কমলগঞ্জ প্রতিনিধি | ০২ ফেব্রুয়ারী, ২০২১
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন বাগানের চা শ্রমিক জনগোষ্ঠীসহ নিম্ন আয়ের লোকজন গরম কাপড়ের অভাবে দিনাতিপাত করছেন খুবই কষ্টে। শীতের কারণে বয়স্ক ও শিশুদের মধ্যে ঠান্ডাজনিত রোগ এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের মৃত্যুহারও বেড়ে গেছে।
গাছ গাছালি ও সবুজে ঘেরা থাকায় সাধারণত চা বাগান সমুহে শীত, মৃদু বাতাস ও কুয়াশা কিছুটা বেশি থাকে। ফলে ঘন কুয়াশা, তীব্র শীত ও মৃদু বাতাসে কাবু হয়ে পড়ছেন চা শ্রমিকরা।
সরেজমিন কমলগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি চা বাগান ঘুরে জানা যায়, গত কয়েকদিন ধরে প্রচণ্ড ঠান্ডায় চা বাগানের শ্রমিকদের মধ্যে ঠান্ডাজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়ে চলেছে। বিশেষতঃ শিশু ও বয়োজ্যেষ্ঠরা ঠান্ডায় সর্দি-কাশি, জ্বর, শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়া রোগে ভূগছেন। হাসপাতালেও চা বাগানের রোগীর সংখ্যা বেশি। নিম্ন আয়ের লোকদের গরম কাপড় কেনা সামর্থ্যের বাইরে। শীত নিবারনে এসব পরিবার সদস্যরা ঘরের ভেতরে ও বাইরে খড়খুটো দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে শীত শরীর গরম রাখছেন। তবে কর্মজীবি নারী ও পুরুষ শ্রমিকরা ভোরে নাস্তা সেরেই কুয়াশার মধ্যেই কাজে চলে যাচ্ছেন। কুয়াশার কারনে সেকশনে চা গাছ ভেজা থাকায় এর মধ্যেও তাদের কাজ করতে হয়। অনেকে চা গাছের কুয়াশার পানিতে ভিজতে হয়। রোগব্যাধী ও ঠান্ডার কারণে সম্প্রতি সময়ে উপজেলার আলীনগর, চাম্পরায়, পাত্রখোলা, মৃর্ত্তিঙ্গা, শমশেরনগর, দেওছড়া, কানিহাটি, কুরমাসহ বিভিন্ন চা বাগানে বয়োজ্যেষ্ঠ বেশ কিছু লোকের মৃত্যু হয়েছে। গরম কাপড়ের অভাব ও ঠান্ডায় বয়সী লোকদের মৃত্যুহার বেড়ে গেছে বলে চা শ্রমিকরা দাবি করছেন।
চা শ্রমিকদের চিকিৎসায় ডানকান ব্রাদার্স শমশেরনগর চা বাগানে ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন হাসপাতালের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্রে জানা যায়, চা শ্রমিক পরিবার সদস্যরা শীতে শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, গলাব্যাথা, ডায়রিয়া ও আমাশয়ে আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। সর্দি, জ্বর ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশু রোগী পাওয়া যাচ্ছে। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে এক সপ্তাহ আগে একজনের মৃত্যুও হয়েছে। তবে হাসপাতালের কোনো চিকিৎসক সংবাদ মাধ্যমে এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি নন।
ইউপি সদস্য ও চা শ্রমিক নেতা সীতারাম বীন, চা শ্রমিক সংঘের নেতা রাজদেও কৈরী, নারী চা শ্রমিক নেত্রী গীতা রানী কানু বলেন, ‘শীত আসার পর চা বাগানের বয়সী লোকদের মৃত্যুহার বেড়ে গেছে। গত কয়েকদিনের মধ্যে আলীনগর চা বাগানের রাম বরশ শুক্লবৈদ্য, রাধা রবিদাস, দেওছড়া চা বাগানের রণছত্রী, কানিহাটি চা বাগানের মুকদা মৃধাসহ বয়স্ক অনেকেরই মৃত্যু হয়েছে। সবগুলো চা বাগানে একই অবস্থা।’
তারা আরও বলেন, ‘মাত্র ১২০ টাকা মজুরি। আর জিনিসপত্রের দামও খুব বেশি। আমরা চা শ্রমিকরা খাইবো কি আর কাপড় চোপড় কিনবোই বা কি? তারা খুবই কষ্টে দিনযাপন করছেন বলে দাবি করেন।’
ভানু রবিদাস, মিঠুন গোয়ালা, দেওরাজ রবিদাস, হরি নারায়নসহ চা শ্রমিকরা বলেন, ‘অভাব অনটনের সংসারে বাসস্থান সংকট, গরম কাপড়ের অভাব সব মিলিয়ে শীতে তাদের কষ্ট আরও একধাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। ঠান্ডায় সর্দি, জ্বর, শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়া রোগের উপদ্রব বাড়ছে। মাত্র ১২০ টাকা দৈনিক মজুরিতে পাঁচ, সাত সদস্যের পরিবারের সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। তিন বেলা ঠিক মতো খাবার যোগানোই সম্ভব নয়।’
তারা আরো বলেন, ‘খড়খুটো বিছিয়ে কেউ কেউ ঘুমানোর ব্যবস্থা করেন। কেউ কেউ বস্তা বিছিয়ে ঠান্ডা থেকে রক্ষার চেষ্টা করেন। চিকিৎসা ব্যবস্থাও নাজুক। ডিসপেনসারীগুলোতে ভালো চিকিৎসা সুবিধা নেই।’
কমলগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত প্রায় ৭ হাজার কম্বল দরিদ্র লোকদের মধ্যে ইতিমধ্যে বিতরণ করা হয়েছে।’
এব্যাপারে কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এম মাহবুবুল আলম ভূঁইয়া ঠান্ডাজনিত রোগ বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘চা বাগানে প্রাথমিক চিকিৎসার কিছু ব্যবস্থা রয়েছে। তারপর ক্যামেলিয়া হাসপাতাল আছে। এরপরও উপজেলা হাসপাতালে চা বাগানের ঠান্ডায় আক্রান্ত লোকদেরও আসতে দেখা যায়।’