শাকিলা ববি | ১৮ মে, ২০২০
সিলেটের সমৃদ্ধ এক সংগ্রহশালা ভাষাসৈনিক মতিন উদ্দীন আহমদ জাদুঘর। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বিলুপ্ত হওয়া এবং হতে যাওয়া নির্দশন রয়েছে জাদুঘরটিতে। কিন্তু প্রচারের অভাবে অনেকটাই লোকচক্ষুর আড়ালে রয়ে গেছে এটি।
নগরীর দরগাগেইট এলাকার কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের ৫ম তলায় অবস্থান এই জাদুঘরের। কী নেই এখানে? লক্ষ বছর পুরানো পাথর হয়ে যাওয়া গাছের জীবাশ্ম, সোনার জরিখচিত মসলিন শাড়ি, ১৮৩৬ সালে সিলেটের জকিগঞ্জে মানুষ বিক্রির দলিল। দুই মন ওজনের হাতির দাঁত, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সৈনিক সূর্য কুমার সেনকে (মাষ্টার দা) ধরিয়ে দেওয়ার বিজ্ঞাপন- রয়েছে এরকম নানা কিছু।
সিলেট নগরীর ভিতরেই এরকম একটি সমৃদ্ধ জাদুঘর আছে, এই তথ্যই অনেকেই জানেন না। এই জাদুঘরে রয়েছে ১৩শ শতকের কালো পাথরের তৈরি তৈজসপত্র, শিলালিপি, তাম্রুলিপি, ১৮৮৩ সালের হস্তচালিত ছাপার মেশিন, ফার্সি কাবিন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত রকেট লঞ্চারের ক্যাপসুলসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র, জুলিয়াস সিজারের সময়ের মুদ্রা। কোনো ধরনের প্রচার নেই বলে এ জাদুঘর সম্পর্কে অনেকে জানেন না।
আজ ১৮ মে বিশ্ব জাদুঘর দিবস। বিশ্বের প্রথম জাদুঘর স্থাপিত হয় প্রাচীন গ্রিস ও মিসরে। ১৯৭৮ সালের ১৮ মে প্রথম বিশ্ব জাদুঘর দিবস পালিত হয়। বাংলাদেশে প্রায় শতাধিক জাদুঘর আছে। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও বিশ্ব জাদুঘর দিবস পালিত হবে দেশে। তবে এবার করোনাভাইরাস মহামারির প্রেক্ষিতে প্রথমবারের মতো ডিজিটাল পদ্ধতিতে বিশ্ব জাদুঘর দিবস পালিত হবে বলে জানিয়েছে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়। দিবসটি পালন উপলক্ষে এ বছরের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ হয়েছে ‘সাম্যের জন্য জাদুঘর: বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি’।
ভাষাসৈনিক মতিন উদ্দীন আহমদ জাদুঘর ২০০৪ সালে নগরীর জিন্দাবাজারের শুকরিয়া মার্কেটের ৪র্থ তলা থেকে যাত্রা শুরু করে। পরে ২০১৫ সালে হয় সিলেটের দরগাগেইটস্থ কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের ৫ম তলায় স্থানান্তর করা হয় এটি। এই জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও আজও অনেকটাই লোকচক্ষুর অন্তরালেই রয়ে গেছে।
বিজ্ঞাপন
সরেজমিনে দেখা যায়, এই জাদুঘরে রয়েছে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের মাথার খুলি, বিভিন্ন শতাব্দীর বন্দুক, পিস্তল, ১ হাজার বছর আগের রাজা চন্দ্র দেবের আমলের নাগরি ভাষায় লেখা তাম্রুলিপি, ১৮৩৬ ইংরেজি ও ১২৪২ বাঙলা মাহে ১০ আষাঢ় সিলেটের জকিগঞ্জের একটি মানুষ বিক্রির দলিল, ত্রিপুরার মহারাজা ও মহারানীর দলিলসহ বিভিন্ন সময়ের ঐতিহাসিক দলিল রয়েছে এই জাদুঘরে।
এখানে আরও রয়েছে নবাব আলীবর্দি খাঁ প্রদত্ত হাতির দাঁতের তৈরি হাত পাখা, বিভিন্ন দেশের প্রাচীন ব্যাংক নোট, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ব্যাংক নোট, শতাধিক বছর পুরনো দেয়াল ঘড়ি, হাত ঘড়ি, এমু পাখির ডিম, ১৮৬৬ সালে জকিগঞ্জ উপজেলার উত্তরকুল এর জমিদার পত্নি বেগম মুসিম রাজা চৌধুরীর ব্যবহৃত মিনি ড্রেসিং টেবিল, তেরশ বছরের পুরোনো কাল পাথরের তৈরি তৈজসপত্র, বিভিন্ন সময়ে ব্যবহৃত ক্যামেরা, ২ হাজার বছর আগের জুলিয়াস সিজারের সময়ের মুদ্রা, মদিনা ১৩২২ হিজরির মুদ্রা, ১৮৫৩ সালের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মুদ্রা।
আরও রয়েছে ১৭১৯ সালে জৈন্তাপুর থেকে প্রাপ্ত বাংলা হরফে এবং সংস্কৃতিক উচ্চারণে লিখা শিলালিপি ও প্রতিলিপি, সিলেটের জকিগঞ্জের ঐতিহাসিক গয়বী দিঘী থেকে প্রাপ্ত শিলালিপি। যার একপৃষ্ঠে আরবি লিপি এবং অন্য পৃষ্ঠে গৌতম বৌদ্ধের মূর্তি খোদাই করা। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের ব্যবহৃত পানদান, হাতির দাঁতের তৈরি খুটির খড়ম, হাতির দাঁতের তৈরি চায়নিজ খেলা মাহজং এর দান, নেপালের রাজা বিক্রম শাহদেব কর্তৃক মতিন উদ্দীন আহমদকে উপহার দেওয়া হাতির দাঁতের তৈরি দাবা খেলার গুটি, ১৬শ শতকের মোঘল আমলের বহুল প্রচলিত দস্তার উপর রোপার কারুকাজ বিদ্রি হুক্কা, প্রাচীন সাদা মাটির তৈরি হুক্কা, একখণ্ড গাছ থেকে খোদাই করা খাট, গরুর গাড়ি, পালকি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত ফিল্ড হাসপাতালের লোহার খাট, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত কামানের গোলার ক্যাপসুল, বন্দুকের কার্তুজ ও সৈনিকদের পানি রাখার পাত্র।
একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন ভাষাসৈনিক মতিন উদ্দীন আহমদ। তাই অনেক পুরাতন জিনিস সংগ্রহ করতেন তিনি। জাদুঘরের ২০ শতাংশ সংগ্রহ তার এবং ৮০ শতাংশ সংগ্রহ তার নাতি ও বর্তমানে এই জাদুঘরের পরিচালক ডা. মোস্তাফা শাহ জামান চৌধুরী বাহারের। ১৯৮০ সালে ভাষাসৈনিক মতিন উদ্দীন আহমদ মারা যান। মারা যাওয়ার আগে তার সংগ্রহে থাকা জিনিসপত্র তার নাতি ডা. মোস্তাফা শাহ জামান চৌধুরী বাহারকে দিয়ে যান।
ডা. মোস্তাফা শাহ জামান চৌধুরী বাহার জানান, তার নানার ইচ্ছা পূরণ করতেই এই জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। এখানে স্থানীয় দর্শনার্থীরা খুব একটা না আসলেও বিদেশি অনেক দর্শনার্থী আসেন। বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরাও আসেন এই যাদুঘরের সংগ্রহে থাকা প্রাচীন জিনিস দেখতে।