দেবাশীষ দেবু, শাল্লা (সুনামগঞ্জ) থেকে ফিরে | ২৫ মার্চ, ২০২১
মনমোহন দাসের ঘর ভেঙে দিয়েছিলো হামলাকারীরা। দা দিয়ে কুপিয়ে টিনের বেড়া তছনছ করে দিয়েছিলো। ভাঙা টিনের বদলে বেড়ায় এখন নতুন টিন লেগেছে। নতুন টিনে সূর্যের আলো পড়ে চিকচিক করছে। তবে মনমোহন দাসের মনের আঁধার এখনও কাটেনি। ভাঙা মন এখনো জোড়া লাগেনি তার।
আক্ষেপ করে বলেন, এটা কী হলো? এরকম তো কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবিনি। হিন্দু-মুসলমান মিলে কত যুগ ধরে আমরা একসাথে বসবাস করে আসছি। কোনো বিভেদ ছিলো না। অথচ আজ কী হলো?
মনমোহনের চোখে মুখে এখনও অবিশ্বাস। আতঙ্ক।
মনমোহন তবু বাড়িতেই আছেন। তবে বাড়ি ফিরতে এখন ভয় পাচ্ছে কেয়া চৌধুরী। সুনামগঞ্জ কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ে কেয়া। ১৭ মার্চ, যেদিন হামলা হয়, সেদিন দুপুরে ভয়ে তাকে মামার বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। মনমোহনের পাশের ঘরের রঞ্জনা চৌধুরীর মেয়ে কেয়া। রঞ্জনা বলেন, আমার মেয়ে এখন বাড়ি আসতে চায় না। বাড়ি ফিরতে ভয় পায়। কেবল বলে, তারা যদি আবার আসে।
হামলার দিন গ্রাম ছেড়ে বোনের বাড়ি চলে গিয়েছিলো শাল্লা কলেজ থেকে এবার এইচএসসি পাস করা পান্না রানী দাস। সেও ভয়ে বাড়ি ফিরতে চাচ্ছে না বলে জানালেন তার বড় বোন সোনালী রানী দাস।
এই গ্রামেরই মায়া দেবীর ছেলে অয়ন। নোয়াগাও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৪র্থ শ্রেণিতে পড়ে। ১৭ মার্চের পর প্রতি রাতে ঘুমের মধ্যেই ভয়ে কেঁদে ওঠে সে। ধড়ফড়িয়ে ঘুম থেকে ওঠে বলে, ‘মা এরা আবার আইছে’।
ছেলের এমন কান্নায় ভয় পেয়ে যান মা মায়াও। ছেলেকে স্বান্ত্বনা দেন। তারপর একে অপরকে জড়িয়ে দুজনই চোখ মুছেন।
বুধবার (২৪ মার্চ) সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামে গিয়ে কথা হয় তাদের সঙ্গে। গত ১৭ মার্চ, সারাদেশ যখন বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী পালনে ব্যস্ত, সেইদিন সকালে নোয়াগাঁও গ্রামে মিছিল নিয়ে এসে হামলা চালায় কয়েক হাজার সশস্ত্র লোক। তারা আসে আশপাশের গ্রামগুলো থেকে। মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে জড়ো হয়। হেফাজত ইসলামের যুগ্ন মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হকের সমালোচনা করে এক যুবকের স্ট্যাটাসের জের ধরে এই হামলা চালানো হয়।
