Sylhet Today 24 PRINT

নজিরবিহীন সঙ্কটে সিলেটের হোটেল-রিসোর্টগুলো

নভেল করোনাভাইরাস

নিজস্ব প্রতিবেদক |  ১৯ জুলাই, ২০২০

বছর দুয়েক আগে শ্রীমঙ্গলের রাধানগর এলাকায় একটি দ্বিতল বাসা ভাড়া নিয়ে ‘হিমাচল’ নামে একটি ছোট রিসোর্ট চালু করেছিলেন ঢাকার বাসিন্দা আজিজুর রহমান সাজু। ব্যবসা হচ্ছিলো ভালোই। তবে সব উলোট-পালট করে দেয় করোনাভাইরাস। প্রায় চার মাস ধরে পুরো বন্ধ রিসোর্ট। আয় নেই। তবু বাসা ভাড়া-বিদ্যুৎ বিল দিতে হচ্ছে। বেশিরভাগ স্টাফকে ছুটি দিয়ে দিলেও ভবন তদারকির জন্য দুয়েকজনকে রাখতে হয়েছে। তাদেরও বেতন দিতে হচ্ছে।

আজিজুর রহমান সাজু বলেন, মাসে আমার প্রায় এক লাখ টাকা লোকসান হচ্ছে। আমরা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। এভাবে মাসের পর মাস চালানো সম্ভব হবে না। এই পরিস্থিতি যদি দীর্ঘায়িত হয় তবে রিসোর্টটি বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া আমার আর কোনো উপায় থাকবে না।

সিলেট নগরীর নয়াসড়ক এলাকার হোটেল ফরচুন গার্ডেন'র সত্ত্বাধিকারী সুমাত নুরী জুয়েল। সিলেট হোটেল-রিসোর্ট ওনার্স এসোসিয়েশনেরও সভাপতি তিনি। হোটেল ভবন নির্মাণের জন্য ব্যাংক ঋণ নিয়েছিলেন তিনি। পুরনো ঋণ থাকায় নতুন ঋণও পাচ্ছেন না তিনি।

সুমাত নুরী জুয়েল বলেন, সরকার থেকে প্রণোদনা প্রদানের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এই প্রণোদনা পাচ্ছে কারা। আমাদের যাদের আগের ঋণ রয়েছে তাদেরকে তো ব্যাংক নতুন করে ঋণ দিচ্ছে না। আবার ঋণ নিলেও পরিশোধ করবো কি করে। ব্যবসা তো নেই। এ অবস্থা চলতে থাকলে অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে নেবে।

কেবল এই দু’জন নয়, এমন নজিরবিহীন সঙ্কটে রয়েছেন সিলেটের হোটেল-রিসোর্টখাতের সব উদ্যোক্তাই। অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার কথাও ভাবছেন।

গত এক-দেড় দশকে সিলেটে বিনিয়োগহীনতার কিছুটা পরিবর্তন এনেছে হোটেল-রিসোর্ট খাত। এ খাতে বিনিয়োগে এগিয়ে এসেছেন বেসরকারি উদ্যোক্তারা। এরই ধারাবাহিকতায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট। কেবল শ্রীমঙ্গল শহরেই গত পাঁচ বছরে গড়ে উঠেছে শতাধিক রিসোর্ট। পর্যটনখাতকেই সিলেট অঞ্চলের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ও বিনিয়োগের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ খাত হিসেবে আখ্যায়িত করে আসছিলেন সংশ্লিস্টরা।

বিজ্ঞাপন



পর্যটন নগরী হিসেবে পরিচিত সিলেটে গত এক দশকে পর্যটকও সমাগম বেড়েছিলো আশাব্যঞ্জক হারে। ছুটির দিনগুলোয় কোনো হোটেল-রিনোর্টের কক্ষ খালি পাওয়া যেত না। কিন্তু করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে একেবারে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন হোটেল-রিসোর্টের উদ্যোক্তরা। সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাতই এখন সবচেয়ে সঙ্কটে। ইতোমধ্যে হোটেল-রিসোর্ট খাতের ৯০ শতাংশ কর্মীকে বিনাবেতনে ছুটিতে পাঠিয়েছেন উদ্যোক্তরা।

সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আবু তাহের মো. শোয়েব। নগরীতে তার নিজেরও হোটেল ব্যবসা রয়েছে। শোয়েব বলেন, সিলেটে তেমন ভারী শিল্প-কারখানা নেই। ট্রেডিং, পর্যটন আর আমদানি-রফতানিই এখানকার প্রধান ব্যবসা। এরমধ্যে পর্যটনকেই সবচেয়ে সম্ভাবনাময় মনে করা হয়েছিলো। কিন্তু এই খাতের খাতের ব্যবসায়ীরা এখন করোনার কারণে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। দ্রুত তাদের ব্যবসা সচল হওয়ারও কোনো আশা নেই।

