নিজস্ব প্রতিবেদক | ৩১ ডিসেম্বর, ২০২০
অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা সিনাহা মো. রাশেদ হত্যার রেশ তখনো কাটেনি। ১০ জুলাই কক্সবাজারের টেকনাফে ওই ঘটনার পর তোপের মুখে পুলিশ। দুই বাহিনীতে দেখা দেয় টানাপোড়েন। এমন অবস্থায় সিলেটের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির একটি ঘটনায় আবার প্রশ্নের মুখে পড়ে পুলিশ।
ঘটনাটি মেজর সিনহা হত্যার ঠিক ৩ মাস পর, ১০ অক্টোবর রাতের। তবে জানাজানি হয় পরেরদিন সকালে।
১১ অক্টোবর সকালে ওসমানী মোিডকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে এক যুবকের মরদেহ পাওয়া যায়। পুলিশের পক্ষ থেকে তখন জানানো হয়, ছিনতাই করতে গিয়ে ১০ অক্টোবর রাতে নগরের কাষ্টঘরে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন রায়হান আহমদ (৩৪) নামের ওই যুবক। ঘটনাস্থল থেকে লাশ উদ্ধার করে পুলিশ হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করে বলেও তখন জানানো হয়।
পুলিশের বরাত দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে গণপটুনিতে যুবকের মৃত্যুর খবরও প্রচার হয়। তবে ঘটনার মোড় ঘুরে যায় ১১ অক্টোবর বিকেল থেকে। বিকেলে রায়হান আহমদকে পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগে নগরের আখালিয়া এলাকায় বিক্ষোভ শুরু করেন তার পরিবারের সদস্যরা ও এলাকাবাসী। রায়হান আখালিয়ার নেহারিপাড়া এলাকার মৃত রফিকুল ইসলামের ছেলে।
সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভকালে রায়হানের চাচা হাবিবুল্লাহ অভিযোগ করেন, ১০ অক্টোবর রাত ১১টার দিকে রায়হান আহমদ ঘর থেকে বের হন। এরপর থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। ১১ অক্টোবর ভোরে একটি অপরিচিত নাম্বার থেকে রায়হান আহমদ তার মায়ের মোবাইলে কল দিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তিনি বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে আছেন। ১০ হাজার টাকা এনে দিলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে।
ফোন পেয়ে ভোরেই টাকা নিয়ে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে যান হাবিবুল্লাহ। তবে রায়হানের সাথে দেখা করতে দেয়নি পুলিশ। সকালে তাকে জানানো হয়, রায়হান অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাকে ওসমানী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এরপর ওই হাসপাতালের মর্গে গিয়ে রায়হানের মরদেহ দেখতে পান চাচা আব্দুল্লাহ।
রায়হানের পরিবারের এমন বক্তব্য গণমাধ্যমে আসার পর তোলপাড় শুরু হয়। প্রথমে সিলেট মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করা হলেও চাপের মুখে তাদের সুর নরম হতে থাকে। সন্ধ্যার পর ঘটনার তদন্তে মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এবং ওই রাতেই হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে মামলা করেন রায়হানের স্ত্রী তামান্না আক্তার।
মহানগর পুলিশের তদন্তে রায়হানকে বন্দরবাজার ফাঁড়িতে ধরে এনে নির্যাততের সত্যতা পাওয়া যায়। এরপর ওই তদন্ত কমিটির সুপারিশে ১২ অক্টোবর এই ফাঁড়ির ইনচার্জের দায়িত্বে থাকা উপপরিদর্শক (এসআই) আকবর হোসেন ভূঁইয়াসহ চারজনকে সাময়িক বরখাস্ত ও তিনজনকে প্রত্যাহার করা হয়। সাময়িক বরখাস্থ হয়ে পুলিশ লাইন্সে থাকা অবস্থায় ১৩ অক্টোবর পালিয়ে যান আকবর হোসেন ভূইয়া।
রায়হানের মৃত্যুর পর থেকেই তাকে হত্যার অভিযোগ এনে আন্দোলন শুরু করে পরিবার। পরদিন থেকেই পুরো সিলেটজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিচারের দাবিতে রাস্তায় নেমে আসে মানুষ। আকবরের পালিয়ে যাওয়ার খবর তাদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয়।
এদিকে, রায়হানের স্ত্রীর দায়েরকৃত মামলা প্রথমে কতোয়ালি থানা পুলিশ তদন্ত করলেও পরে তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর কাছে হস্তান্তর করা হয়। পিবিআই দায়িত্ব নেয়ার পর ১৫ অক্টোবর কবর থেকে তুলে রায়হানের দ্বিতীয় দফা ময়না তদন্ত করা হয়। দুই ময়না তদন্তেই রায়হানের শরীরে শতাধিক আঘাতের প্রমাণ পাওয়া যায়।
এছাড়া ঘটনার দিন বন্দরবাজার ফাঁড়িতে কর্মরত থাকা তিন পুলিশ সদস্য এএসআই আশেক এলাহি, কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাস এবং হারুনুর রশীদকে গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পিবিআই।
এরপর গত ৯ নভেম্বর সিলেটের কানাইঘাট সীমান্ত থেকে আকবর হোসেন ভূইয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। ভারতে পালানোর সময় তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে পুলিশ দাবি করে। যদিও সীমান্তবর্তী এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, আকবরকে কানাইঘাটের ডোনা সীমান্তের ওপারে খাসিয়া পল্লীর বাসিন্দারা আটক করে বাংলাদেশে পাঠালে পুলিশ তাকে গ্রোর করে। তিনি ১৪ অক্টোবরই পালিয়ে ভারত চলে গিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গ্রেপ্তারের পর আকবরকে ৭ দিনের রিমান্ডে নেয় পিবিআই।
এই মামলায় এ পর্যন্ত ৪ পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়া হলেও তারা কেউই আদালতে স্বীকারোক্তিমলক জবানবন্দি দেননি।
এই মামলা প্রসঙ্গে পিবিআই সিলেটের পুলিশ সুপার খালেদ উজ জামান বলেন, মামলার তদন্ত কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। শীঘ্রই আমরা এই মামলার অভিযোগপত্র প্রদান করবো।
এদিকে, রায়হানের মৃত্যু ও আকবরের পালিয়ে যাওয়ার পর থেকেই এসবের সাথে পুলিশের উর্ধতন কর্মকর্তারাও জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। উর্ধতন কর্মকর্তাদেরও বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান আন্দোলনকারী নাগরিকেরা। গ্রেপ্তার হওয়ার পর এসআই আকবরও বলেছিলেন, ‘সিনিয়র কর্মকর্তাদের পরামর্শে’ তিনি পালিয়েছিলেন।
দাবির প্রেক্ষিতে আকবর হত্যায় পুলিশের গাফিলতি তদন্তে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ১৯ অক্টোবর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ২৫ অক্টোবর পুলিশ প্রধানের কাছে দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করে প্রতিবেদন দেয় তদন্ত কমিটি। এরপর সিলেট কতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সৌমেন মৈত্র, রায়হান হত্যা মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আব্দুল বাতেন ভ’ইয়া ও বন্দরবাজার ফাঁড়ির দায়িতরত এএসআই কুতুব আলীকে সাময়িক বরখাস্থ করা হয়। রায়হান হত্যা ও আকবরের পালিয়ে যাওয়া নিয়ে সমালোচনার মুখে গত ২২ অক্টোবর সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার গোলাম কিবরিয়াকে বদলি করা হয়।