কমলগঞ্জ প্রতিনিধি | ১৫ আগস্ট, ২০২০
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতে স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের হাতে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। এ ঘটনার পরদিন ১৬ আগস্ট সারা দেশে ঘাতক চক্রের হোতা খন্দকার মোস্তাকের নির্দেশে মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দদের গ্রেপ্তার করে শুরু করা হয়েছিল শারীরিক নির্যাতন। গ্রেপ্তার হওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের অনেক দিন কারাবন্দী রাখা হয়েছিল। এমনি দুজন মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিচারণ করলেন সে দিনের কথা।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ধলই সাব সেক্টরের সাব কমান্ডার ও কমলগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন (অব:) সাজ্জাদুর রহমান (৮০) বলেন, ১৫ আগস্ট রাতে সপরিবারে ঘাতকরা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর, সারা দেশের মত কমলগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধাদের গ্রেপ্তার শুরু করে। ১৬ আগস্ট দিবাগত রাত ৩টায় শমশেরনগর ইউনিয়নের শিংরাউলী গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে কমলগঞ্জ থানার পুলিশের একটি দল তাকে গ্রেপ্তার করে একটি ট্রাকে তুলে শারীরিক নির্যাতন করে। পরে চৈত্রঘাট এলাকায় নিয়ে সেখান থেকে মুক্তিযোদ্ধা সমরু মিয়াকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে আসে শমশেরনগর ডাক বাংলোয়। এখানে এনে এক পুলিশ সদস্য হাতে থাকা লাঠি দিয়ে সজোরে কয়েকবার আঘাত করে। এসময় তার চিৎকারে আশপাশের বাসার মানুষজন জেগে উঠেছিলেন। পরে দ্রুত তাদের কমলগঞ্জ থানায় নিয়ে হাজতখানায় আটকে রাখা হয়।
থানার হাজতখানায় তিনি দেখতে পান শমশেরনগরের মুক্তিযোদ্ধা মিহির ধর চৌধুরী কাজল, কমলগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল গফুর ওরফে নেতা গফুর হাজতে আটক রয়েছেন। তার আত্মীয় স্বজনরা এ দিনই ঢাকায় গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক কর্নেল (অব:)আতাউল গনি ওসমানীর কাছে গিয়ে বিষয়টি অবহিত করলে, এ বিষয় নিয়ে পুলিশের উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা করেন। একদিন এক রাত হাজতে রাখার পর কমলগঞ্জ থানার তৎকালীন ওসি সুশীল চাকমা তাকে ছেড়ে দেন। ছেড়ে দিলেও আটকের পরের পুলিশি নির্যাতন তিনি আজও ভুলতে পারেননি বল জানান।
শমশেরনগরের মুক্তিযোদ্ধা মিহির ধর চৌধুরী বলেন, ১৬ আগস্ট ১৯৭৫ রাতে কমলগঞ্জ থানার পুলিশের একটি দল একটি দোকান থেকে ডেকে এনে তাকে আটক করে। এ খবর পেয়ে শমশেরনগরের অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারা আত্মগোপন করেন। তিনি থানা হাজতে গিয়ে দেখেন সেখানে মুক্তিযোদ্ধা নেতা গফুর, ক্যাপ্টেন সাজ্জাদসহ আরও অনেককেই পুলিশ আটক করে রেখেছে। কমলগঞ্জ থানা হাজতে তাকে ১১ দিন আটক রেখে প্রতি রাতেই দ্বিতীয় কর্মকর্তা এসআই তালুকদারের নেতৃত্বে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে, শেখ মুজিবের অনুসারী ও মুক্তিযোদ্ধা বলে অস্ত্র কোথায় রেখেছ প্রশ্ন করে। মুক্তিযুদ্ধের পর অস্ত্র জমা করে দিয়েছে বলার পরও চলতো শারীরিক নির্যাতন। থানা হাজতে রেখে তার মতো মুক্তিযোদ্ধা নেতা গফুরসহ অন্যান্যদের প্রতি রাতে নির্যাতন চালায় পুলিশ। এরপর পাঠায় মৌলভীবাজার কারাগারে। সেখান থেকে আবার ২ দিন রিমান্ডে এনেছিল পুলিশ।
তিনি বলেন, মৌলভীবাজার কারাগারে গিয়ে দেখা হয় শ্রীমঙ্গলের মুক্তিযোদ্ধা মোহন সোম, মুক্তিযোদ্ধা শ্রীমঙ্গল পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা এম এ রহিম, রাজনগরের মুক্তিযোদ্ধা সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা আছকির মিয়া, জুড়ির মুক্তিযোদ্ধা আওয়ামী লীগ নেতা সাবেক চেয়ারম্যান আসুক মিয়াসহ বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেপ্তার হওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে। তখন একে অন্যের সাথে নিজ নিজ থানা হাজতে থাকা অবস্থায় নির্যাতনের বর্ণনা দেন। বিষয়টি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক কর্নেল (অব) বঙ্গবীর আতাউল গনি ওসমানী সে সময়ের রাষ্ট্রের দায়িত্বে থাকা খুনি চক্রের উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা করলে, পরবর্তীতে গ্রেপ্তার হওয়া নির্যাতিত মুক্তিযোদ্ধাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
স্মৃতি চারণ করে নির্যাতিত মুক্তিযোদ্ধারা বলেন, এত আন্দোলন সংগ্রাম করে একটি স্বাধীন দেশ ও পতাকা আনলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আর মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সপরিবারে নির্মমভাবে বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে হত্যা করে স্বাধীনতা বিরোধী চক্র। সেই ব্যথা বেদনার সাথে তাদেরকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে নির্যাতন করার সেই ব্যথা বেদনা আজও তারা ভুলতে পারছেন না। সরকারের কাছে তাদের দাবি বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী যারা এখন ও বিদেশে পালিয়ে আছে তাদের এনে শাস্তি দিতে হবে।