মোসাইদ রাহাত, সুনামগঞ্জ | ২৭ আগস্ট, ২০২০
বৃষ্টির মৌসুম এলেই হাওরাঞ্চলে দেখা দেয় বজ্রপাতের শঙ্কা। দেশের সবচেয়ে বজ্রপাত প্রবণ এলাকা হাওরবেষ্টিত জেলা সুনামগঞ্জ। বজ্রপাতে হতাহতের সংখ্যাও এখানে বেশি। গত ৬ বছরে এই সুনামগঞ্জ জেলায় বজ্রপাতে মৃত্যুবরণ করেছেন অন্তত শতাধিক ব্যক্তি। যদিও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কাছে বজ্রপাতে মৃত্যুর সঠিক কোনো হিসাব নেই।
সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার ও জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, সুনামগঞ্জে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাতে মারা যায় ২০১৮ সালে। সেই বছর সুনামগঞ্জের হাওরগুলোতে বজ্রপাতে ২৫ জন মারা যান এবং সেটিই সুনামগঞ্জের একবছরের সর্বোচ্চ মৃত্যু। এছাড়া ২০১৪ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত মারা গিয়েছেন প্রায় অর্ধশত মানুষ। তাছাড়া ২০১৯ সালে প্রাণ হারান ৯ জন এবং চলতি বছরে আগস্ট পর্যন্ত বজ্রপাতে প্রাণ হারান আরও ১০ জন। এদিকে দুর্দশা পিছু ছাড়ছে না বজ্রপাতে মৃত ব্যক্তিদের পরিবারের।
এদিকে ২০১৭ সালের নাসা ও মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় বলা হয়, সারা বিশে ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কঙ্গোর কিনমারা ডেমকেপ এলাকায়, মার্চ থেকে মে পর্যন্ত বাংলাদেশের সুনামগঞ্জে এবং জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ভেনিজুয়েলার মারাকাইবো লেক এলাকায় সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত আঘাত হানে। সুনামগঞ্জে মার্চ থেকে মে এ তিন মাসে প্রতি বর্গকিলোমিটার এলাকায় ২৫টিরও বেশি বজ্রপাত আঘাত হানে। ভৌগলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে দেশের পূর্বাঞ্চলে বজ্রপাতের পরিমাণ প্রাকৃতিকভাবেই বেশি। ভারতের খাসি পাহাড় ও মেঘালয় এলাকায় মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত মেঘ জমে থাকে। স্তরীভূত মেঘে মেঘে ঘর্ষণের ফলে ওই এলাকার পাদদেশে অবস্থিত সুনামগঞ্জ জেলায় বজ্রপাতের সংখ্যাও বেশি হয়ে থাকে।
ঠিক এভাবেই বাংলাদেশের হাওর প্রধান জেলা সুনামগঞ্জে প্রতিবছর বজ্রপাতে প্রাণ হারায় অনেক মানুষ। হাওর প্রধান জেলা হওয়ায় কৃষি ও মৎস্য আহরণ এই দুইটি সুনামগঞ্জের আয়ের প্রধান উৎস হলেও সেই হাওরেই প্রতিবছর বজ্রপাতে প্রাণ দিতে হয় অনেককে। সরকার থেকে বজ্রপাতে মারা যাওয়া পরিবারকে ২০ হাজার টাকা দেওয়া হলেও কারো কারো ভাগ্যে সেই টাকাও থাকে না। তাছাড়া বজ্রপাতে মারা যাওয়া পরিবাররা ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য দেওয়া হয়না কোন প্রকার ঋণ। পরিবারের আয়ের একমাত্র ব্যক্তিকে হারিয়ে পথে বসার উপক্রম হয় অনেকের।
বিজ্ঞাপন
সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার চরানচর ইউনিয়নের ললুয়ারচর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল খালেক। চলতি বছরের ৪ জুন প্রবল বৃষ্টিপাত ও ঝড়ের মধ্যে উপজেলার মিলন বাজার সংলগ্ন হাওরে মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রপাতে মারা যায় আব্দুল খালেকের বড় ছেলে তকবির হোসেন (২০)। বড় ছেলে তকবির ছিলো একজন জেলে। প্রতিনিয়ত হাওরে মাছ শিকার করে বিক্রি করে পরিবারের ভরণ পোষণের দায়িত্ব নিয়েছিলো সে। কিন্তু একটি দুর্ঘটনায় পরিবারের একটি সদস্যও ভালো নেই। ছেলে মারা যাওয়ার পর আব্দুল খালেকের সুখের জীবনে অন্ধকার নেমে আসে। ছেলে মারা যাওয়া পর সরকারি সহায়তাও পাননি তিনি।
খালেক মিয়া সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোরকে বলেন, আমার ছেলে তকবির হোসেন হাওরে মাছ ধরতো। আমার তিন ছেলে এক মেয়ের সংসারে সে আছিল সবার বড়। কিন্তু গেল মাসের ৪ জুন টেলা জাল দিয়ে হাওরে মাছ ধরতে গিয়ে আমার বজ্রপাতে মারা যায়। সে মারা যাওয়ার পর থকি আমি রোজ কামলার কাজ করি। কোনদিন ১৫০ টাকা তো কোনদিন ২০০ আবার কোনদিন একটাকাও না। আমার ছেলে মারা যাওয়ার পর কোন সরকারি সহায়তাও দেওয়া হয়নি। এছাড়া কোন ব্যাংকও আমাদের ঋণ দেয় না। আমারে যদি কোন বড় মনের মানুষে একটা অটোরিকশা কিনার টাকা বা ঋণ দিতো তাইলে আমি সারা জীবন ওই মানুষটার কাছে কৃতজ্ঞ থাকতাম।
২০১৮ সালে সুনামগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চল শাল্লা উপজেলায় হাওরে ধান কাটতে গিয়ে প্রাণ হারান জয় সেন দাস। পরিবারের একমাত্র আয়ের ব্যক্তি ছিলেন তিনি। প্রথমদিকে কাপড়ের ব্যবসা করতেও সেই ব্যবসায় লাভের ছেয়ে বাকি বেশি হয়ে যাওয়ায় দুঃখে ব্যবসা ছেড়ে চলে যান কৃষি কাজ করতে। সেখানে মহাজনের কাছ থেকে চাষের জমি নিয়ে ধান রোপণের করতেন তিনি। কিন্তু ২০১৮ সালে উপজেলার ছায়ার হাওরে ধান কাটতে গিয়ে বজ্রপাতে প্রাণ হারান তিনি। জয় সেনের বাবা নিখিল চন্দ্র দাস একই বছর উনার মা, ছেলে ও এক আত্মীয়কে হারিয়ে মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছেন। এখন কোন কিছু মনে রাখতে পারেন না। ছেলে কথা মনে হলে মাঝে মধ্যে কেঁদে ফেলেন। জয় সেনের ঘরেও আছে দুইটি সন্তান। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়েও চিন্তিত জয় সেন দাসের স্ত্রী সুমি রাণী দাস।
জয় সেন দাসের ছোট ভাই অজয় সেন দাস বলেন, দাদা মারা যাওয়ার পর থেকে বাবা কোন কিছু মনে রাখতে পারেন না। একটি বছরেই বাবা অনেক কিছু হারিয়ে ফেলেছেন। দাদা মারা যাওয়ার পর সরকার থেকে আমাদের ২০ হাজার টাকা দেওয়া হলেও সেই টাকা দিয়ে আমাদের পরিবার বেশিদিন যায়নি। এখন আমি হাটে ঘাটে কাজ করে যা পাই তা দিয়া সংসার চালাই। আমার জয় দাদা’র কাপড়ের ব্যবসা ছিলো কিন্তু আয় থেকে বাকি বেশি আর দাদা মারা যাওয়ার পর সেই বাকির টাকা চাইতে গিয়ে কোন বাকি নাকি পান না তারা, মারা যাওয়ার আগে সব টাকা পরিশোধ করে দেওয়া হয়েছে। দাদার ঘরে দুইটি সন্তান আছে তাদের উজ¦ল একটি ভবিষ্যৎ রয়েছে আমরা কিভাবে কি করবো কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। সরকার থেকে আমাদের ঋণ বা বড় অঙ্কের আর্থিক অনুদান দিলে একটি ব্যবসা দিবো সেই ব্যবসায় দিয়েই আশা করি পরিবারকে চালাতে পারবো।
