ্টিভঙ্গিতেই আসলে প্রকাশিত হয়েছে একটা অসাড়তা। ভারত যেন ধরেই নিয়েছিল তারা ঢাকায় নামবে, খেলবে, জিতবে। যেন টগবগে এবং ফিটনেস-রূপান্তরিত একটা টিমকে নিজের মাঠে ওয়ানডেতে হারানোটা কলকাতায় ভীমনাগের দোকান থেকে সন্দেশ কেনা! বা ঢাকায় নেমে তার বিখ্যাত রেস্তোরাঁ কস্তুরীতে চিতল মাছ অর্ডার দেওয়ার মতো সহজ!

উপমহাদেশে যে ওয়ান ডে টেকনিক, রান তাড়া করার ধরন ও বোলিং স্টাইলের সাম্প্রতিক নানা মডেল তৈরি হয়েছে। মাশরফির এই বাংলাদেশ যে সেগুলো মেনেই পাকিস্তানকে ৩-০ হারিয়েছে, মনে হয় না টিমের ভিডিও অ্যানালিস্টেরও সেসব দিকে নজর ছিল।

শ্রীনির আমলে ধোনি ছিলেন ভারতীয় ক্রিকেটে একমেবদ্বিতীয়ম। টিমের জার্সির কী রং হবে থেকে শুরু করে কে মিডিয়া ম্যানেজার হবে। ডানকান ফ্লেচার থাকবেন কিনা? যুবরাজকে নেওয়া হবে কিনা? সব ঠিক করেছেন তিনি। ভারতীয় ক্রিকেটে ক্ষমতার হাইস্পিড ইন্টারনেটে অভ্যস্ত তিনি গত পাঁচ বছর। যখন ইচ্ছে লগ ইন করেছেন। যাকে ইচ্ছে ইনবক্সে ঢুকিয়েছেন। যাকে ইচ্ছে ডিলিট করেছেন। ক্ষমতা হ্রাসের নতুন জামানায় কি স্লো নেটওয়ার্ক পেয়ে মাথা ঠিক থাকছে না তার?

নইলে সিরিজের প্রথম যে ম্যাচটা তিনশো রান তাড়ার জন্য তার চার নম্বরে যাওয়া উচিত ছিল সেটায় গেলেন নিচে। আর যেটা প্রথম দিকে ব্যাটসম্যানরাই টার্গেট তৈরি করতে পারে, সেখানে রাহানেকে বাদ দিয়ে নিজে চারে। ধোনি তিনে বা চারে উন্নীত হয়ে যে টিম ইন্ডিয়াকে প্রচুর ম্যাচ জিতিয়েছেন তা নিয়ে সিসিডির কফি আড্ডাও হওয়ার উপায় নেই। ব্যাপারটা এতই অভ্রান্ত।

২০১১ বিশ্বকাপ ফাইনাল তো থেকেই যাবে সবচেয়ে বড় মণিহার হয়ে! অথচ মোহনদাস মেননের মতো জাদরেল স্ট্যাটিস্টিশিয়ানরা জানিয়ে দেবেন, গত তিন বছর সেই ধোনি একটা ম্যাচেও নিজেকে ওপরে তোলেননি। সেটা ছিল আনুগত্যের ফ্লেচার জামানা। কোচের সাহসই ছিল না ধোনিকে বলার, তুমি উপরে যাও। শাস্ত্রী আসার পরেও শুরুর দিকে বদলায়নি। নইলে ভারতীয় ক্রিকেটের অলিন্দে এই আলোচনাটা আজও চলত না যে, সিডনির বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ধোনি আগে নামলে ভারতের অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর সুযোগ ছিল।

আলোচনাটা কানে যাওয়া রবি শাস্ত্রী সে দিন বলছিলেন, ‘বোগাস। ওয়াংখেড়ে আর এসসিজি এক নাকি? পরিস্থিতি, পরিবেশ, প্রতিপক্ষ সব আলাদা।’ শাস্ত্রী যা-ই বলুন, আলোচনাটা যে অদৃশ্য হয়ে যায়নি, দ্বিতীয় ওয়ানডের ব্যাটিং অর্ডার দেখেই বোঝা গেল। যেটা বোঝা গেল না, ধোনির তা হলে নিজেকে নিয়ে ব্যাটিং স্ট্র্যাটেজিটা কী? এ তো চিন্তার কোনও ধারাবাহিকতাই থাকছে না।

একটা খারাপ সময়ের আবর্তে পড়া টিমের যা যা বৈশিষ্ট্য, গত চার দিনে পদ্মাপারের ভারতের মধ্যে মোটামুটি তার সব ক’টা ডিশ আছে। বাংলাদেশে ভাষা আন্দোলনের দিনের মতোই তার ক্রিকেটমহলে চিরস্মরণীয় থাকা উচিত জুনের এই একুশে! যা উপমহাদেশীয় ক্রিকেটে গোলিয়াথ সদৃশ ভারতকে ম্যাচের ২৪ ঘণ্টা পরেও এমন প্রশ্ন, আতঙ্ক আর কোন্দলজীর্ণ অবস্থায় ফেলে দিয়েছে।

