Sylhet Today 24 PRINT

মালিক প্রবাসী, তাই পতিত পড়ে আছে ২ লাখ হেক্টর আবাদযোগ্য জমি

সেচ সঙ্কট, পাহাড়ি ঢল, আগাম বন্যা, প্রবাসীবহুলতা, শ্রমবিমূখতা, শ্রমিকসঙ্কটসহ নানা কারনে সিলেট অঞ্চলের আবাদযোগ্য জমিগুলো বছরের পর বছর ধরে পতিত পড়ে থাকে

নিজস্ব প্রতিবেদক |  ২২ অক্টোবর, ২০১৫

সিলেটে দক্ষিণ সুরমা উপজেলার শ্রীরামপুর গ্রাম। গ্রামটির বিস্তৃর্ণ এলাকাজুড়ে পতিত পড়ে আছে ধানী জমি। লম্বা ঘাস গজিয়েছেয়ে জমিতে। জমিগুলোর মালিক প্রবাসী। ফলে এসব জমিতে চাষাবাদ হয় না।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, গত ৮/৯ বছর ধরে এসব জমিতে কোনো ফসল ফলানো হয় নি। শ্রীরামপুর গ্রামের উত্তরভাগ মৌজায় প্রায় ২০ হেক্টর আবাদযোগ্য জমি অনাবাদি অবস্থায় পড়ে আছে বলে উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে।

এই এলাকার যুক্তরাজ্য প্রবাসী আব্দুর রউফের ৫ হেক্টর জমি পতিত পড়ে আছে। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, আমরা দেশে থাকি না। বর্গা দিলে কোনো ফসল পাওয়া যায় না। বর্গা চাষীর কাছ থেকে একেক বছর একেক অজুহাত শুনতে হয়। বন্যা, খরা, পোকাড় আক্রমন, মড়ক ইত্যাদি। অনেক সময় ধান চাষের জন্য আমাকেই খরচ জোগাতে হয়। তারউপর জমি বেদখল হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে অহরহই। তাই চাষের জমি ফেলে রাখাই উত্তম। এতে অন্তত বেদখল তো হবে না।

উপজেলা কৃষি কর্মকতা শরিফুল ইসলাম বলেন, সিলেট প্রবাসীবহুল অঞ্চল। এখানকার বেশিরভাগ জমিরই মালিকই প্রবাসে থাকেন। বেদখল হয়ে যাওয়ার ভয়ে তারা জমি বর্গা দিতে চান না। ফলে অনেক আবাদযোগ্য জমি পতিত পড়ে থাকে।

তিনি বলেন, সিলেটের ব্যাংকে অঢেল টাকা পড়ে আছে, তবে ব্যাংক ভর্তি টাকা থাকলেও এখানকার লোকজনের মাঠ ভর্তি ফসল নেই। ব্যাংকে যদি টাকা না থাকতো তাহলে সিলেটের জমি অনাবাদী অবস্থায় পড়ে থাকতো না।

গোলাপগঞ্জ উপজেলায় ঘোষগাও এলাকায় গিয়েও দেখা যায় একই চিত্র। পতিত পড়ে আছে আবাদযোগ্য জমি। তবে এই এলাকার সমস্যা ভিন্ন। এখানে সেচ সঙ্কটের কারনে জমি পতিত ফেলে রেখেছেন ভূ-স্বামীরা। একে তো মাটির নিচে পানি পাওয়া যায় না। তারউপর বেশিরভাগ ভূমিই টিলা শ্রেণীর হওয়ায় কৃত্রিম জলাধারও নেই। সেচের অভাবে জমিকে ফসল উৎপাদন হচ্ছে না।

স্থানীয় স্কুল শিক্ষক আশরাফুল আলম বলেন, এই এলাকায় ডিপটিউবয়েল বসাতে গেলে পানির বদলে গ্যাস পাওয়া যায়। টিলাভূমি হওয়ায় কৃত্রিম জলাধার তৈরি করাও অনেক কষ্টসাধ্য ও ব্যয়সাপেক্ষ। সেচ সুবিধা না থাকায় এখানে চাষাবাদে খুব একটা সুফল পাওয়া যায় না এবং আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হয়ে যায়। ফলে জমিতে ফসল চাষ করতে স্থানীয়রা খুব একটা আগ্রহী নন।

সিলেট বিভাগজুড়ে এমন চিত্র খুঁজে পাওয়া যাবে অহরহ। ঢাকা থেকে সড়ক বা রেলপথে সিলেট যাওয়ারপথে সিলেট অঞ্চলে প্রবেশ করার সাথেসাথেই চোখে পড়বে রাস্তার দূপাশে বিস্তৃর্ণ পতিতজমি। ফসলের বদলে ঘাষ গজিয়েছে জমিতে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসেব মতে সিলেট অঞ্চলের মোট আকাদযোগ্য জমির প্রায় ২০ শতাংশই অনাবাদি অবস্থায় পড়ে আছে। সেচ সঙ্কট, পাহাড়ি ঢল, আগাম বন্যা, প্রবাসীবহুলতা, শ্রমবিমূখতা, শ্রমিকসঙ্কটসহ নানা কারনে এখানকার জমিগুলো পতিত পড়ে থাকে বলে জানিয়েছেন কৃষি কর্মকর্তারা।