হিন্দু ধর্মাবলম্বী যে যুবক ওই স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন তার বাড়ি নোয়াগাঁও গ্রামে। আগের রাতেই ভয়ে ঝুমন দাশ নামের ওই যুবককে পুলিশের হাতে তুলে দেন গ্রামবাসী। তবু সেই আক্রোশে ভেঙে দেওয়া হয় নোয়াগাঁও গ্রামের অন্তত ৮০টি হিন্দু বাড়ি। ভাঙচুরের পর প্রতিটি বাড়িতে লুটপাট করে মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে যায় হামলাকারীরা। ভাঙচুর করা হয় ৭টি মন্দির। এঘটনায় দুটি মামলা দায়েরের পর বুধবার পর্যন্ত ৩৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে পুলিশ। এদের মধ্যে পাশ্ববর্তী দিরাই উপজেলার নাচনি গ্রামের ইউপি সদস্য শহিদুল ইসলাম স্বাধীনকে ৫ দিনের এবং বাকি ২৯ জনকে ২ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
১৭ মার্চের হামলার পর গ্রামের মধ্যে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প ও র্যাবের অস্থায়ী ক্যাম্প বসানো হয়েছে। প্রশাসনের উর্ধতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন রাজনৈাতিক দলের নেতৃবৃন্দ প্রতিদিনই যাচ্ছেন নোয়াগাঁও। আক্রান্তদের সহমর্মিতা জানাচ্ছেন। সাহস যোগাচ্ছেন। তবু ভয় কাটছে না গ্রামবাসীর। এখনও সেদিনের ভয়াল স্মৃতি তাড়িয়ে বেড়ায় তাদের।
নোয়াগাঁও হাওরবেষ্ঠিত শাল্লা উপজেলার এক প্রত্যন্ত গ্রাম। সড়ক যোগাযোগ নেই। বর্ষায় নৌকা আর শুষ্ক মৌসুমে মোটরসাইকেলই বাহন এখানকার। হাওরের ফসল রক্ষার জন্য যে বাঁধ তৈরি হয়েছে সেটিই এখন সড়ক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সড়ক না থাকলেও গ্রামে পৌছে গেছে বিদ্যুৎ। গ্রামের পাশেই পল্লী বিদ্যুতের সাব স্টেশন নির্মিত হচ্ছে। গ্রামে পাকা ঘর তেমন নেই। প্রায় প্রতিটি ঘরই টিনের। বেশিরভাগ ঘরই ভাঙাচেরা। ঘর ও আসবাবপত্রে দারিদ্রতার ছাপ স্পষ্ট। তবে স্মার্টফোন আছে গ্রামের অনেক তরুণদের হাতে। অনেকের ফোনে ইন্টারনেট সংযোগও আছে। তবে গ্রামের বয়স্করা এখনো ইন্টারনেট, ফেসবুক এসবের সাথে পরিচিত নন।
ফেসবুকে যে স্ট্যাটাসের সূত্র ধরে হামলার কথা বলা হচ্ছে সে বিষয়ে জানতে চাই গ্রামের গৃহবধূ ঢলি রানী দাসের কাছে। এই কদিন ধরে ফেসবুক শব্দটা শুনছেন তিনি। তবে এই জিনিসটা যে আদৌ কী এ ব্যাপারে কোনো ধারণা নেই তার। ঢলি বলেন, ‘ফেছবুক কিতা জানি না। অনেকে এর কথা কইতে হুনলাম। ঝুমনে ওনো বুলে কিতা লেখছে।’ এইটুকু বলে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন ঢলি। ফেসবুক সম্পর্কে কিছু জানতে চান বোধহয়!
