নিজস্ব প্রতিবেদক | ০৬ জুলাই, ২০২১
কুয়েত প্রবাসী সাহেদুর রহমানের বাড়িতে বসে করোনার টিকার নিবন্ধন করা হচ্ছে (বাঁয়ে)। ডানে ভ্রাম্যমাণ নিবন্ধন দলের গাড়ি।
তিন দিনে মৌলভীবাজারের বড়লেখায় কোনো রকম ভোগান্তি ছাড়াই ৬১৮ জন প্রবাসী করোনার টিকার নিবন্ধন সম্পন্ন করেছেন। প্রবাসী অথবা প্রবাসে গমনইচ্ছুক কাউকেই টিকার নিবন্ধনের জন্য যেতে হচ্ছে না জেলা সদরে। নিজ ইউনিয়নেই তারা নিবন্ধন করতে পারছেন।
এতে টিকার নিবন্ধন নিয়ে বড়লেখার প্রবাসীদের মধ্যে যে উদ্বেগ ছিল তা কেটে গেছে।
প্রবাসীরা জানিয়েছেন, বড়লেখা উপজেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগে তাদের সময় ও টাকা সাশ্রয়ের পাশাপাশি ভোগান্তি দূর করেছে।
লকডাউন পরিস্থিতিতে করোনার টিকা নিবন্ধনের ক্ষেত্রে প্রবাসীদের ভোগান্তি দূর করতে সম্প্রতি উদ্যোগ নেয় বড়লেখা উপজেলা প্রশাসন। গত রোববার বড়লেখা উপজেলায় ভার্চুয়ালি টিকা নিবন্ধন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ আহসান। নিজবাহাদুরপুর ইউনিয়ন পরিষদ প্রাঙ্গণে এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খন্দকার মুদাচ্ছির বিন আলী।
উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার দশটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার তথ্যসেবা কেন্দ্রের উদ্যোক্তারা সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত টিকার নিবন্ধন করছেন। এছাড়া একটি ভ্রাম্যমাণ টিকা নিবন্ধন সেবা দল বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রবাসীদের টিকার নিবন্ধন করে দিচ্ছে। পুরো প্রক্রিয়াটি পর্যবেক্ষণ করছেন বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খন্দকার মুদাচ্ছির বিন আলী।
উদ্বোধনের দিন রোববার ৪ জন, পরদিন সোমবার ৪০০ জন ও মঙ্গলবার ২১৪ জন প্রবাসী করোনার টিকার নিবন্ধন করে। এরমধ্যে বর্ণি ইউনিয়নে ৭৪ জন, দাসেরবাজার ইউনিয়নে ৩৭ জন, নিজবাহাদুরপুর ইউনিয়নে ৮৪ জন, উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নে ৩৭ জন, দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নে ৬৭ জন, বড়লেখা সদর ইউনিয়নে ৪১ জন, তালিমপুর ইউনিয়নে ৭২ জন, দক্ষিণভাগ উত্তর ইউনিয়নে ৬৭ জন, সুজানগর ইউনিয়নে ৫৫ জন, দক্ষিণভাগ দক্ষিণ ইউনিয়নে ৪৩ জন ও বড়লেখা পৌরসভায় ৪১ জন।
নিজবাহাদুরপুর ইউনিয়ন তথ্যসেবা কেন্দ্রে সোমবার দুপুরে টিকার নিবন্ধন করেন কাতার প্রবাসী সুহেল আহমদ। তার বাড়ি ওই ইউনিয়নের জামকান্দি গ্রামে। তিনি বলেন, ‘প্রক্রিয়াটা অনেক সুন্দর হয়েছে। নিখুঁতভাবে উদ্যোক্তা সব কিছু করে দেন। আমরা অনেকেই নিবন্ধন করেছি। খুব দুশ্চিন্তায় ছিলাম। সোমবার মৌলভীবাজার যাওয়ার প্রস্তুতিও নিয়েছিলাম। রোববার রাতে নিউজে দেখি বড়লেখায় টিকার নিবন্ধন করা যাবে। এটি দেখেই ইউনিয়নে যাই। দ্রæত সব কিছু হয়ে গেছে। কষ্ট দূর করার জন্য আমাদের মন্ত্রী, ডিসি, ইউএনওকে ধন্যবাদ জানাই। নিজের ইউনিয়নে হওয়ায় আমাদের সময়, টাকা দুটোই বেঁচেছে। এছাড়া সহজে নিবন্ধন করতে পারছি আমরা এইটা বড় বিষয়। এটা করায় খুব উপকার হয়েছে।’
নিজবাহাদুরপুর ইউনিয়ন পরিষদের তথ্যসেবা কেন্দ্রের উদ্যোক্তা শরিফুল ইসলাম স্বপন বলেন, ‘আমরা প্রান্তিক মানুষের কাছে সরকারের ডিজিটাল সেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য কাজ করছি সব সময়। প্রবাসীদের টিকার নিবন্ধনের কাজটি করতে পেরে খুব ভালো লাগছে। লকডাউনের সময় জেলা সদরে গিয়ে নিবন্ধন করতে তাদের অনেক কষ্ট হতো। কাজটি তারা নিজ ইউনিয়নে করতে পারছেন। এতে খুশি তারা।’
