Sylhet Today 24 PRINT

শত বছরেও পাল্টায়নি চা শ্রমিকদের ভাগ্য

‘মুল্লুক চলো’ আন্দোলনের শতবর্ষ

জাহিদুল ইসলাম  |  ২০ মে, ২০২১

১৯২১ সালের ২০ মে; এই দিনে চাঁদপুরে মেঘনার জল লাল হয়ে ওঠে চা শ্রমিকদের রক্তে। এ হত্যাযজ্ঞে প্রাণ যায় কয়েকশ শ্রমিকের। বঞ্চিত, নিপীড়িত চা শ্রমিকরা নিজেদের ভাগ্য বদলাতে ‘মুল্লুক চলো’ আন্দোলনের মাধ্যমে নিজ জন্মভূমিতে ফেরত যেতে চেয়ে জীবন দিয়েছিলেন। সেই আন্দোলনের একশ বছর পরেও তাদের ভাগ্য বদলায় নি তাদের। এখনো তারা শোষিত, নিপীড়িত।

ঔপনিবেশিক আমলে চা শিল্পের গোড়াপত্তনের সময় থেকেই চায়ের বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য বিপুল শ্রমিকের চাহিদা দেখা দেয়। তাই ব্রিটিশ সরকার ভারতবর্ষের দক্ষিণ ভারত, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড, বিহার, উড়িষ্যাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের দরিদ্র মানুষদের উন্নত জীবনের নিশ্চয়তা দিয়ে শ্রমিক হিসেবে নিয়ে আসে আসামে। কিন্তু সে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ক্রমেই দুর্বিষহ জীবনের দিকে ঠেলে দেয় শ্রমিকদের জীবন। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে বিভিন্ন প্রতিকূলতার পাশাপশি অপর্যাপ্ত মজুরি, বাসস্থান, খাবার, স্বাস্থ্য নিরাপত্তাসহ নানামুখী সংকটে জর্জরিত শ্রমিকরা ক্রমশই বাগানমালিক দ্বারা নিপীড়ন নির্যাতনে অতিষ্ট হয়ে ওঠে।

১৯১৭-২০ সময়কালে লক্ষাধিক চা শ্রমিক মৃত্যুবরণ করে। যাদের বেশিরভাগই অপুষ্টিজনিত ও সংক্রামক ব্যাধিতে মারা যায়। এসময় ধীরে ধীরে চা বাগানে শ্রমিক অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। ভারতবর্ষজুড়ে তখন খেলাফত আন্দোলন আর অসহযোগ আন্দোলনের উত্তাপের ঢেউ। ১৯২০ সালের নানান সময়ে করিমগঞ্জ, ধলই, কাছাড় ভ্যালি, ব্রহ্মপুত্র ভ্যালি ও সিলেট ভ্যালির বিভিন্ন চা বাগানে অসন্তোষ ব্যাপক আকার ধারণ করে।

যার ফলশ্রুতিতে ১৯২১ সালের মে মাসে চা শ্রমিকরা নিজ জন্মস্থানে যাত্রার ব্যাপারে মনস্থির করে, শুরু হয় ‘মুল্লুক চলো’ আন্দোলন। শ্রমিকদের বাড়ি ফেরা ঠেকাতে ব্রিটিশ সরকার রেলযোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। তবে এতেও দমে না চা শ্রমিকরা। মে মাসের ৩ তারিখ প্রায় ৩০ হাজারের বেশি চা শ্রমিক রেললাইন ধরে পায়ে হেঁটেই চাঁদপুরের মেঘনা ঘাটের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। মুল্লুক চলো আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন তৎকালীন চা শ্রমিক নেতা পণ্ডিত গঙ্গাচরণ দীক্ষিত ও পণ্ডিত দেওসরন। ২০ মে চা শ্রমিকরা মেঘনা ঘাটে পৌঁছালে আসাম রাইফেলসের গোর্খা সৈন্যরা নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে। অসহায় চা শ্রমিকের রক্তে রঞ্জিত হয় মেঘনা। অজস্ত্র মৃতদেহ ভেসে যায় মেঘনার বুকে। শ্রমিক হত্যার প্রতিবাদে পুরো আসাম ও পুর্ব বাংলার চা শ্রমিকরা একযোগে ধর্মঘট শুরু করেন। মহাত্মা গান্ধী, মাওলানা মোহাম্মদ আলী, চিত্তরঞ্জন দাস, নেতাজী সুভাস চন্দ্র বসুর মতো জাতীয় পর্যায়ের নেতারা ছুটে আসেন চাঁদপুর। জোরদার হয় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন।

