Sylhet Today 24 PRINT

শহীদ ছেলের কবর আর দেখা হয়নি মায়ের

তপন কুমার দাস: |  ১৩ অক্টোবর, ২০২১

মুক্তিযুদ্ধের সময় মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের কোনো এক চা বাগানে শহীদ হন কিশোর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রহমান। যুদ্ধের কিছুদিন পর লাশের স্তুপ থেকে আব্দুর রহমান মনে করে একজনকে উদ্ধার করেন এই শহীদের বাবা। স্থানীয়দের নিয়ে সেখানে কবর দেন। বাবার মৃত্যুর পর কবরের স্থানটিও অজানা থেকে যায় পরিবারের সদস্যদের কাছে।

আব্দুর রহমানের মা ছেলে হারানোর বেদনা ভুলতে চেয়েছিলেন কবরটি দেখে। কিন্তু কবর আর দেখা সম্ভব হয়নি। মৃত্যুর মুহুর্ত পর্যন্ত ছেলের কবর দেখার আকাঙ্ক্ষা মনের ভেতর পুষেই গেছেন তিনি। গত ২ অক্টোবর এ অপূর্ণতা নিয়ে মারা গেছেন এই শহীদের মা ফাতেমা বেগম। ফাতেমা বেগম মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নের সুজাউল পাঁচপাড়া গ্রামের মৃত আব্দুল গফুরের স্ত্রী।

আব্দুর রহমানের পরিবার ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, যুদ্ধের সময় শহীদ আব্দুর রহমান শাহবাজপুর উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। মেধাবী আব্দুর রহমান ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী। পাকিস্তানের শোষণ থেকে মুক্তির বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে তার ছিল সক্রিয় অংশগ্রহণ। দেশে যুদ্ধ শুরু হলে তাদের বাড়ির অদূরে ক্যাম্প বসায় পাকিস্তানি আর্মি। ওই সময়েই একদিন সকালে বাড়ির কাউকে না জানিয়ে আবদুর রহমান শার্ট ও লুঙ্গি পরে ঘর থেকে বেরিয়ে যান। আবদুর রহমানের বেরিয়ে যাওয়ার দুইদিন পর পাকিস্তানি আর্মি ক্যাম্প থেকে সেনারা তাদের বাড়িতে আসে তার বাবা আব্দুল গফুরের খোঁজে। এরপর আব্দুল গফুরকে ক্যাম্পে নিয়ে নির্মম নির্যাতন করে পাকিস্তানি সেনারা।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে শ্রীমঙ্গলের একটি চা বাগান এলাকায় যুদ্ধে শহীদ হন আব্দুর রহমান ও তার আরও কিছু সহযোদ্ধা। কিন্তু এলাকা দুর্গম হওয়ায় সেখান থেকে তাদের লাশ তখন নিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। দেশ স্বাধীনের পর আব্দুর রহমানের ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন তার পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু আব্দুর রহমান ফিরে আসেননি। কিছুদিন পর শ্রীমঙ্গলের নন্দীরবল গ্রামের এক লোক আবদুর রহমানের ফটো নিয়ে এসে তার এক সহযোদ্ধাকে খবর দেন পাকিস্তানি হানাদাররা আবদুর রহমানকে হত্যা করেছে। শ্রীমঙ্গলের একটি চা বাগানে পেট্রল (পাহারার কাজে) দেওয়ার সময় পাক সেনারা আব্দুর রহমানকে ধরে ফেলে। পরে পাঞ্জাবি ও রাজাকাররা তাকে গাছে ঝুলিয়ে গুলি ছুঁড়ে হত্যা করেছে। ছেলের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে আব্দুল গফুর, ফাতেমা বেগমসহ সবাই পাগলপ্রায় হয়ে যান। আব্দুর রহমান ছিলেন তাদের পরিবারে জ্যেষ্ঠ সন্তান।

