ইয়াকুব শাহরিয়ার, শান্তিগঞ্জ | ১৩ ডিসেম্বর, ২০২১
‘আগন মাসের শেষ। আগের মতো এখন আর বাইনের (ধানের বীজ ছিটিয়ে রাখার ফলে যে ধান হয়) ডেঙ্গা পাওয়া যায় না। এর লাগি রোয়াডেঙ্গা (রোপনকৃত ধান থেকে তৈরি খড়) খাটিয়ার। তোরা তোরা বাইন জমিন যারা করছইন ইতাও তারা বেচিলাইন। টেখাছাড়া এখন আর কেউ ডেঙ্গা-খেড় দেইন না। ১৫/২০ বছর আগে যাচিয়া (উপযাচক হয়ে) অনেকে খেড় দিতা।’
এভাবেই আক্ষেপ নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন জ্বালানির জন্য দত্তবন্দে (ছোট হাওর) খড় সংগ্রহ করতে আসা শান্তিগঞ্জ উপজেলার কান্দিগাঁও গ্রামের এক মহিলা। সাথে তার স্বামীও।
মূলত, যুগ যুগ ধরে অগ্রহায়ণ মাসের শেষের দিকে আমন ধান কাটার পর ধানী জমিতে পড়ে থাকা খড় জ্বালানির জন্য সংগ্রহ করে থাকেন শান্তিগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন হাওরপাড়ের নিম্ন, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির নারী-পুরুষ। এমন সময় খড় সংগ্রহের কাজে চূড়ান্ত ব্যস্ততায় প্রতিটি দিনক্ষণ কাটে এ উপজেলার পল্লীর মানুষদের। যারা হাওরে গিয়ে নিজে খড় সংগ্রহ করেন না, তারা দৈনিক মজুরিতে লোক রেখে খড় সংগ্রহ করান। আর এসব সংগ্রহকৃত খড়ে রান্না করার জন্য ব্যবস্থা করা হয় আলাদা চুলার। দীর্ঘদিন খড়কে সংগ্রহে সুরক্ষিত রাখতে অভিজ্ঞ মানুষ দ্বারা তৈরি করা হয় খড়ের ভোলা। বিশেষ প্রক্রিয়ায় সংগ্রহ করা হয় বলে ঝড়বৃষ্টিতে তেমন ক্ষতি হয় না। তবে মাত্রাতিরিক্ত বৃষ্টি কিংবা বাদলা দিন থাকলে খড় পচে যাওয়ার শঙ্কা থেকে যায়।
শুধু যে জ্বালানির জন্যই লোকজন খড় সংগ্রহ করেন তা কিন্তু নয়। অধিকাংশ কৃষক গো-খাদ্যের জন্যও খড় সংগ্রহ করে থাকেন। তবে সাধারণ খড়ের চেয়ে গো-খাদ্যের জন্য সংগ্রহকৃত খড়ের বিশেষ চাহিদা থাকে। ধান কেটে মারাই করার পর যে খড় অবশিষ্ট থাকে সে খড়ই বিশেষভাবে গো-খাদ্যের জন্য সংগ্রহ করা হয়। যা বর্ষা কালীন সময় সবচেয়ে বেশি উপকারে আসে। তখন চড়ামূল্য তখন বিক্রিও করা যায়।
কৃষক মছব্বির আলী বলেন, আগেকার দিনে জমিতে প্রচুর পরিমাণে পলি থাকতো বলে ধানের চাষও ভালো হতো। তাতে সার দিতে হতো না। পর্যাপ্ত পরিমাণে সূলভমূল্যে ধান কাটার শ্রমিকও পাওয়া যেতো। এখন সবকিছুর বাজারদর বেশি। এক কেদার জমি চাষ করতে যে পরিমাণ খরচ তা থেকে জমির মালিককে দিয়ে প্রকৃত কৃষক তেমন একটা লাভবান হতে পারেন না। তাই কৃষকরা খড়কুটা বিক্রি করে হলেও একটু লাভের চোখ দেখতে চান।