সিলেটে অনাবাদি অবস্থায় পড়ে আছে সিলেটের প্রায় দুই লাখ হেক্টর আবাদযোগ্য জমি। এসব জমি আবাদের আওতায় আনা গেলে বছরে কমপক্ষে ৬ লাখ ট্রক টন ফসল বেশি পাওয়া যেতো বলে জানিয়েছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও নানা সচেতনতামূলক প্রচারণার ফলে সিলেটে আবাদযোগ্য পতিত জমির পরিমান দিনদিন কমছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিস্ট কর্মকর্তারা। তাদের দাবি, ৫/৬ বছর আগেও সিলেটে মোট আবাদযোগ্য জমির ৩৫ শতাংশই অনাবাদি অবস্থায় ছিলো। এবছর তা ২০ শতাংশে এসে নেমেছে। সিলেটে মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমান ৭ লাখ ৮২ হাজার ৯৫৮ হেক্টর।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সিলেটের মাটির নিচে পানি পাওয়া যায় না। বেশিরভাগ এলাকায় গ্যাস ও পাথর উঠে আসে। এছাড়া জমিগুলো অপেক্ষাকৃত উঁচু হওয়ায় এতে সেচ প্রদান প্রয়াশই সম্ভব হয় না। ফলে এসব জমিগুলোর বেশিরভাগই থেকে যায় অনাবাদি। কেবল সেচের ব্যবস্থা করতে পারলেই সিলেট অঞ্চলে বোরোর আবাদ অনেকটা বেড়ে যেতো।

সেচের সংকট ছাড়াও শ্রমিক সংকটের কারনেও সিলেটে অনাবাদী থেকে যায় অনেক জমি। এছাড়া সিলেটে অনাবাদি জমির বড় একটা অংশের মালিক প্রবাসীরা। বেহাত হয়ে যাওয়ার ভয়ে তারা জমি বর্গা দেন না।
সংশ্লিস্টদের মতে, সিলেটে জমি জবর দখলের প্রবণতা বেশি। সিলেটের আদালত ও থানায় যত মামলা আছে তার বেশিরভাগই জমি সংক্রান্ত। প্রতিদিনই সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চলে জমি দখল-পণর্দখল নিয়ে মারামারির ঘটনা ঘটে। এসব কারনে সবসময় জমি বেদখল হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় ভূগেন প্রবাসীরা। ফলে তারা জমি বর্গা দিতে চান না। এছাড়া আত্মীয়স্বজনরা প্রবাসে থাকায় সিলেটে বসবাসকারীরা অনেকটাই কর্মবিমূখ। শারিরীক পরিশ্রম এড়িয়ে চলেন তারা। এসব কারনে বছরের পর বছর ধরে জমি পতিত পড়ে থাকে। এখানকার অনেক জমি উৎপাদনের আওতায় নিয়ে আসা যাচ্ছে না। এছাড়া পহাড়ি ঢলে ফসলাহানি হয়ে যাওয়ার ভয়ে উৎপাদন বিমুখ থাকেন অনেকে।

সিলেটে কৃষি সম্প্রসার অধিদফতরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০৮-২০০৯ সালে সিলেট বিভাগে ৭ লাখ ৮২ হাজার ৯শ’ ৫৮ হেক্টর আবাদি জমির মধ্যে রবি (বোরো) মৌসুমে অনাবাদী ছিলো প্রায় ৩৫ ভাগ জমি। যার পরিমান ২ লাখ ২৮ হাজার ৯শ’ ৮০ হেক্টর। খরিপ-১ (আউশ) মৌসুমে অনবাদী ছিলো ২ লাখ ১৬ হাজার ৪শ’ ৮৭ হেক্টর জমি। খরিপ-২ (আমন) মৌসুমে অনাবাদী ছিলো ৯৩ হাজার ৫শ’ ৮৬ হেক্টর জমি। চলতি বছরে অনবাদি জমির পরিমান অনেকটা কমে এসেছে বলে জানিয়েছেন কৃষি কর্মকতারা। এবছর অনাবাদি ছিলো ১ লাখ ৯৭ হাজার ৪৫৬ হেক্টর জমি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সিলেটের উপ-পরিচালক কৃষ্ণ চন্দ্র হোড় বলেন, মূলত সেচের অভবের কারনেই সিলেটে বিশাল অংশের জমি পতিত থেকে যাচ্ছে। এখানকার বেশিরভাগ এলাকার মাটির নিচে গ্যাস ও পাথর। তাই পানি পাওয়া যায় না। সরকারী উদ্যোগে সেচের ব্যবস্থা করলে অনেক জমিই চাষের আওতায় চলে আসতো। এছাড়া নিচু এলাকা পানিতে নিমজ্জিত থাকার কারণে আউশ মৌসুমে অনেক জমি অনাবাদী থাকে।

কৃষ্ণ চন্দ্র বলেন, আমরা কৃষকদের বিকল্প সেচের ব্যবস্থা করতে সচেতন করে তুলছি। প্রচারণা চালাচ্ছি। এতে অনেক সুফল পাওয়া গেছে। অনাবআদি জমির পরিমানও কমেছে।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.