জৈন্তাপুর প্রতিনিধি | ২৪ মে, ২০২১
সিলেটের জৈন্তাপুরে পাহাড় কাটা কিছুতেই থামছে না। নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে একটি প্রভাবশালী চক্র বেপরোয়া ভাবে উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় পাহাড় কেটে ধ্বংস করছে।
পাহাড় কাটে তৈরি হচ্ছে বাড়ি, সংস্কার হচ্ছে রাস্তা, নির্মিত হচ্ছে ভারতীয় চোরাই গরুর বাজার। এছাড়া কৃষি জমি ভরাট করতে বিভিন্ন কাজের জন্য পাহাড় কাটছে সংঘবদ্ধ ভূমি খেকো একটি চক্র। এদিকে প্রকাশ্যে এসব পাহাড় কাটার মহোৎসব চালিয়ে গেলেও উপজেলা প্রশাসন এবং থানা পুলিশের রহস্যজনক নীরব ভূমিকায় জনসাধারণ ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। তাদের অভিযোগ, পাহাড় কাটারোধে প্রশাসনকে অবগত করলেও কোনো অভিযান চালানো হয় না। ফলে দিন দিন টিলা ও পাহাড় কাটা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
গত কয়েক বছর ধরে সিলেটে পাহাড় ধসে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও পাহাড় কাটা বন্ধ হয়নি। বিনা বাধায় পাহাড় খেকোরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। পরিবেশ সুরক্ষা আইন লঙ্ঘন করে সিলেটের পাহাড়ি এলাকা জৈন্তাপুর উপজেলার ৫নং ফতেপুর (হরিপুর) ইউনিয়ন ও চিকনাগুল ইউনিয়নে অদৃশ্য শক্তির জোরে পুরো পাহাড় কেটে সাবাড় করে দিচ্ছে উমনপুর এলাকার মৃত মুছিম আলীর ছেলে ইন্তাজ আলী, শিকার খাঁ এলাকার সমছুল ইসলামের ছেলে নজমুল আলম, ঠাকুরের মাটি এলাকার আহমদ আলী উরফে কুলি আহমদের ছেলে খালেদ আহমদ, শিকারখাঁ গ্রামের আবুল হাসনাতের ছেলে হবিব আহমদ, উপর শ্যামপুর গ্রামের মৃত সুনা মিয়ার ছেলে হেলাল উদ্দিনের নেতৃত্বে সংঘবদ্ধ একটি চক্র।
জৈন্তাপুর উপজেলার চিকনাগুল ইউনিয়নের পানিছড়া এলাকায় প্রায় ৪ একর আয়তনের একটি পাহাড় কেটে সাবাড় করে দিয়েছেন পানিছড়া গ্রামের সুনাফর আলী ছেলে শামীম আহমদ, একি গ্রামের মৃত আহমদ উল্লার ছেলে হালিম আহমদ। কি এমন অপরাধ ছিলো বৃক্ষরাজি ও জৈববৈচিত্র ঘেরা এবছরে ১০-১৫টি পাহাড়ের। পাহাড় নিধন ঠেকানো না গেলে পরিবেশে মহাবিপর্যয় নেমে আসবে। বাড়বে পাহাড় ধসে প্রাণ ও সম্পদহানীর ঘটনা। প্রশাসন কিছু উদ্যোগ নিয়েও থামছে না পাহাড়খেকোদের তৎপরতা। পাহাড় কাটার দায়ে লাখ টাকা জরিমানা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। একইসাথে পাহাড় কর্তন বন্ধ রাখারও নির্দেশনা দেয়া হয়। ওই নির্দেশনার পরও সেখানে পাহাড় কাটা চলছে।