দক্ষিণভাগ ইউনিয়নের পশ্চিম দক্ষিণভাগ গ্রামের বাসিন্দা কুয়েত প্রবাসী সাহেদুর রহমান বলেন, ‘গত কয়েকদিন থেকে খুব দুশ্চিন্তায় আছলাম। কিলা রেজিস্ট্রেশন করতাম ভ্যাকসিনের। পরিচিত যারা প্রবাসী ছিলেন অনেকের সাথেই যোগাযোগ করেছি। লকডাউনে কিভাবে মৌলভীবাজার যাওয়া যায়। এরইমধ্যে সোমবার দুপুরে হঠাৎ আমার বাড়িতে একটি মাইক্রোবাসে চার-পাঁচজন লোক আসেন। তারা আমার করোনা টিকার নিবন্ধন করে দেন। আগেই তারা খোঁজ নিয়েছেন এলাকার কোনো বাড়িতে প্রবাসী আছেন। এভাবেই আমার বাড়িতে আসেন। সবকিছু খুব দ্রæত হয়েছে। চিন্তাও করিনি এত তাড়াতাড়ি হবে।’
বড়লেখা উপজেলা কমিউনিটি ই-সেন্টারের পরিচালক রাসেল আহমদ ইউনিয়ন ও পৌরসভার উদ্যোক্তাদের সাথে টিকা নিবন্ধনের বিষয়টি সমন্বয় ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘ইউএনও স্যারের নির্দেশনায় আমরা কাজ করছি। হটলাইন হিসেবে আমার মুঠোফোন নম্বরটি দেওয়া আছে। যেখান থেকে ফোন আসছে সেখানেই ভ্রাম্যমাণ গাড়ি নিয়ে পৌঁছে যাচ্ছি। এছাড়া স্থানীয়ভাবে প্রবাসীদের তথ্য নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে করোনার টিকা নিবন্ধন করে দিচ্ছি। এই কার্যক্রম চলমান থাকবে।’
এই বিষয়ে বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খন্দকার মুদাচ্ছির বিন আলী মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বলেন, ‘ভ্যাকসিন নিবন্ধনের জন্য ভ্রাম্যমাণ দল গঠন করে দেওয়ায় প্রবাসীদের খুব উপকার হচ্ছে। সকলে এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। লকডাউনের সকল ইউনিয়ন কার্যালয়ের পাশাপাশি তথ্যসেবা কেন্দ্রও বন্ধ। শুধুমাত্র লকডাউনে টিকা নিবন্ধনে প্রবাসীদের কষ্ট দূর করতেই আমরা তথ্যসেবাগুলোকে কাজে লাগিয়েছি। এছাড়া দূরবর্তী কোনো গ্রাম। যেখান থেকে প্রবাসীর ইউনিয়নে এসে নিবন্ধন করতে কষ্ট হবে সেখানে ভ্রাম্যমাণ গাড়ি যাচ্ছে। পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ দলটি তথ্যসেবা কেন্দ্রগুলোকে কারিগারি সহায়তা দিচ্ছে। লকডাউন চলাকালে প্রবাসীদের টিকা নিবন্ধনের কার্যক্রম চলবে।’
প্রসঙ্গত, সীমান্তবর্তী বড়লেখা উপজেলা থেকে মৌলভীবাজার সদরের দূরত্ব প্রায় ৭০ কিলোমিটার। আসা-যাওয়া মিলিয়ে প্রায় ১৫০ কিলোমিটারের পথ। লকডাউনের মধ্যে এতটা পথ পাড়ি দিয়ে করোনার টিকার নিবন্ধন নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন উপজেলায় অবস্থানকারী প্রবাসীরা। তবে তাদের এই দুশ্চিন্তার নিরসন করেছে উপজেলা প্রশাসন। এই সমস্যা সমাধানের জন্য উপজেলাতেই নিবন্ধন কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেন বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খন্দকার মুদাচ্ছির বিন আলী। এ লক্ষ্যেই গত শনিবার ইউনিয়ন তথ্যসেবা কেন্দ্রের কয়েক উদ্যোক্তাকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দিয়েছে মৌলভীবাজার জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয়। পাশাপাশি একটি মাইক্রোবাস, তিনজন ডিজিটাল সার্ভিস প্রোভাইডার (সেবা প্রদানকারী), প্রয়োজনীয় ল্যাপটপসহ টিকা নিবন্ধনের একটি ভ্রাম্যমাণ দল গঠন করা হয়। পরদিন রোববার আনুষ্ঠানিকভাবে এই কার্যক্রসের উদ্বোধন করা হয়।