সিলেটের হোটেল-রিসোর্ট মালিকরা বলছেন, প্রতিদিন কেবল সিলেটের হোটেল-রিসোর্ট খাতে প্রায় ৩ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে। মাসে ক্ষতি প্রায় একশ’ কোটি টাকা।

সিলেটের খাদিম ও লালাখালে বড় বিনিয়োগে দুটি রিসোর্ট রয়েছে নাজিমগড় গ্রুপের। এগুলোতে কাজ করতেন প্রায় সাড়ে ৩শ’ কর্মী। এদের মধ্যে হাতেগোনা ছাড়া সবাইকেই ছুটি প্রদান করা হয়েছে।

রিসোর্ট দুটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজিম কামরান চৌধুরী বলেন, ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ। ফলে কর্মীদের ছুটি দিতে হয়েছে। সকলের বেতন দেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না।

আরেক সমস্যার কথাও শোনালেন নাজিম কামরান। তিনি বলেন, প্রথমে বিদ্যুৎ বিলে জরিমানা মওকুফের কথা বলা হয়েছিলো। ফলে আমরা গত তিন মাসে বিল দেইনি। কিন্তু এখন বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে বলা হচ্ছে, এই ঘোষণা শুধু গৃহস্থালির গ্রাহকদের জন্য। বাণিজ্যিক ও শিল্পের গ্রাহকদের জন্য নয়। ফলে জরিমানা দিতে হচ্ছে। এছাড়া ভুতুড়ে বিলও আসছে। রিসোর্ট চালু অবস্থায় যে পরিমাণ বিল আসতো এখন পুরো বন্ধ অবস্থায়ও একই পরিমাণ বিল আসছে। যা অনেকটা মরার উপর খড়ার ঘা।

একই ধরণের সমস্যার কথা বললেন মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের এসকেডি আমার বাড়ি রিসোর্টের পরিচালক সজল দাশও। তিনি বলেন, আমার ব্যাংক লোন আছে ২ কোটি টাকা। মার্চের ১১ তারিখ থেকে রিসোর্ট বন্ধ। কর্মচারীদের ছুটি দিয়েছি। এর মধ্যে বিদ্যুৎ বিলের জন্য চাপ আসছে। সব কিছু মিলিয়ে আমরা ঋণের জালে আটকে যাচ্ছি। পুঁজি হারানোর ভয়ে আছি।

বিজ্ঞাপন



একই এলিাকার হোটেল মেরিনার পরিচালক নাজমুল হাসান মিরাজ বলেন, আমার হোটেলটি ভাড়া নিয়ে করেছি। মাসিক ভাড়া ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। কর্মচারীদের বেতনসহ মাসিক খরচ আড়াই লাখ টাকা। বর্তমান অবস্থায় ঋণে জড়িয়ে পড়েছি। সরকারের সাহায্য ছড়া এই অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়াতে পারব না।
সিলেট হোটেল, মোটেল ও গেস্ট হাউজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানাযায়, এই সংগঠনের সদস্যভূক্ত হোটেল-রিসোর্ট রয়েছে ৩৪টি। তবে সিলেটে ছোট-বড় মিলিয়ে হোটেল-রিসোর্ট রয়েছে দুইশতাধিক। সিলেট বিভাগে এই সংখ্যা পাঁচ শতাধিক।

ঈদ পূজাসহ যে কোনো উৎসব বা সরকারি ছুটির দিনে অতিথিতে পূর্ণ থাকে এইসব হোটেল-রিসোর্ট। তবে গত ঈদুল ফিতরের মতো বড় উৎসবেও পুরোপুরি ফাঁকা ছিলো হোটেলগুলো। আসন্ন ঈদুল আযহায়ও একইভাবে ফাঁকা থাকবে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিস্টরা। গত বুধবার থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে হোটেল খোলার অনুমতি দিয়েছে প্রশাসন। এরপর কিছু হোটেল খুললেও অতিথি পাচ্ছে না কেউই। আর বেশিরভাগই এখনও বন্ধ আছে।

শ্রীমঙ্গল শহরের গ্রিনলিফ রিসোর্টের পরিচালক এস কে দাস সুমন বলেন, গত বছর ঈদের এক মাস আগেই আমার রিসোর্টের সব কক্ষ বুকড হয়ে যায়। এখানে বেশিরভাগ বিদেশী অতিথিরা আসেন। কিন্তু এবার ঈদে পুরো ফাঁকা ছিলো রিসোর্ট। আগামী ঈদেও রিসোর্ট বন্ধ থাকবে।

সিলেটের পর্যটন খাতের উন্নয়নে পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন হাসান মোরশেদ। তিনি বলেন, করোনা পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে আমরা জানি না। তবে স্বাভাবিক হলেও পর্যটন সেক্টরের সংকট কেটে যাবে না। কারণ মানুষের আয় কমবে। ফলে খরচ কমাবে। আগের মতো পর্যটকরা আসবেন না। এতে একেবারে শূন্য থেকে শুরু করতে হবে পর্যটন খাতের উদ্যোক্তাদের। ফলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অনেকেই হয়তো টিকতে পারবেন না।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.