Sylhet Today 24 PRINT

হাওরাঞ্চলে হতদরিদ্রদের জন্য ভাসমান শিক্ষাতরী

তাহিরপুর প্রতিনিধি |  ১২ অক্টোবর, ২০২০

নদীতে ও হাওরের পাশেই ভাসমান স্টিলবডির নৌকা। পাটাতনের ওপর লাল গালিচা বিছানো। নৌকার ভেতর স্কুল। পাঠদানের পাশাপাশি মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ আনন্দ-বিনোদনের মধ্যে লেখাপড়া। সম্পূর্ণ বিনা খরচে যত্নসহকারে কোমলমতি শিশুদের পড়ানো হয়। ফ্রি দেওয়া হয় বই, খাতা, কলমসহ শিক্ষা উপকরণ। ব্র্যাকের শিক্ষাতরীতে শিক্ষার এমন পরিবেশে পড়াশোনা করতে কার মন না চায়। কিন্তু করোনা সবকিছুই শেষ করে দিয়েছে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তাই নৌকায় ক্লাস হচ্ছে না

তবে চলমান বিশ্ব শিক্ষা সপ্তাহে সবার জন্য উচ্চতর এবং উন্নতমানের শিক্ষার প্রসারে সর্বোত্তম কাজের স্বীকৃতিস্বরুপ বিশ্বব্যাপী ১০০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার ভাটি জামালগড়ের ব্র্যাকের শিক্ষাতরী স্কুল বোট স্কুল ও শাল্লা উপজেলা সাউধেরশ্রী ব্র্যাক প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থান পেয়েছে।

ব্র্যাকের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, 'ভাসছে তরী উঠছে ঢেউ, শিক্ষার বাইরে থাকবে না কেউ' এমন স্লোগান নিয়ে ভাটি অঞ্চলে ২০১২ সালে নৌকায় চালু করা হয় ভাসমান প্রাথমিক স্কুল। যা 'শিক্ষা তরী' নামে এলাকায় পরিচিত। ভাসমান তরীতে নির্ধারিত সময়ে ৮ থেকে ১৪ বছর বয়সী ঝরে পড়া শিশু-কিশোরদের চিহ্নিত করে প্রথম শ্রেণী থেকে ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত ছাত্র-ছাত্রীদের পাঠদান করানো হয়। সমাপনী পরীক্ষায় পাশ করে হাই স্কুলে ভর্তি হবে। এক গ্রামে ৩০টি শিশু পাওয়া না গেলে পার্শ্ববর্তী গ্রাম থেকে অন্য শিশুদের নৌকা দিয়ে আনা হয়। তারা নির্দিষ্ট সময়ে উপস্থিত হয় এবং একজন শিক্ষিকা নার্সিং পদ্ধতিতে পাঠদান করায়। শিক্ষা কার্যক্রম শেষে আবার তাদের বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হয়।

আরও জানা যায়, সুনামগঞ্জ জেলায় ৯০টি ভাসমান শিক্ষাতরী চলমান ছিল। বর্তমানে ২৩টি ভাসমান শিক্ষাতরী জেলার তাহিরপুর, দিরাই, শাল্লা, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলাসহ ৬টি উপজেলায় চলমান আছে। এর মধ্যে তাহিরপুর উপজেলায় ৬টি। হাওর এলাকার যেসব গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই, সেসব এলাকায় শিক্ষাতরীর অবস্থান। ব্র্যাকের ভাসমান শিক্ষাতরীতে শিক্ষার সুফল পেয়েছে হাওরাঞ্চলে হতদরিদ্র শিশুরা।

শিক্ষাতরীতে শিক্ষার্থীদের জন্য আছে টয়লেটের সুব্যবস্থা। স্টিলবডির সুবিশাল তরীতে রয়েছে ৪টি করে বোর্ড রিং। যাতে শিশুরা পানিতে পড়ে গেলে বোর্ড রিং ধরে জীবন রক্ষা করতে পারে।

তাহিরপুর উপজেলা তাহিরপুর-বাদাঘাট সড়কের হুনারঘাট এলাকার ব্র্যাকের শিক্ষাতরীর ৫ম শ্রেণীর শিক্ষার্থী মাজেদা বেগম জানায়, নৌকায় পাঠ্যদান তার ভাল লাগে। বর্তমান করোনা পরিস্থিতির কারণে ক্লাস হয় না। তবে কয়েকজন মিলে কোন এক বাড়িতে বসে শিক্ষিকা পড়ায়।

একেই এলাকার শিক্ষার্থীর অভিভাবক তুলা মিয়া জানান, ব্র্যাকের শিক্ষা কার্যক্রম ভালই। টাকা পয়সা লাগে না। আমি শ্রমিক মানুষ। আমার একমাত্র মেয়েকে পড়ানো কষ্ট হত ব্র্যাক স্কুল না থাকলে। আমার উপকার হয়েছে। করোনার কারণে নৌকায় পড়াশোনা হয় না।

মাসুক মিয়া, সাবজল হোসেনসহ হাওরাঞ্চলে সচেতন মহল জানান, জেলার হাওরাঞ্চলে পর্যাপ্ত স্কুল না থাকার কারণে বর্ষা মৌসুমে ছোট নৌকায় হাওর পাড়ি দিয়ে শিক্ষার্থীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে পাঠাতে অভিভাবকরা ভয় পান। এছাড়াও রয়েছে নানান সমস্যার কারণে হতদরিদ্র, দিনমজুর ও অসহায় পরিবারের শিশুরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আর ঝরে পড়া ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষা দানের উদ্যোগেই ব্র্যাক স্কুলের উদ্যোগ।

সুনামগঞ্জ জেলা ব্র্যাক সমন্বয়কারী এ কে (আবুল কালাম) আজাদ জানান, ঝরে পড়া শিশুদের শিক্ষার আওতায় আনতে চালু হয়েছিল নৌকায় শিক্ষাতরী। এই শিক্ষাকর্যক্রম পূর্বে (২০১১-১৮) পর্যন্ত বাহিরের দেশের অর্থায়নে চললেও এখন ব্র্যাকের নিজস্ব অর্থায়নে চলমান। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সকল কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও জুম কনফারেন্সের মাধ্যমে পাঠদান করানো হচ্ছে।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.