Sylhet Today 24 PRINT

তাহিরপুরে চুনাপাথর খনি : অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে ৬০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি

জাহাঙ্গীর আলম ভুঁইয়া, তাহিরপুর |  ১১ অক্টোবর, ২০২০

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের (বিসিআইসি) নিয়ন্ত্রণাধিন টেকেরঘাট চুনাপাথর খনিজ প্রকল্পের কাজ প্রায় দুই যুগ বন্ধ আছে। কাজ দীর্ঘদিন আগে বন্ধ হলেও এখনও প্রকল্পে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি পড়ে আছে ওই স্থানে। দীর্ঘদিন ধরে খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকায় অযত্ন-অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে প্রায় ৬০ কোটির বেশি টাকার এসব যন্ত্রপাতি। এসব যন্ত্রাংশের বেশিরভাগই অকেজো হয়ে গেছে।

ইতিমধ্যে চুরি হয়েছে প্রায় ২০ কেটি টাকার মূল্যবান যন্ত্রাংশ। এছাড়া কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় স্থানীয় প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেট প্রকল্প এলাকার জমি দখল করে নিয়েছে।

চুনাপাথর খনিজ প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, দেশের সিমেন্টের চাহিদা পূরণ করতে ১৯৪০ সালে সুরমা নদীর তীরে ছাতকে প্রতিষ্ঠা করা হয় আসাম বেঙ্গল সিমেন্ট ফ্যাক্টরি (বর্তমানে যা ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরি)। তখন ভারত থেকে চুনাপাথর আমদানি করা হত। নিজস্ব ব্যবস্থায় চুনাপাথর উত্তোলনের জন্য ১৯৬১ সালে ভূ-তত্ত্ব জরিপ চালিয়ে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের ভাঙ্গারঘাট ও সীমান্তবর্তী টেকেরঘাটে ৫টি কুপ খনিতে প্রায় ১৩ কোটি ২৫ লাখ ৫৬ হাজার ৫শত ৩৪ মেট্রিক টন চুনাপাথর মজুদ থাকার বিষয় নিশ্চিত হয়। ১৯৬৫ থেকে ৬৬ সাল পর্যন্ত টেকেরঘাট খনিজ প্রকল্পের ৩শত ২৭ একর জায়গার মধ্যে চুনাপাথর খনিজ প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করে ৭০ দশমিক ৬৯ একর এবং ৯২ দশমিক ২৫ একর এলাকায় ২টি কোয়ারিতে প্রথম চুনাপাথর উত্তোলন কাজ শুরু করে লাভের মুখ দেখে। এরপর একাধারে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত মাত্র ১৬ লাখ ৬৩ হাজার ৭শত ৮৩ মেট্রিক টন চুনাপাথর উত্তোলন করা হয়। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের (বিসিআইসি) অসাধু কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শ্রমিক সংগঠনের কিছু স্বার্থান্বেষী লোকজনের কারণে লাভের এ প্রকল্পটি হঠাৎ করে লোকসানের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। পরে বিসিআইসির প্রতিষ্ঠান ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরির অধীনে স্থানান্তরিত হয়। এরপর ১৯৯৬ সালের দিকে খনিজ প্রকল্পটিকে বন্ধ করে দিলে প্রায় ৪শত শ্রমিক কর্মচারীকে বিসিআইসির অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে বদলি করা হয়। সর্বশেষ ২০০৭ সালের ২ অক্টোবরে ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে ৩১ জন কর্মকর্তা কর্মচারীকে বদলি করা হলে প্রকল্পটির কার্যক্রম একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। এখানে ৬০ কোটির বেশি টাকার যন্ত্রপাতি ছিল।