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়- পুরোটা পাহাড়ের উপরিভাগ কয়েকটি লেয়ারে কাটা হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েক লক্ষ ঘনফুট মাটি কেটে সাবাড় করে দেয়া হয়েছে। নতুন করে আরও এক লেয়ারে অর্ধেক কাটার কাজ শেষ। এসব মাটি বিভিন্ন এলাকায় চলে যায়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাহাড় কাটা হচ্ছে জৈন্তাপুর উপজেলার উমনপুর মৌজার জেল নং ৩৩০ এসএ খতিয়ান নং ৩৬ এসএ দাগ নম্বর হচ্ছে ১৪৪ (বিএস দাগ নম্বর ২৫২)। এছাড়াও চিকনাগুল পানিছড়া এম আহমদ স্কুলের অপজিট দিকের রাস্তায় ডুকে একটি বিশাল পাহাড় কাটা হচ্ছে শিকার খাঁ এলাকার আবুল হাসনাতের ছেলে হবিব আহমদের বাড়ি সহ ১০-১৫টি টিলা কাটা হচ্ছে। একদিকে জৈন্তাপুর যেমন হারাচ্ছে সৌন্দর্য তেমনি দিন দিন কমছে কৃষি জমি। প্রতিদিন ওই এলাকা থেকে প্রায় ২০টি ট্রাক পরিবহন করছে পাহাড় কাটা মাটি। এভাবে পাহাড়কাটার কারণে দিন দিন ছোট হয়ে আসছে পাহাড় ও বনাঞ্চলের আয়তন। স্থানীয় বাসিন্দারা ভয়ে কেউই এই ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করতে চান না।
স্থানীয়রা আরও জানান, সীমান্ত থেকে ভারতীয় চোরাই পণ্য পরিবহনের জন্য নিচু এলাকায় পাহাড়ের মাটি দিয়ে রাস্তা তৈরি করছে। হরিপুর টু গাছবাড়ি সড়কে পাহাড়ের মাটি নিয়ে যাচ্ছে।এই সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে প্রভাবশালী চক্র। তারা এই কাজের অজুহাত দেখিয়ে অবাধে কেটে ফেলছে টিলা ও পাহাড়। স্থানীয় লোকজন বিষয়টি পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেট অফিস ও উপজেলা সহকারি কমিশনার ভ’মি অফিসকে বারবার অবহিত করলে অভিযান পরিচালনা করেন কিন্তু পাহাড় কাটা বন্ধ হয় না। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি রহস্য জনক কারণে সামান্য কিছু টাকা জরিমানা করে পাহাড় কর্তন না করার অঙ্গীকার নিয়ে তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তারা ফিরে এসে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন কিছু প্রভাবশালী নেতাদের ছত্র-ছায়ায় তাদের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে।
সাহিত্যিক ও কলামিস্ট আব্দুল হাই আল হাদি বলেন, পাহাড়কাটা বাংলাদেশ পরিবেশ আইনে স্পষ্ট লঙ্ঘন। সিলেটের উত্তর পূর্বাঞ্চলের যে কয়েকটি অঞ্চল টিলা এবং পাহাড়ের জন্য বিখ্যাত তার মধ্যে হরিপুর, বাগেরখাল, চিকনাগুল অন্যতম। কিন্তু এখানে প্রকাশ্যে দিবালোকে দিনের পর দিন এই পাহাড় কেটে নিয়ে যাচ্ছে। পাহাড় কর্তনের সংবাদ বারবার গনমাধ্যমে প্রকাশ হলেও পাহাড় কর্তন বিরামহিন ভাবে চলছে। এই করোনকালের এই সুযোগে তারা আরও বেশি কর্তন করছে।পাহাড় গুলো তাদের কাছে মনেহয় একেকটি টিউমার। আমাদের দাবি পাহাড়কাটায় জড়িতদের আইনের আওতায় এনে সঠিক বিচার করতে হবে।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত আজমেরী হক প্রতিবেদককে জানান, পাহাড় কাটা আইনগত ভাবে সম্পূর্ণ অবৈধ এবং পরিবেশ বিধ্বংসী একটি কাজ, আমাদের উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি অভিযান পরিচালনা করেন তারপরও ভূমি খেকোদের দমন করা যাচ্ছেনা। কর্তনকারীদের বিরুদ্ধে আমরা আরও কঠোর হবো এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।