এস আলম সুমন, কুলাউড়া | ২৫ জুলাই, ২০২০
করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে দেশের সরকারি বেসরকারি সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। সারা দেশের মতো মৌলভীবাজারের সবকটি কিন্ডারগার্টেনও (কেজি স্কুল) বন্ধ রয়েছে। এতে বেকার হয়ে পড়েছেন জেলার ৪১৪টি কিন্ডারগার্টেনের ৫ সহস্রাধিক শিক্ষক, শিক্ষিকা ও কর্মচারীরা। স্কুল বন্ধ থাকায় প্রায় ৫ মাস ধরে বেতনও পাচ্ছেন না তারা।
এ ছাড়াও এসব স্কুলের অনেক শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রাইভেট টিউশনিও করোনার কারণে বন্ধ রয়েছে। স্কুলের স্বল্প বেতন ও প্রাইভেট টিউশনির টাকা দিয়ে কোনরকম জীবিকা নির্বাহ করতেন অনেক শিক্ষক-শিক্ষিকারা। কারোনার কারণে আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অর্থাভাবে অনেকটাই মানবেতর জীবনযাপন করছেন এসব শিক্ষক-কর্মচারী। ধার দেনা করে এতদিন চললেও এখন অনেকের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। লোকলজ্জায় কাউকে বলতেও পারছেন না।
অনেক কিন্ডারগার্টেন কর্তৃপক্ষ তাদের প্রতিষ্ঠানের ভাড়া, বিদ্যুত বিল বকেয়া থাকায় প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে পারবেন কিনা সেই শঙ্কায় রয়েছেন। এদিকে জেলার এসব কিন্ডারগার্টেন যদি বন্ধ হয়ে যায় তাহলে স্কুলে পাঠদানকারী প্রায় ১ লক্ষাধিক সহস্রাধিক শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতও ঝুঁকির মুখে পড়বে। অর্থকষ্টে জীবন-যাপন করা শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টরা নগদ টাকা প্রণোদনা এবং এসব স্কুলকে সরকারি প্রক্রিয়ায় আনার দাবি জানিয়েছেন সরকারের কাছে।
জানা যায়, জেলায় কিন্ডারগার্টেন এসোসিয়েশন অন্তর্ভুক্ত ৪১৪টি কিন্ডার গার্টেন স্কুল রয়েছে। এসব স্কুলে ৫ হাজার ১৯০ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা ও কর্মচারি কর্মরত রয়েছেন। এবং প্রায় ১ লক্ষাধিক শিক্ষার্থী রয়েছেন। এই কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলো শিক্ষার্থীদের বেতন ও টিউশন ফি দিয়েই চলে। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত বেতনেই সকল শিক্ষক-কর্মচারীদের মাসিক সম্মানী প্রদান করা হয়। এবং প্রতিষ্ঠানের ভাড়া প্রদানসহ সকল ব্যয় নির্বাহ করা হয়। কিন্তু করোনা প্রতিরোধে সরকারি আদেশে সারা দেশের ন্যায় গত ১৭ মার্চ হতে জেলার অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সকল কিন্ডার গার্টেন স্কুল বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের কোন বেতন ও ফি নেওয়া যাচ্ছে না। টিউশন ফি বন্ধ থাকায় শিক্ষক ও কর্মচারীদের মাসিক সম্মানীও বন্ধ।
তাছাড়া অনেক অভিভাবক করোনা সংক্রমণের ভয়ে তাদের সন্তানদের কোচিং ও বাসায় প্রাইভেট পড়ানো বন্ধ করে দিয়েছেন। এতে এসব শিক্ষকদের আয়ের সব বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব শিক্ষকরা অর্থকষ্টে মানবেতর দিনযাপন করছেন। লাইনে দাঁড়িয়ে ত্রাণ গ্রহণ করতেও পারছেন না কেউ। এ ছাড়া শিক্ষার্থীর বেতন নির্ভর এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিষ্ঠানের টানা প্রায় ৫ মাসের ভাড়া ও অন্যান্য ব্যয় নির্বাহ করতে রীতিমত হিমশীম খাচ্ছেন। অনেকে ধার-দেনা করে এতদিন চালিয়েছেন আবার অনেকের এসব টাকা বকেয়া হয়ে পড়ায় তাঁদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার উপক্রম।
বিজ্ঞাপন
কিন্ডারগার্টেন সংশ্লিষ্টদের দাবি, সরকারি সহায়তা না পেলে ও কার্যকরী পদক্ষেপ না নেওয়া হলে শিক্ষা ক্ষেত্রে অপরিসীম ভূমিকা রাখা এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখা দায় হয়ে পড়বে। ঋণে জর্জরিত হয়ে অনেক কিন্ডার গার্টেন বন্ধ হয়ে যাবে। শিক্ষকরাও পেশা পরিবর্তন বাধ্য হবেন। এতে এসব স্কুলের শিক্ষার্থীদের শিক্ষার ভবিষ্যতও হুমকির মুখে পড়বে।
এদিকে গত ৮ জুলাই কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে মৌলভীবাজার জেলা সদরে ঘণ্টাব্যাপী অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন ‘মৌলভীবাজার জেলা কিন্ডার গার্টেন এসোসিয়েশন’ এর নেতৃবৃন্দ ও শিক্ষকবৃন্দ। অবস্থান কর্মসূচিতে করোনা সংকটে কিন্ডার গার্টেন স্কুলগুলোকে রক্ষা ও এর সাথে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারীদের আর্থিক প্রণোদনা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উদ্যক্তাদের সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থাসহ দশটি দাবি পূরণের জন্য প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের কাছে আহŸান করা হয়। পরে জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।