এর পরে আবদুল গফুর শ্রীমঙ্গলের চা বাগান এলাকায় ছেলের লাশ খোঁজে ফিরেছেন। সেখানে অসংখ্য গলিত লাশের স্তুপে একটি লাশকে তার ছেলের মতো মনে হয়। স্থানীয় লোকজনকে নিয়ে সেখানেই লাশ দাফন করেন। লাশ নিয়ে আসার উপায় ছিল না। পরবর্তী সময়ে আব্দুল গফুর মারা গেলে ওই জায়গাটি তার পরিবারের লোকজন আর চিহ্নিত করতে পারেননি। এরপর থেকে ফাতেমা বেগম যাকে পেয়েছেন তার কাছেই জানতে চাইতেন ছেলের কবরটির কথা। এভাবে মৃত্যুর মুহুর্ত পর্যন্ত ছেলের ‘কবরের সন্ধান’ করে গেছেন এই জননী।

শহীদ আব্দুর রহমানের ছোট ভাই লুৎফুর রহমান সিলেটটুডেকে বলেন, ‘সংগ্রামের পর আব্বা গিয়েছিলেন শ্রীমঙ্গলের ওদিকে। নাম নিয়ে খোঁজ নিছেন। এমনভাবে মানুষ মারছে, ডমকায় যেভাবে ফায়ারুট রাখে এভাবে লাশ এলোমেলো করিয়া রাখছে (ইটভাটায় ইট পোড়ানোর জন্য কাঠের স্তুপ যেভাবে রাখা হয়) ডানে বায়ে। আব্বা গেছেন অনেক দিন পরে। খবর পাইতে দেরি অইছে। লাশ চিনার উপায় নাই। নজর আন্দাজে লাশ কিছুটা পাওয়া গেছে। তবে লাশ আনার উপায় ছিল না। পরে আশপাশ থেকে মানুষ আনিয়া দাফন করা হইছে। পরবর্তীতে আব্বা মারা যাওয়ায় আমরা আর জায়গাটা শনাক্ত করতে পারিনি। আম্মা সারাজীবন ভাইয়ের কবর দেখার জন্য ছটফট করতা। যখন ভাইয়ের কথা স্মরণ অইতো তখন কান্নাকাটি করতা।’

শহীদ রহমান সম্পর্কে স্মৃতিচারণা করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বীর মুক্তিযোদ্ধা তবারক হোসেইন সিলেটটুডেকে বলেন, ‘রহমান শাহবাজপুর উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্র ছিল। ১৯৭০ এর নির্বাচনে সে ন্যাপের প্রার্থীর সমর্থনে কুঁড়েঘর মার্কার পক্ষে শ্লোগান দিতে দিতে ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী হয়ে পড়ে। আমাদের সাথেই মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণের উদ্দেশ্যে ভারতে যায়। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের জন্য সে নির্বাচিত হয়। করিমগঞ্জের সন্নিকটে মাইজদিহি গ্রামের একটি প্রাথমিক স্কুলে ছিল প্রশিক্ষণার্থী নির্বাচনের শিবির। তার স্বাস্থ্য ছিল সবল তাই সে নির্বাচিত হয় অনায়াসে। সে প্রশিক্ষনে গিয়েছিল প্রথম ব্যাচেই।’

তিনি বলেন, ‘প্রশিক্ষণে যাবার আগে আমরা একসাথে মধ্যাহ্ন ভোজন করি। এদিন খাবার শেষে হতেই সে আমার হাত থেকে প্লেটটি নিয়ে যায় এবং সেটা পরিষ্কার করে। আমাকে পরিস্কার করতে দেয়নি। তারপর প্রশিক্ষণকেন্দ্রের উদ্যশ্যে গাড়িতে তাকে উঠিয়ে দেই। এটাই তার সাথে আমাদের শেষ দেখা। প্রশিক্ষণ শেষে সে যুদ্ধে যায় এবং শহীদ হয়। এই মহান মুক্তিযোদ্ধার মা শেষ দিন পর্যন্ত প্রিয় পুত্রের মুখ দেখার আশায় বুক বেধে বেঁচে ছিলেন। মনে করতেন তার ছেলে একদিন ফিরে আসবে। কিন্তু তা তো হবার নয়। রহমানের মায়ের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করছি আর তার শোক সন্তপ্ত পরিজনের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি।’

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
[email protected] ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
ওয়াহিদ ভিউ (পঞ্চম তলা), পূর্ব জিন্দাবাজার,
সিলেট-৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.