Sylhet Today 24 PRINT

শহীদ মনু মিয়ার নামে বিয়ানীবাজারে নেই কোনো স্মৃতিচিহ্ন

স্বাধীকার আন্দোলনে প্রথম শহীদ মনু মিয়া

শাবুল আহমেদ, বিয়ানীবজার  |  ৩০ নভেম্বর, ২০১৫

৭ জুন বাঙালির জাতীয় জীবনে এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। বিয়ানীবাজার উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে এই দিনটিকে শহীদ মনু মিয়া দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

কার্যত ১৯৬৬ সালে ৬ দফা তথা স্বাধীকার আন্দোলনে প্রথম শহীদ হন বিয়ানীবাজারের কৃতি সন্তান শহীদ মনু মিয়া। স্বাধীকার আন্দোলনের ৪৮ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো সরকারি কিংবা বেসরকারিভাবে তাঁর পিতৃভূমি বিয়ানীবাজারে কোনো স্মৃতিচিহৃ প্রতিষ্ঠা করা হয়নি।

স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে অনেক পটবর্তন হলেও শহীদ মনু মিয়ার স্মৃতি রক্ষার্থে কোনো সরকারই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেনি।

স্থানীয়ভাবে মনু মিয়ার নামে একটি সড়কের নামকরণে দাবী এখনো উপেক্ষিত। স্থানীয় রাজনৈতিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ বিয়ানীবাজার পৌরসভা এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন।

১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলনের সেই আগুনঝরা দিনে মনু মিয়া ছিলেন সংগ্রামের প্রথম শহীদ। শ্রমিক মনু মিয়ার আত্মদান ছিল সে আন্দোলনের সবচেয়ে মহিমান্বিত। একজন সাধারণ মানুষ থেকে স্বদেশের জন্য, স্বজাতির জন্য আত্মত্যাগের মাধ্যমে অসাধারণ হয়ে ওঠেন মনু মিয়া।

মনু মিয়ার পুরো নাম ফখরুল মৌলা খান। বাড়ি বিয়ানীবাজার উপজেলার বড়দেশ গ্রামে, বর্তমানে তাদের পরিবার নয়াগ্রামে চলে এসেছেন। পিতা মনহুর আলী খানের ৬ পুত্র ও ৩ বোনের মধ্যে দ্বিতীয় ছিলেন তিনি।

পরিবারের আর্থিক অভাব অনটনের কারণে প্রাথমিক শিক্ষার বেশী লেখাপড়া করতে পারেননি। ২০-২২ বয়স পর্যন্ত বাড়ীতে গৃহস্থালী কাজ করেন। অতঃপর জীবন ও জীবিকার তাড়নায় ঢাকায় পাড়ি দেন। গাড়ী চালনা শেখে চাকুরী নেন এক কোমল পানীয়ের কোম্পানীতে।

৬ দফা আন্দোলন তখন বেগবান হচ্ছে। তুমুল থেখে তুমুলতর হচ্ছে বাঙালির প্রতিদিনের প্রতিরোধ সংগ্রাম। সেই সংগ্রাম মনু মিয়ার কাঁদা-জল মাখা শরীরেও দোলা দেয়। একেবারেই গ্রাম থেকে ওঠে আসা শ্রমিক মনু মিয়ার শরীরে তখনও ছিল মাটির ঘ্রাণ, তার শ্রমিক দেহে প্রতিবিন্দু ঘামে ছিল মেহনতি মানুষের আমরণ লড়াইয়ের প্রত্যয়। মৃত্যু পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত সেই প্রত্যয় ধারণ করেছিলেন মনু মিয়া। আওয়ামীলীগের ব্যানারে তিনি নেমে আসেন রাজপথে, ব্যস্ত হয়ে পড়েন মিছিল, মিটিং, ধর্মঘটে।

৭ জুন সকাল ১১টা। তেজগাঁও শিল্প এলাকার শ্রমিক কর্মচারীরা মিছিল নিয়ে রাজপথে বেরিয়ে পড়ে। অবস্থান নেয় তেজগাঁও রেলস্টেশনের আউটার সিগনালের কাছে। অবরোধ করে রেল লাইন। পুলিশ প্রহরায়ও রেল চালানো ব্যর্থ হয়। এক পর্যায়ে পুলিশ প্রতিবাদকারী শ্রমিক-জনতার উপর গুলি চালায়। গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন ৩০ বছর বয়সী শ্রমিক মনু মিয়া।

৭ জুন হরতাল চলাকালে মনু মিয়া ছাড়াও নাম না জানা আরো অনেকে শহীদ হন। কিন্তু মনু মিয়ার সে আত্মত্যাগ অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। মনু মিয়ার লাশ নিয়ে ছাত্র, জনতা, শ্রমিক বিশাল বিক্ষোভ মিছিল করে। বিক্ষোভে ফেটে পড়ে সারা দেশ।

মনু মিয়ার আত্মদানে স্মৃতি বিজড়িত ৭ জুন ছিল স্বৈরাচারী আইয়ুব সরকারের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ এবং ৬ দফা তথা বাঙালির স্বাধীকারের পক্ষে প্রথম আত্মবিসর্জন।

৬ দফা থেকেইে আসে ছাত্র সমাজের ১১ দফা, সত্তুরের নির্বাচনী বিজয়। এরই ধারাবাহিকতায় মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা।

স্বাধীনতার পর শহীদ মনু মিয়ার স্মৃতি রক্ষার উদ্যোগ নেয় বঙ্গবন্ধুর সরকার। তেজগাঁও নাখাল পাড়ায় তার নামে ‘মনু মিয়া উচ্চ বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করা হয়।’ তবে স্থানীয়ভাবে এখন পর্যন্ত শহীদ মনু মিয়ার কোনো স্মৃতিচিহৃ নেই। বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই জানে না স্বাধীকার আন্দোলনে প্রথম শহীদ মনু মিয়া পঞ্চখণ্ড তথা বিয়ানীবাজারের ভূমিপুত্র।

শহীদ মনু মিয়ার একমাত্র সন্তান কানিজ ফাতেমা পুতুল এ প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমার চাওয়া পাওয়ার কিছু নেই। দেশ মাতৃকার স্বার্থে যিনি নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন সেই বাবার স্মৃতি রক্ষার্থে আমি সবার সহযোগিতা চাই। বর্তমান তথা নতুন প্রজন্ম জানুক স্বাধীকার আন্দোলনে প্রথম শহীদ মনু মিয়ার বাড়ি এই বিয়ানীবাজারে।’

নয়াগ্রাম সড়কের নামকরণের দাবী এখনো উপেক্ষিত :
নতুন প্রজন্মের কাছে স্বাধীকার আন্দোলনের প্রথম শহীদ মনু মিয়ার বীরত্বগাঁথা কাহিনী পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভূক্ত করার পাশাপাশি তাঁর স্মৃতিরক্ষার্থে বিয়ানীবাজারের পৌরশহরের নয়াগ্রামের সড়কটি শহীদ মনু মিয়ার নামে নামকরণ মাধ্যমে দেশের এই অকুতোভয় বীর শহীদকে যথার্থ মূল্যায়নের দীর্ঘদিনের দাবী এখনো উপেক্ষিত।

স্থানীয় এলাকাবাসীর মতে স্বাধীকার আন্দোলনের স্বপক্ষের সরকার এখন ক্ষমতায় অতএব এখনই সময় নয়াগ্রাম সড়কটি মনু মিয়া সড়কে বাস্তবায়ন করা।

তাঁরা এ ব্যাপারে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ’র সহযোগিতা কামনা করেছেন।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.