কিন্ডারগার্টেনের কর্মরত বেশ কয়েকজন শিক্ষক বলেন, স্কুলের সামান্য বেতন ও প্রাইভেট কোচিং এবং টিউশনি করে কোন মতে সংসার চালাতাম। মহামারি করোনা ভাইরাস বিপর্যয়ে স্কুল বন্ধ থাকায় মার্চ মাস থেকে বেতন পাচ্ছি না। শিক্ষার্থীরা বেতন বন্ধ থাকায় স্কুল কর্তৃপক্ষ নিরুপায়। অভিভাবকরা তাঁদের সন্তানদের প্রাইভেট টিউশনিও বন্ধ করে দিয়েছেন তাই গত ৫ মাস ধরে আয়ের পথও বন্ধ। হাতে থাকা জমানো টাকা ও ধার দেনা করে এতদিন চলেছি, আর অসম্ভব। এতদিন ধরে শিক্ষকতা করেছি তাই কারো কাছে কিছু বলতেও পারছিনা।
তারা আরো বলেন, করোনাকালীন সময়ে সরকার বিভিন্ন পর্যায়ে প্রণোদনা দিচ্ছে। আশা ছিলো আমাদেরকেও প্রণোদনার আওতায় আনা হবে। কিন্তু সম্প্রতি নন-এমপিও শিক্ষকদের প্রণোদনা দেওয়া হলেও আমাদের উপেক্ষিত রাখা হয়েছে এখনো। পরিস্থিতি কখন স্বাভাবিক হবে সেটারও নিশ্চিয়তা নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও সরকার আমাদের প্রতি সু-দৃষ্টি না দিলে আর এ পেশায় টিকে থাকা সম্ভব না।
কুলাউড়া পৌর শহরের আল-হেরা প্রি ক্যাডেট স্কুলে কর্মরত শিক্ষক সালমান হোসেন বলেন, লকডাউনের পর থেকে স্কুল বন্ধের পাশাপাশি অভিভাবকরাও করোনার ভয়ে প্রাইভেট পড়ানো বন্ধ করে দিয়েছেন। মার্চ থেকে বন্ধ। এর মাঝে আমাদের স্কুল কর্তৃপক্ষ নিজেদের উদ্যোগে ধার দেনা করে গত ঈদুল ফিতরের আগে এক মাসের বেতন দিয়েছিলেন। এখন আমাদের অনেকের চলা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন এসোসিয়েশন মৌলভীবাজার জেলার শাখা উপদেষ্টা ও শাহজালাল আইডিয়াল ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজের মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, বর্তমান মহামারি করোনা ভাইরাস সংকটে মানবেতর জীবন যাপন করছেন কিন্ডার গার্টেন স্কুলগুলোর শিক্ষকরা। এসব স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীর টিউশন ফি সংগ্রহ করে শিক্ষকদের বেতন ও স্কুলের ভাড়াসহ আনুষাঙ্গিক খরচ মিটাতে হয়।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, আনুষাঙ্গিক খরচ মিটিয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষ প্রতি শিক্ষককে স্কুল ভেদে ২ থেকে আড়াই হাজার টাকা সম্মানী দিতেন। গত প্রায় ৫ মাস ধরে বর্তমানে স্কুল বন্ধ থাকার কারণে এ যৎসামান্য সম্মানীও বন্ধের পাশাপাশি অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের প্রাইভেট পড়ানো বন্ধ করে দেওয়ায় অর্থকষ্টে দিশেহারা এই শিক্ষকবৃন্দ। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে কিন্ডার গার্টেন এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানাচ্ছি।
বাংলাদেশ কিন্ডার গার্টেন এসোসিয়েশন মৌলভীবাজার জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম বলেন, আমাদের জেলায় এসোসিয়েশনের অন্তর্ভুক্ত ৪১৪টি কিন্ডারগার্টেনে প্রায় ৫ সস্রাধিক শিক্ষক ও কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। শিক্ষার্থী রয়েছেন প্রায় এক লক্ষাধিক। করোনার প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে দীর্ঘদিন কর্মহীন থাকায় কিন্ডার গার্টেন স্কুল শিক্ষকদের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এখনতো করোনার সংক্রমণ আরো বৃদ্ধি পাওয়ায় কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে সেটাও অনিশ্চিত। স্কুল ভাড়া, বিদ্যুতবিলসহ অন্যান্য খরচ দিয়ে কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলো টিকিয়ে রাখা এখন প্রায় অসম্ভব। বিষয়টি নিয়ে সরকারকে গুরুত্ব সহকারে ভাবতে হবে। নতুবা কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর ভবিষ্যত হুমকির মুখে পড়বে।
তিনি বলেন, দেশের প্রাথমিক ও জুনিয়র পর্যায়ের শিক্ষার বিকাশে সরকারি স্কুলগুলোর পাশাপাশি কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলো গুরুতপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে এসব স্কুলকে সহজ শর্তে ঋণ ও শিক্ষকদের সরকারি প্রণোদনার আওতায় আনতে হবে। এবং ভবিষ্যতে এমন সংকটকালে যাতে এই প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টরা এরকম বিপাকে না পড়েন সেজন্য সরকারের পক্ষ থেকে কিন্ডার গার্টেনগুলোকে গুরত্ব দেওয়া উচিত। এজন্য কিছুদিন আগে দশ দফা দাবি বাস্তবায়নে আমরা বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন এসোসিয়েশনের ব্যানারে জেলা শহরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছি এবং জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছি। কিন্ডারগার্টেন শিক্ষকদের এমন মানবেতর জীবযাপনের প্রতি সু-দৃষ্টি দিবেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন এটাই।