এরপর ব্রিটিশ-পাকিস্তান গিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার অর্ধশতক পেরুলেও ভাগ্য পাল্টেছে চা শ্রমিকদের? এমন প্রশ্নের জবাবে চা শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ভুমিসন্তান বাংলাদেশের প্রধান সমন্বয়ক আশরাফুল কবির বলেন, জীবনমান পাল্টানো দূরের কথা ন্যুনতম মৌলিক অধিকারই বাস্তবায়ন হয় নি। এখনো বাগানমালিকরা ঔপনিবেশিক শাসকের ন্যায় শোষণ-নিপীড়ন অব্যাহত রেখে চলেছে। বছরের পর বছর বাগানমালিক ও সরকারের শোষণ-নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন এই শ্রমিকরা।

তিনি বলেন, চা শ্রমিকদের অমানবিক পরিশ্রমে ফুলে ফেঁপে উঠছে চা শিল্প। উৎপাদনের নতুন নতুন রেকর্ড গড়ে জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য অবদানের পাশাপাশি রফতানিমুখী শিল্প হিসেবে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে অগ্রণী ভূমিকা রাখলেও নিজেদের জীবনের উন্নয়ন হয় নি এতটুকু। সাধারণ একজন দিনমজুর ৫০০ টাকা মজুরী পেলেও চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরী মাত্র ১২০ টাকা। বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা কোনোটাই আদর্শিক মানে উন্নত হয় নি। প্রতিষ্ঠিত হয় নি ভূমির অধিকার। এমনকি হাজার হাজার চা শ্রমিকের বলিদানের শতবর্ষ পরেও চা শ্রমিকদের জীবন সেই ঔপনিবেসিক আমলের মতোই। তারা এখনো কৃতদাসের মতোই জীবন যাপন করছেন।

আরেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ঊষা’র নির্বাহী পরিচালক নিগাত সাদিয়া বলেন, চা বাগানে এখনো শিক্ষার আলো পৌঁছায়নি। বেশিরভাগ চা বাগানেই নেই উচ্চ বিদ্যালয়। প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও রয়েছে দায়সারাভাবে। নামমাত্র মজুরিতে দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতি আর অন্যান্য খরচের সাথে কুলিয়ে উঠতে না পেরে পরিবারের সব সদস্যই একযোগে কাজ করেন চা বাগানে। ফলে ছেলেমেয়েদের শিক্ষার সুযোগ একেবারেই সংকুচিত।

তিনি বলেন, চা-শ্রমিকরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম চা-বাগানে বসবাস করলেও তাদের নেই বসতভিটার মালিকানা। ৮/১২ ফুট মাপের একটি ঘরেই বাস করে অন্তত তিনটি প্রজন্ম।

আর চা শ্রমিক ইউনিয়ন (সিলেট ভ্যালী)’র সভাপতি রাজু গোয়ালা বলেন, চা শ্রমিকদের ভাগ্যোন্নয়নতো দুরের কথা এখনো কোনো অধিকারই প্রতিষ্ঠিত হয় নি। আমাদের মজুরি এখনো দেশের সর্বনিম্ন শ্রমিক মজুরি। আমাদের ভূমির অধিকার এখনো উপেক্ষিত। তিনি বলেন, চা শ্রমিক হত্যার একশ বছরেও মেলেনি দিবসটির রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। তাই সরকারের কাছে আমাদের দাবি অন্তত চা শ্রমিকদের নৃশংস হত্যার দিবসটিকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে এই দিবসটিতে চা শ্রমিকদের স্ববেতনে ছুটি প্রদান করা হোক।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.