সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি | ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১
প্রায় সাত মাস পর অবশেষে কারাগার থেকে মুক্তি পেলেন সুনামগঞ্জের শাল্লার ঝুমন দাস। মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় তিনি সুনামগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান।
এসময় পরিবারের সদস্যরা তাকে কারাফটকে অভ্যর্থনা জানান। কারাফটকে দাঁড়িয়ে ছিলেন ঝুমন দাসের মা নিভা রানী দাস। কারাফটক থেকে বেরিয়েই মাকে প্রনাম ও আলিঙ্গন করে বুকে তুলে নেন ঝুমন।
ঝুমনের বেরিয়ে আসা ব্যাপারে তার মা নীভা রানী দাস বলেন, ভগবানের দয়ায় ছেলেরে বুকের মাঝে ফিরত ফাইছি, হে আর কোন সময় এমন কাজ করতো না আমরা তারে দেখিয়া রাখমু। আপনারা সবাইকে ধন্যবাদ আপনারাও আমার ছেলেকে ছড়াতে অনেক কষ্ট করেছেন।
হেফাজতে ইসলামের সাবেক নেতা মাওলানা মামুনুল হককে নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে গত ১৬ মার্চ আটক হন ঝুমন দাস। এরপর তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলা করে পুলিশ।
গত বৃহস্পতিবার এক বছরের জন্য শর্ত সাপেক্ষে ঝুমনকে জামিন প্রদান করেন উচ্চ আদালত। বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ার কাজলের হাইকোর্ট বেঞ্চ ঝুমনের জামিনের আদেশ দেয়।
ঝুমনের আইনজীবী দেবাংশু শেখর দাশ বলেন, জামিনের কাগজপত্র সব ঠিকঠাক করে কারাগারে পাঠানোর পর সন্ধ্যায় তাকে মুক্তি দেয়া হয়, সে আগামি ১ বছর জামিনে থাকবে।
উচ্চ আদালত থেকে ঝুমনকে এক বছরের জন্য জামিন দেয়া হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে তিনি দেশের বাইরে যেতে পারবেন না বলে শর্ত দেয়া হয়েছে। শর্তে আরও আছে, আদালতের অনুমতি ছাড়া তিনি যেতে পারবেন না সুনামগঞ্জের বাইরেও।
গত ১৫ মার্চ সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে ‘শানে রিসালাত সম্মেলন’ নামে একটি সমাবেশের আয়োজন করে হেফাজতে ইসলাম। এতে হেফাজতের তৎকালীন আমির জুনায়েদ বাবুনগরী ও যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক বক্তব্য দেন।
এই সমাবেশের পরদিন ১৬ মার্চ মামুনুল হকের সমালোচনা করে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন শাল্লার নোয়াগাঁওয়ের ঝুমন দাস। স্ট্যাটাসে তিনি মামুনুলের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের অভিযোগ আনেন।
মামুনুলের সমালোচনাকে ইসলামের সমালোচনা বলে এলাকায় প্রচার চালাতে থাকেন তার অনুসারীরা। এতে এলাকাজুড়ে উত্তেজনা দেখা দেয়। বিষয়টি আঁচ করতে পেরে নোয়াগাঁও গ্রামের বাসিন্দারা ১৬ মার্চ রাতে ঝুমনকে পুলিশের হাতে তুলে দেন।
পরদিন বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর সকালে কয়েক হাজার লোক লাঠিসোঁটা নিয়ে মিছিল করে হামলা চালায় নোয়াগাঁও গ্রামে। তারা ভাঙচুর ও লুটপাট করে ঝুমন দাসের বাড়িসহ হাওরপাড়ের হিন্দু গ্রামটির প্রায় ৯০টি বাড়ি, মন্দির। ঝুমনের স্ত্রী সুইটিকে পিটিয়ে আহত করা হয়।
এরপর ২২ মার্চ ঝুমনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করে শাল্লা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবদুল করিম।
শাল্লায় হামলার ঘটনায় শাল্লা থানার এসআই আব্দুল করিম, স্থানীয় হাবিবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিবেকানন্দ মজুমদার বকুল ও ঝুমন দাসের মা নিভা রানী তিনটি মামলা করেন। তিন মামলায় প্রায় ৩ হাজার আসামি। পুলিশ নানা সময়ে শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। তারা সবাই এখন জামিনে।
শুধু জামিন পাচ্ছিলেন না ঝুমন দাস। বিচারিক আদালতে পাঁচ দফা চার জামিন আবেদন নাকচ করেন বিচারক। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন অধিকারকর্মী, বুদ্ধিজীবী ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা চলছিল।