নিজস্ব প্রতিবেদক: | ০৬ আগস্ট, ২০২১
দেশে করোনা মহামারির শুরু থেকে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় লকডাউন কার্যকর করা হয় মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার আদিবাসী খাসিয়াদের (খাসি) পুঞ্জিগুলোতে। পুঞ্জিগুলো ঘুরে মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ব ঠিক রাখা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়ে নিয়মিত প্রচারণা চালায় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো। এতে প্রথম ধাপে ১৮টি পুঞ্জিতে কেউ করোনা আক্রান্ত হননি।
সম্প্রতি কিছু পুঞ্জিতে করোনার উপসর্গ দেখা দিয়েছে। তাতেই সতর্ক হয়ে ওঠেছেন আদিবাসী তরুণরা। পাহাড়ের বুকে করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে তরুণরা পুঞ্জিগুলোতে সচেতনতামূলক প্রচারণা শুরু করেছেন। তারা তারা টিলায় ঘুরে বাড়িতে বাড়িতে মাইকিংয়ের মাধ্যমে সচেতনতা তৈরি এবং মাস্ক বিতরণ ও প্রচারপত্র বিলি করছেন।
বৃহস্পতিবার (৫ আগস্ট) সরেজমিনে দেখা গেছে, মাধবকুণ্ড পুঞ্জির প্রবেশপথের ফটকে বহিরাগতদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার ব্যানার টানানো। করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় লকডাউন কার্যকর করেছে পুঞ্জি কর্তৃপক্ষ। একই রকম ব্যবস্থাপনায় ৭ নম্বর, ১০ নম্বরসহ অন্য পুঞ্জিগুলোতে করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে লকডাউন কার্যকর করা হয়েছে। ৭ নম্বর ও ১০ নম্বর খাসি পুঞ্জিতে দুপুর ১২টা থেকে বিকেল তিনটা পর্যন্ত সচেতনতামূলক প্রচারণা চালায় বড়লেখা খাসি যুব স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। এতে সহযোগিতা করে খাসি ইয়ুথ ক্লাব সাত নম্বর পুঞ্জি এবং বাংলাদেশ শিশু উন্নয়ন প্রকল্প।
বড়লেখা খাসি যুব স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার কয়েকটি পুঞ্জির বাসিন্দাদের মধ্যে করোনার উপসর্গ দেখা গেছে। এর প্রেক্ষিতে বড়লেখা উপজেলা প্রশাসন ১৮টি পুঞ্জির আদিবাসী তরুণদের নিয়ে মতবিনিময় করেছে। এরপর পুঞ্জির বাসিন্দাদের মধ্যে করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে সচেতনতা বৃদ্ধি, টিকার নিবন্ধনসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করতে ‘বড়লেখা খাসি যুব স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন’ গঠন করা হয়েছে। প্রশাসন থেকে এই সংগঠনকে ৫টি হ্যান্ড মাইক ও সুরক্ষা সামগ্রী প্রদান করা হয়। পরবর্তী সময়ে সংগঠনের সদস্যরা ৪টি দলে ভাগ হয়ে পুঞ্জিগুলোতে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু করেছেন। তারই অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার ৭ নম্বর ও ১০ নম্বর পুঞ্জিতে প্রচারণা চালানো হয়।
এসময় মাইকিং এবং পুঞ্জির বাসিন্দাদের মধ্যে প্রচারপত্র ও মাস্ক বিতরণ করা হয়েছে। এই কার্যক্রমে বড়লেখা খাসি যুব সেচ্ছাসেবী সংগঠনের কো-অর্ডিনেটর মাইকেল নংরূম, প্রবীণসন সুছিয়াং, সিতেশ খংলাঃ, খাসি ইয়ুথ ক্লাব সাত নম্বর পুঞ্জির সদস্য প্রিয়াঙ্কা এলগিরি, গীভমি খংলাঃ, মল্লিকা পালা, ফ্লিনা খংলাঃ, মধ্য ও দক্ষিণ বাংলাদেশ শিশু উন্নয়ন প্রকল্পের শিশু উন্নয়ন কর্মী হেমসন ধার, রাজু খংলাঃ প্রমুখ অংশগ্রহণ করেন।