কোনো উত্তর না পেয়ে আবার নিজে থেকেই বলতে শুরু করেন, হামলার ঠিক আগে আমরা পাশের হাওরে গিয়ে লুকিয়েছিলাম। সেখান থেকে হামলার শব্দ শুনেছি। এখনও সেই শব্দ কানে ভাসে। এখনও ভয়ে গা শিউরে উঠে।
নোয়াগাঁও গ্রামে গিয়ে অর্ধশতাধিক নারী-পুরুষ-শিশুর সঙ্গে কথা হয়। প্রায় সকলেই বলেছেন, সেদিনের ভয় এখনো তাড়িয়ে বেড়ায় তাদের।
স্বপ্না দাস বলেন, আমাদের চোখে এখনও সে দৃশ্য ভাসে। এখনও মনে হয় তারা (হামলাকারীরা) যদি আবার আসে।
অরবিন্দ দাস বলেন, হামলার পর থেকে আমার ছেলে পড়ালেখা করতে পারে না। কেবল ভয় পায়।
হামলার পর সরকারসহ বিভিন্ন সংগঠন থেকে সহযোগিতা প্রদান করা হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে। ভাঙা ঘরগুলো পুনর্নির্মাণেও সহায়তা করেছে সরকার। সেই তথ্য জানিয়ে সুধা রানী দাস বলেন, সাহায্য অনেক পাইছি। কিন্তু আমরা সাহায্য নয়, বিচার চাই। নিরাপত্তা চাই।
বুধবার দুপুরে নোয়াগাঁও গ্রামে যাওয়ার পর গ্রামবাসীরা রীতিমত টানাটানি শুরু করে দেন। প্রথমে তারা ভাবেন আগন্তুকেরা সরকারি সংস্থার কেউ হয়তো। অনেকে ভাবেন, সহায়তা এসেছে বোধহয়। হামলায় নিজেদের ক্ষয়ক্ষতি চিহ্নগুলো দেখাতে শুরু করেন সবাই। কেউ নিয়ে আসেন নিজেদের ক্ষতবিক্ষত হাড়ি-পাতিল। কেউবা দেখান ভেঙে চুরমার হওয়া বাদ্যযন্ত্র। গ্রামের পুরোহিত অসীম চক্রবর্তী নিয়ে যান টিনের একটি ছোট্ট ঘরে। গ্রামবাসীর কাছে এটি ‘বিপদনাশিনী মন্দির’। হামলাকারীরা মন্দিরের মূর্তিগুলো চুরমার করে দিয়েছে।
এই গ্রামেই বাড়ি স্থানীয় হবিবপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বিবেকানন্দ দাসের। তার ঘরটিও টিনের। চেয়ারম্যান বাড়িতে নেই। তার স্ত্রী দিপালী মজুমদারের সাথে কথা হয়। তিনি বলেন, আমাদের আলমারি ভেঙে সব সোনাদানা নিয়ে গেছে। ভয়ে বাথরুমে লুকিয়েছিলেন আমার জা। বাথরুমের দরজা ভেঙে তাকে বের করে এনেছে।
বাথরুমের দরজার ক্ষতবিক্ষত চিত্র দেখান তিনি।
রঞ্জনা চৌধুরী, যার মেয়ে ভয়ে বাড়ি আসতে ভয় পায়, তিনি বলেন, সেদিন বাচ্চারাও লাটিসোটা নিয়ে হামলায় এসেছিলো। তারা সকলেই আশপাশের গ্রামের। আমাদেরই প্রতিবেশি। হামলার সময় স্বাধীন মেম্বার উঠোনের চেয়ারে বসে বিড়ি ফুঁকছিল। আমরা হাওর থেকে সব দেখতে পাচ্ছিলাম।
তিনি বলেন, আমার ঘরে চুলা ভেঙেছে। হাড়ি ভেঙেছে। ঘরে গরু বিক্রির টাকা ছিলো সেটা নিয়ে গেছে। আমাকে একেবারে সর্বস্বান্ত করে গেছে।
কথা বলার সময় ক্ষোভে বিস্ফোরিত হয়ে ওঠে রঞ্জনা চৌধুরীর চোখ। বলেন, এরকম লুটপাট করছে জানলে আমি নিজেই লাঠি নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে বের হতাম। তাতে মারা গেলেও শান্তি ছিলো। সব হারিয়ে এখন বেঁচে থেকে কী লাভ?