অন্যদিকে জামালগঞ্জ উপজেলা সদর ইউনিয়নের দক্ষিণ কামলাবাজ গ্রামের সান্ত্বনা বেগম। ২০১৯ সালে বজ্রপাতে একমাত্র ছেলে অন্তর রহমান (৬) ও স্বামী সাবিবুর রহমানকে হারিয়েছেন তিনি। ছেলেকে স্কুল থেকে আনতে গিয়ে বজ্রপাতের আঘাতে প্রাণ হারান তারা দুইজন। সান্ত্বনা বেগমের স্বামী কৃষি কাজ করতেন এবং সেই সময় থেকেই তাদের সংসার অভাব অনটনের মধ্য দিয়ে চলতেছে। ছেলে ও সন্তান মারা যাওয়ায় ঘরে খাবার আনার মানুষ নেই, নেই কোন আয়ের মানুষও। সান্ত্বনা বেগমে তিন ছেলে মেয়ের মধ্যে একমাত্র ছেলেকে তিনি হারিয়েছেন বর্তমানে তার দুই মেয়েই একমাত্র ভরসা। তাদের পড়াশুনা ও নিজের ভাঙ্গা ঘরের মেরামতের জন্য সরকারের কাছে সহযোগিতা চেয়েছেন সান্ত্বনা বেগম।
বিজ্ঞাপন
স্বামী ও ছেলে হারানো সান্ত্বনা বেগম বলেন, আমার একমাত্র ছেলেটারে স্কুল থকি বাড়ি আনার সময় সে আর তার বাবা বজ্রপাতে মারা যায়। সরকার থকি আমরারে ৪০ হাজার টাকা দিলেও সেই টাকা দিয়া ঋণ ও মেয়ের পড়াশুনায় চলে গিয়েছে এখন আমার ঘরটিও যেকোনো দিন ভেঙে যাবে। আমি চাইবো না আমার মতো করে কেউ অসহায় হোক। বর্তমানে বাপের বাড়ি থেকে খাবার আসে সেইটা দিয়ে আমরা চলি। আমি সরকারের কাছে আমার ভাঙা ঘরটা মেরামত ও আমার মেয়েগুলা যেন পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পারে সেজন্য সহযোগিতা চাইবো।
এদিকে হাওরে বজ্রপাত থেকে মানুষদের সচেতন ও প্রাণহানি কমাতে তালগাছ না লাগিয়ে হাওরে ও খোল জায়গায় নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে বজ্র নিরোধক দণ্ড লাগানো ও বজ্রপাতে মারা যাওয়া পরিবারকে মোটা অংকের একটি অনুদান এবং সকল হাওরের কৃষক ও মৎস্যজীবীদের মধ্যে বজ্রপাত থেকে নিরাপদ থাকার জন্য সচেতনমূলক প্রচারণা জোরদার করার দাবি জানান হাওর উন্নয়নে সংশ্লিষ্টরা।
এ ব্যাপারে হাওর এরিয়া আপলিপটমেন্ট সোসাইটি (হাউস) এর নির্বাহী পরিচালক সালেহীন চৌধুরী শুভ বলেন, সুনামগঞ্জে সবচেয়ে বজ্রপাত প্রবণ এলাকা। সেই এলাকায় বজ্রপাত নিরোধে তালগাছ লাগানোর পরিকল্পনা ভুল। সুনামগঞ্জে প্রতিবছর বজ্রপাতে কৃষক মৎস্যজীবীরা প্রাণ হারান তাই সরকারকে সুনামগঞ্জ জেলায় প্রতি গুরুত্ব প্রদান করে হাওর ও খোলা জায়গায় অতিদ্রুত বজ্র নিরোধক দণ্ড লাগাতে হবে। এছাড়া মারা যাওয়া পরিবারকে বড় অঙ্কের আর্থিক অনুদানসহ হাওর এলাকার মানুষদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল আহাদ বলেন, সুনামগঞ্জে হাওরে বজ্রপাত থেকে মানুষের মৃত্যু সংখ্যা কমিয়ে আনার জন্য আমরা কয়েকদিন আগে দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মহোদয়ের সাথে কথা হয়েছে। তিনি বলেছেন সুনামগঞ্জের প্রতিটি হাওরে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে বজ্র নিরোধক দণ্ড লাগানো হবে এবং সেখানে যেন যারা কাজে যাবেন তারা আশ্রয় নিতে পারেন সেজন্য একটি আশ্রয়কেন্দ্রও তৈরি করা হবে।
তিনি আরও বলেন, আমরা প্রথমদিকে সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি একটি তালিকা প্রেরণ করেছি বজ্রপাতে মারা যাওয়া প্রতি পরিবারকে একলক্ষ টাকা করে অনুদান প্রদানের জন্য একটি তালিকা প্রেরণ করা হয়েছে, সেই টাকা দিয়ে বজ্রপাতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।