অপরদিকে বুধবার (৪ আগস্ট) উপজেলার বেরেঙ্গা, কুমারশাইল, পাল্লাথল, বাতামোড়ল, ৫ নম্বর, দুর্বিনটিলা ও মোকামটিলা পুঞ্জিতে প্রচারণা চালানো হয়েছে।
খাসি ইয়ুথ ক্লাব সাত নম্বর পুঞ্জির সদস্য প্রিয়াঙ্কা এলগিরি বলেন, ‘মহৎ এ উদ্যোগের জন্য উপজেলা প্রশাসন ও সেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। স্বেচ্ছাসেবীরা ঘরে ঘরে গিয়ে মানুষকে সচেতন করতেছে। সুরক্ষা সামগ্রী দিচ্ছে। এতে খাসি পুঞ্জিগুলোতে করোনাসংক্রমণ রোধে সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে।’ প্রিয়াঙ্কা এলগিরি জানান, স্বেচ্ছাসেবীদের পাশাপাশি তারাও মানুষকে সচেতন করছেন। করোনার টিকা গ্রহণের জন্য উদ্বুদ্ধ করছেন।
সাত নম্বর পুঞ্জির বাসিন্দা মিথিলা বারেঃ বলেন, ‘খাসি যুব সেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্মীরা করোনা সচেতনতায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার চালাচ্ছেন এবং সুরক্ষা সামগ্রী তুলে দিয়েছেন। টিকা গ্রহণের জন্য উৎসাহিত করছেন। এতে পুঞ্জির বাসিন্দারা করোনা বিষয়ে আতঙ্কিত না হয়ে তাদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে।’
বড়লেখা সদর ইউনিয়নের ৫ নম্বর পুঞ্জির বাসিন্দা বিজয় এল গিরি বলেন, ‘দুই তিন সপ্তাহ আগে আমাদের একজন বাসিন্দার করোনা পজিটিভ হয়। তিনি সিলেট চিকিৎসা নেন। মধ্যখানে অনেকের জ্বর-সর্দি এগুলো ছিল। তবে এখন আর নেই। সবাই সচেতন হয়ে গেছে। আমরা পুঞ্জিতে বাইরের লোক প্রবেশ করতে দেই না। পুঞ্জির তরুণ স্বেচ্ছাসেবীরা বাসিন্দাদের সচেতন করতে কাজ করছেন।’
৭ নম্বর পুঞ্জির বাসিন্দা ও বড়লেখা খাসি যুব সেচ্ছাসেবী সংগঠনের কো-অর্ডিনেটর সিতেশ খংলাঃ বলেন, ‘দেশে করোনা সংক্রমণের শুরুতেই পুঞ্জিগুলোতে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় লকডাউন কার্যকর করা হয়। মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা হয়। পুঞ্জিতে বাইরের লোকের প্রবেশে কড়াকড়ি আনা হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিপত্র আগে ঘরে ঘরে বিক্রেতারা নিয়ে আসত। এটা বন্ধ করা হয়েছে। পুঞ্জির নিচে সরকার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পান ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিপত্র বেচাকেনা চলে। সম্প্রতি কিছু পুঞ্জিতে করোনা উপসর্গের লক্ষণ দেখা দিলে আরো সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।’
বড়লেখা খাসি যুব সেচ্ছাসেবী সংগঠনের কো-অর্ডিনেটর মাইকেল নংরূম বলেন, ‘কিছু পুঞ্জিতে করোনার উপসর্গ দেখা দেয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খন্দকার মুদাচ্ছির বিন আলীর পরামর্শে শতাধিক আদিবাসী খাসি স¤প্রদায়ের শিক্ষিত যুবক-যুবতীদের নিয়ে স্বেচ্ছাসেবী দল গঠন করি। পুঞ্জিসমূহে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এই কার্যক্রম চলমান থাকবে।’
বড়লেখা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রত্নদীপ বিশ্বাস সিলেটটুডেকে বলেন, ‘ডিমাই পুঞ্জিতে একজনের করোনা শনাক্ত হয়েছিল। এই পুঞ্জিতে বেশকিছু জ্বরের রোগী ছিল। স্থানীয় চেয়ারম্যান এমন তথ্য জানিয়েছেন। তবে অন্য কোনো পুঞ্জি থেকে এরকম খবর পাইনি।’