বুধবার নোয়াগাঁওয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের সহমর্মিতা জানাতে সিলেট থেকে গিয়েছিলেন নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ‘দুষ্কাল প্রতিরোধে আমরা’র সংগঠক আব্দুল করিম কিম।
মামুনুলের বিরুদ্ধে স্ট্যাটাসদাতা ঝুমন দাশের ঘরে যান কিম। ঝুমন দাশের মুক্তির জন্য তার পরিবারের দাবির সাথে একাত্মতা পোষণ করেন। বলেন, মামুনুল হকের সমালোচনা করলে কাউকে কেনো গ্রেপ্তার করতে হবে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সকলের সমালোচনা করার অধিকার আছে। ঝুমনকে অন্যায়ভাবে জেলে রাখা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন কিম।
পাশেই ছিলেন স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা বিশ্বজিত চৌধুরী। তিনি বলেন, নোয়াগাঁওয়ে হামলার পর হামলাকালীরা মিছিল নিয়ে শাল্লা সদরের দিকে গিয়েছিলো। সেখানে একটি প্রাচীন মন্দিরে হামলার চেষ্টা করেছিলো তারা। আমরা সবাই জড়ো হয়ে তাদের প্রতিহত করি। এখানে হামলার ব্যাপারেও আগে থেকে জানলেও তাদের প্রতিহত করা যেতো।
গ্রাম থেকে বেরোনোর পথে দেখা হয় বৃদ্ধা সাবিত্রী বালার সাথে। লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটাহাঁটি করছেন তিনি। সাবিত্রী বলেন, একাত্তরের সময় একবার বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিলাম। এইবার আবার ভয়ে বাড়ি ছেড়ে পালাতে হলো। স্বাধীন দেশে কেন নিজ বাড়িঘর ছেড়ে ভয়ে পালাতে হয়? আমাদের অপরাধ কী?
তার পাশে থাকা অনিল দাস যুক্ত করেন, মুক্তিযুদ্ধের সময়ও একবার দিরাইয়ের নাচনি ও চন্ডিপুরের রাজাকারেরা নোয়াগাঁওয়ে হামলা করেছিলো। তখন ৪ জন রাজাকারকে ধরে হত্যা করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। এবারও হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছে নাচনি ও চন্ডিপুর গ্রামের লোকজন।
বুধবার নোয়াগাঁওয়ে গিয়েছিলেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জহিরুল হক শাকিল। তিনি বলেন, এই হামলা একাত্তরের হামলা থেকে ভিন্ন কিছু না। এই হামলায় যতটা না জানমালের ক্ষতি হয়েছে তারচেয়ে বেশি মানসিক ক্ষতি হয়েছে। বিশ্বাসের ক্ষতি হয়েছে।
নোয়াগাঁও থেকে ফেরার সময় ধারণ বাজার হয়ে আসতে হয়। এই বাজারের একটি মন্দির একেবারে গুড়িয়ে দিয়েছে হামলাকারীরা।
এই মন্দির দেখিয়ে স্থানীয় ছাত্রনেতা অরিন্দম চৌধুরী বলেন, এখন বলা হচ্ছে জলমহাল নিয়ে বিরোধ থেকে নোয়াগাঁও গ্রামে হামলা হয়েছে। জলমহাল নিয়ে বিরোধে নোয়াগাঁও গ্রামে হামলা হলে বাজারের এই মন্দিরে হামলা হবে কেন?
তার মত, এটা স্পষ্টতই সাম্প্রদায়িক হামলা। যার মূলে ছিলো হেফাজত নেতা মামুনুলের বিরুদ্ধে ফেসবুক স্ট্যাটাস। অন্য অনেক গোষ্ঠী এর সুবিধা নিতে পারে ও উসকানি দিতে পারে।
শাল্লা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হক বলেন, এই হামলার সাথে জড়িতদের গ্রেপ্তারে পুলিশ সর্বোচ্চ তৎপরতা চালাচ্ছে। ইতোমধ্যে ৩৪ জনকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে আরও যাদের নাম পাওয়া যাবে তাদেরও গ্রেপ্তার করা হবে।
তিনি বলেন, নোয়াগাঁও গ্রামবাসীর নিরাপত্তায় গ্রামেই একটি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প করা হয়েছে। সেখানে সার্বক্ষণিক ১৫ জন পুলিশ সদস্য দায়িত্বে রয়েছেন। এছাড়া গ্রামে র্যাবও একটি অস্থায়ী ক্যাম্প করেছে।