নিজস্ব প্রতিবেদক | ০২ জুন, ২০২১
ছয়দিন পার হলেও দখলমুক্ত হয়নি বড়লেখার বনাখলাপুঞ্জির পানজুম। এতে ওই পুঞ্জির খাসিয়াদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ আর আতঙ্ক। জুম থেকে পান তুলতে না পেরে তারা কষ্টে দিন পার করছেন। গত শুক্রবার (২৮ মে) সকালের দিকে বনাখলাপুঞ্জির কয়েকটি জুম দখলের ঘটনা ঘটে। পুঞ্জিটি দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নের ছোটলেখা চা-বাগানের আওতাধীন।
বনাখলাপুঞ্জি ছাড়াও ওই বাগানের আওতাধীন আগারপুঞ্জি নামের আরেকটি পুঞ্জির খাসিয়াদের সহস্রাধিক পানগাছ কেটে ফেলে অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্তরা। গত শনিবার দিবাগত রাতের কোনো একসময় এই ঘটনা ঘটে।
এসব ঘটনার জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আদিবাসী নেতারা। তারা দ্রুত জুম দখলমুক্ত করে খাসিয়াদের বুঝিয়ে দেওয়া ও কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়েছেন।
দখল ও পুঞ্জির সহস্রাধিক পানগাছ কেটে ফেলার ঘটনায় বুধবার (২ জুন) মৌলভীবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সহ সভাপতি অ্যাডভোকেট ডাড্লী ডেরিক প্রেন্টিস, বৃহত্তর সিলেট আদিবাসি ফোরামের মহাসচিব ফিলা পতমী, বাসদ মৌলভীবাজার জেলা শাখা সদস্য অ্যাডভোকেট মো. আবুল হাসান বনাখলাপুঞ্জি ও আগারপুঞ্জি পরিদর্শন করেন। দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত তারা পুঞ্জি দুটিতে ঘুরে মান্ত্রী (পুঞ্জি প্রধান) ও খাসিয়া সম্প্রদায়ের লোকজনের সাথে কথা বলেন।
এসময় মৌলভীবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সহ সভাপতি অ্যাডভোকেট ডাড্লী ডেরিক প্রেন্টিস বলেন, ‘সম্প্রতি আমরা দেখছি আদিবাসি খাসিয়া সম্প্রদায়ের লোকজনের ওপর একটার পর একটা ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটছে। গত শুক্রবার বনাখলাপুঞ্জিতে প্রায় ৭০ একর জুমের জায়গা দখলের ঘটনা ঘটে। পরদিন শনিবার আগারপুঞ্জিতে সহস্রাধিক পানগাছ কেটে নিয়েছে দৃর্বৃত্তরা। এগুলো ন্যাক্কারজনক ও দুঃখজনক। এই ঘটনার আমরা তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানাই। সাথে সাথে আমরা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার যেন আশু একটা সমাধান হয়। খাসিয়া সম্প্রদায় যেন নিরাপত্তায়, নির্বঘ্নে পান চাষ করে যেন তাদের জীবিকা নির্বাহ করতে পারে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আদিবাসি খাসিয়ারা শুধু পান চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে না তারা পরিবেশ রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একেকটা গাছ উনারা সন্তানের মতো বড় করে। এরপর তারা সেই গাছে পান চাষ করে গাছ রক্ষায়, পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখে।’
বৃহত্তর সিলেট আদিবাসি ফোরামের মহাসচিব ফিলা পতমী বলেন, ‘গত তিন চার মাস ধরে সিরিজ সব ঘটনা খাসি জনগোষ্ঠির উপরে প্রতিবারি হচ্ছে। প্রশাসনের কাছে আমার একটা প্রশ্ন? শুধু আমরাই কেন টার্গেট হচ্ছি? কুলাউড়ায় অনেক ধরণের হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় সুষ্ঠু বিচার না হওয়ায় সিরিজ ঘটনা ঘটছে। আমি প্রশাসনকে জানাতে চাই এই ঘটনাগুলোর যদি সুষ্ঠু বিচার না হয় আমরা সকল সংগঠন একসাথে আন্দোলনে যাব।’
সরেজমিনে বুধবার কথা হয় বনাখলাপুঞ্জির আমস বলেন, ‘আমার জুমের ৬ একর জায়গা দখল করে ঘর তৈরি করেছে। ভয়ে যাইতে পারছি না। ছয়দিন হয়ে গেল। কখন পুঞ্জি উদ্ধার হবে। তাও জানি না। একটা অনিশ্চয়তায় আছি।’
পুঞ্জির বাসিন্দা ও চা-বাগান কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, ছোটলেখা চা-বাগান কর্তৃপক্ষ চা চাষের জন্য ১ হাজার ৯৬৪ দশমিক ৫০ একর টিলাভূমি সরকারের কাছ থেকে ইজারা নেয়। পরে তারা ২৭২ একর জমি খাসিয়াদের কাছে উপ-ইজারা দেয়। ২০০৭ সালে খাসিয়ারা ওই জমিতে বনাখলাপুঞ্জি নামে বসতি স্থাপন করে। এরপর সেখানে পান চাষ শুরু করে। পুঞ্জিতে বর্তমানে প্রায় ৩৬টি খাসিয়া পরিবারের দেড় শতাধিক সদস্য থাকে। প্রতিটি পরিবারের আলাদা পানের জুম আছে। গত ২৮ মে বোবারথল এলাকার আব্দুল বাছিত, পিচ্চি আমির, লেছই মিয়ার নেতৃত্বে ৪০-৫০ জনের একদল লোক দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পুঞ্জিতে ঢুকে তিনটি পানের জুমের দখল করে নেন। এ সময় তারা সেখানে একটি অস্থায়ী ঘরও নির্মাণ করে। তখন জুমে থাকা খাসিয়াদের তারা তাড়িয়ে দিয়ে বলে এক সপ্তাহের মধ্যে তাদেরকে ১০ লাখ চাঁদা না দিলে তারা জুমে প্রবেশ করতে পারবে না।
এই ঘটনায় পুঞ্জির নারী মান্ত্রী (পুঞ্জি প্রধান) নরা ধার ও ছোটলেখা বাগানের প্রধান টিলা করণিক মো. দেওয়ান মাসুদ রোববার থানায় পৃথকভাবে দুটি মামলা করেন। অপরদিকে আগারপুঞ্জির সহস্রাধিক পানগাছ কাটার ঘটনায় সোমবার (৩১ মে) দুপুরে পুঞ্জির মান্ত্রী (পুঞ্জিপ্রধান) সুখমন আমসে বাদী হয়ে বড়লেখা থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
বড়লেখা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর হোসেন সরদার বুধবার (২ জুন) সিলেটটুডেকে বলেন, ‘দখলদারদের অন্যত্র সরিয়ে নিতে স্থানীয় চেয়ারম্যান ২৪ ঘন্টা সময় নিয়েছিলেন। তিনি সরাতে পারেননি এখন আমরা আইনি প্রক্রিয়ায় তাদের উচ্ছেদ করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। খাসিয়াদের সর্বাত্নক আইনি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।’