সরেজমিনে বন্ধ থাকা চুনাপাথর খনিজ প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অরক্ষিত অবস্থায় খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে প্রায় কোটি টাকা মূল্যের ৩টি ক্রেন, ৩ কিলোমিটার ন্যারোগ্যাজ রেল লাইন, ২০ লাখ টাকার স্লিপার, ৫ কোটি টাকার মূল্যের ২টি জেনারেটর, ২ কোটি টাকা মূল্যের লোকাল ট্রলি ইঞ্জিন ও ৫টি টিপিং টাব, বেকু হেলি, লোডার, ওয়ার্কসপ, ওয়েব্রিজসহ চুনাপাথর উত্তোলনের কাচাঁমাল ও মূল্যবান যন্ত্রাংশ।

এসব দেখভাল ও রক্ষনাবেক্ষনের জন্য ২০০৭ সালের পর ১ জন কর্মকর্তা, ১জন এপিসি, ১জন পিসি ও ১৮জন আনসার সদস্য পদায়ন করা হয়। এরপরও খনিজ প্রকল্পে এ পর্যন্ত ২০টির বেশী চুরির ঘটনা ঘটে। বর্তমানে একবারেই অরক্ষিত অবস্থায় থাকায় চুরি বৃদ্ধি পেয়েছে এমন অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অভিযোগ উঠেছে, চুরির ঘটনায় প্রকল্পের নিরাপত্তায় নিয়োজিত কিছু ব্যক্তির যোগসাজশ রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা শফিক মিয়া, আমিন উদ্দিনসহ আরও কয়েকজন আলাপকালে বলেন, ‘বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়াত্ত চুনাপাথর খনিজ প্রকল্পের বর্তমান সরকারি কোয়ার্টার স্থানীয় প্রভাবশালীরা দখল করে ভাড়া দিয়েছেন। দখল হয়েছে প্রকল্প এলাকার বেশিরভাগ সরকারি জমি। দিন দিন এই দখলের পরিমাণ বাড়ছে। কিন্তু সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় সংশ্লিষ্টদের কোনো উদ্যোগ নেই।’

তাহিরপুর কয়লা আমদানিকারক গ্রুপের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও সুনামগঞ্জ জেলা সেচ্ছা সেবকলীগের সহ সভাপতি আবুল খায়ের বলেন, ‘চুনাপাথর খনিজ প্রকল্প এলাকায় চুরি বৃদ্ধি পেয়েছে। মূল্যবান যন্ত্রাংশ রাতের আঁধারে বিক্রি করছে একটি সিন্ডিকেট। খোলা স্থানে পড়ে আছে কোটি কোটি টাকার সরকারি সম্পদ। সরকারি সম্পদ রক্ষা করে এখানে আগত পর্যটকদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করলে এই এলাকায় বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে সরকারি সম্পদের সৌন্দর্য বাড়বে।’

আলাপকালে তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুনা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল বলেন, ‘সাবেক শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু এখানে এক জনসমাবেশে বলেছিলেন এখানে সরকারিভাবে শিল্প কারখানার তৈরী করে বেকার ও কর্মহীনদের জন্য কর্মসংস্থানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করবেন। তার কথা অনুযায়ী এখানকার হাজার হাজার বেকার ও কর্মহীনদের জন্য কর্মসংস্থানে ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে সরকারি সম্পদ রক্ষা হবে। পাশাপাশি বেকার ও কর্মহীনদের কর্মসংস্থান হবে।’

এ ব্যাপারে ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল বারি বলেন, ‘টেকেরঘাটে চুনাপাথর খনিজ প্রকল্পে আপাতত কোনো কিছু করার পরিকল্পনা নেই। তবে এখানে সিমেন্ট ফ্যাক্টরি করার আলোচনা চলছে। প্রকল্পের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেবেন। এখানে কি পরিমাণ মালামাল আছে তা সঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না। এসব মালামাল দেখাশোনা করার জন্য আনসার সদস্য আছেন। আমি নিজে দেখে এসেছি বাইরে রাখার মালামালগুলো বাইরে রাখা হয়েছে। অন্যগুলো নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভেতরেই আছে।’

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.