অবাক লাগল ‘মওকা মওকা’ বলে বিদ্রুপের চেয়ে বাংলাদেশি সমর্থকেরা আরও নুনের ছিটে দেওয়া প্ল্যাকার্ড কেন ব্যবহার করলেন না, ‘মাহমুদউল্লাহ আমাদের সেরা ওয়ানডে ব্যাটসম্যান ছাড়াই তোদের বুড়িগঙ্গায় ফেললাম রে।’

দেশের ক্রিকেটমহলে ললিত মোদিকে ভুলে গিয়ে সোমবার দিন জুড়ে চলল এই জল্পনা যে, ধোনিকে কি আর অধিনায়ক রাখা উচিত? অবাক প্রশ্ন- এক্ষুণি ধোনি সরবেন কেন? এই তো সেদিন বিশ্বকাপে ৯ টার মধ্যে ৮টা ম্যাচ জিতেছে তার টিম ইন্ডিয়া। শাস্ত্রীকেও সময় দেওয়া উচিত বাংলাদেশের পরেই হঠাৎ বিদায় না দিয়ে। তা বলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সবচেয়ে প্রাজ্ঞ ওয়েবসাইট কী করে লেখে, ধোনি ২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ অবধি অধিনায়ক থাকছেনই। এর মধ্যে কঠিন শ্রীলঙ্কা সফর আছে। দক্ষিণ আফ্রিকা আছে। পাকিস্তানও আছে খুব সম্ভবত। এই একটা মীরপুর বিপর্যয়েই যা হাল, আর একটা বড় সিরিজ বিপর্যয়ে ধোনির অধিনায়ক ভাগ্য কাঠমাণ্ডুর সেই বাড়িগুলোর মতো দেখাতে পারে।

মুশকিল হল কে রিখটার স্কেলে কত মাত্রায় পড়বে, কে সেটা বাঁচিয়ে সন্তর্পণে হাইওয়ে ধরে চলবে, সেটা মাপবে কে? বোর্ড বলেছিল তিন সদস্যের অ্যাডভাইজরি কমিটি হবে সর্বক্ষমতাসম্পন্ন। সচিন-সৌরভ-লক্ষ্মণই নাকি ঠিক করবেন সব কিছু। টিমের ভূত-ভবিষ্যৎ-বর্তমান। প্রতিশ্রুতির তিন সপ্তাহের মধ্যেই এটা আপাতত রাজনৈতিক নেতাদের নির্বাচনী ভাঁওতাবাজির পর্যায়ে চলে গিয়েছে।

কমিটির সদস্যরা ‘ঢাকা-বিপর্যয়’ বিশ্লেষণ করতে হলে বোর্ডের তো ইতিমধ্যে তৎপর হওয়া উচিত। একটা উটকো কাগজে ভুল বার হলে দ্রুত বোর্ড প্রেসিডেন্টের আলিপুরের বাড়ি থেকে বিজ্ঞপ্তি আসে। ইদানিং তার এটাই স্টাইল। মুখে বলেন না, বিজ্ঞপ্তি দেন। তা এত বড় হারের পর বিজ্ঞপ্তি কোথায়? উপদেষ্টা কমিটিকেও তো কিছু জানানো হয়নি। সোমবার খোঁজ নিয়ে জানলাম, এর মধ্যে সচিন ইউরোপে। জানিয়ে দিয়েছেন, বছরে দু’সপ্তাহের বেশি কমিটির জন্য সময় দিতে পারবেন না। লক্ষ্মণ- তিনি হায়দরাবাদে। ফোন বেজে গেল। সৌরভ? সকালে ট্রেডমিলে ওঠার আগে জানালেন, তাকে কেউ কিছু বলেনি। নিজেদের টার্মস অব রেফারেন্সও জানেন না যে ক্ষমতার আওতা কতটা।

ভারত যে ওয়ানডে বিবর্তনে পিছিয়ে গিয়েছে, তার যে আগামী মাসে সাঙ্গাকারার দেশে যাওয়ার আগে স্মার্ট কিছু সংস্কার দরকার, পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু উপদেষ্টা কমিটি সেটা নিয়ে বসবে কী করে যদি তাদের স্রেফ সোনার দোকানের শো-কেস করে রেখে দেওয়া হয়!

সৌরভ গাঙ্গুলী অবশ্য এই বিপর্যয়ে সামান্য স্বস্তির নীল মেঘ দেখা উচিত। তিনি টিম ডিরেক্টর হিসেবে বাংলাদেশ গেলে আজকের আলোচনাটা কোথায় দাঁড়াত, সবাই জানে। এই যে সৌরভ ঢুকল...

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.