আমীর হামজা, হবিগঞ্জ: | ০১ জানুয়ারী, ২০২২
২০২১ বিদায় নিয়েছে। ২০২২ সালকে স্বাগত জানাচ্ছে মানুষ। কিন্তু নানা কারণে বিদায়ী ২০২১ সালকে মনে রাখবে হবিগঞ্জ জেলার মানুষ। ২১- এ হবিগঞ্জে ঘটেছে বিভিন্ন আলোচিত-সমালোচিত ঘটনা। এর মধ্যে পুলিশ-বিএনপির সংঘর্ষ, প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে নিজের মাকে হত্যা, নিজের মেয়েকে লুকিয়ে প্রতিপক্ষকে গায়েলের চেষ্টা, সড়কে প্রাণহানি, অগ্নিকাণ্ড, আত্মহনন এবং শিশু ও তরুণীকে ধর্ষণের ঘটনা আলোচিত বিষয় ছিল।
ল্যাব টেকনোলজিস্ট হত্যা:
গত বুধবার দিনে-দুপুরে শহরের সাইফুর রহমান টাউনহল রোডের জুনিয়র হাইস্কুল এন্ড কলেজের প্রবেশ মুখে হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) সাইফুল ইসলামকে পিঠিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। ঘটনার পর থেকে হাসপাতালের জরুরী বিভাগ ছাড়া সব বিভাগের স্বাস্থ্য সেবা বন্ধ রয়েছে। এ ঘটনায় হবিগঞ্জসহ বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করছেন সাইফুলের সহকর্মী ও বন্ধু মহল। ঘটনার ৩দিন অতিবাহিত হলেও খুনিদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। বছরের শেষ সময়ে বিষয়টি হবিগঞ্জে সবচেয়ে আলোচিত হয়েছে।
পুলিশ-বিএনপি সংঘর্ষ, পুলিশের মামলায় আসামি ২ হাজার:
টানা এক বছর বিএনপির বড় কোনো কর্মসূচি পালন করেনি। গত ২২ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার মুক্তি ও বিদেশে চিকিৎসার দাবিতে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে সমাবেশের আয়োজন করে জেলা বিএনপি। সমাবেশকে কেন্দ্র করে কঠোর অবস্থান নেয় পুলিশ। সামাবেশের অনুমতি না দিয়ে সভামঞ্চ ভেঙে দেওয়া হয়। দুপুর ২টার আগে নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে সমাবেশ স্থলে রওনা হলে শায়েস্তানগর পয়েন্টে তাদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বাধে। এতে পুলিশ ১২ রাউন্ড রাবার বুলেট ও ৯০ রাউন্ড টিআর শেল নিক্ষেপ করে। এসময় পুলিশের গুলিতে বিএনপির অন্তত শতাধিক নেতা কর্মী আহত হন। এছাড়া জেলা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক শাহ রাজিব আহমেদ রিংগনের পুরো শরীরে কয়েক শতাধিক রাবার বুলেটের আঘাত লাগে। হবিগঞ্জের ইতিহাসে এর আগে এত গুলি বর্ষণের ঘটনা ঘটেনি।
এসপিসহ ৫৪ জনের বিরুদ্ধে বিএনপির মামলার আবেদন:
গুলি বর্ষণের ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার এসপি-ওসিসহ ৫৪জনের বিরুদ্ধে বিএনপি নেতা শামসুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলার আবেদন করছেন। আগামী সোমবার এবিষয়ে আদেশ দিবেন আদালত। বছরের শেষ সময়ের আলোচিত ঘটনা ছিল এটি।
মেয়েকে লুকিয়ে অপহরণ মামলা:
প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে গিয়ে নিজ মেয়েকে লুকিয়ে রেখে অপহরণ মামলা দেওয়ার ১২ বছর পর ভিকটিম জফুরা খাতুনকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। ভিকটিম নাম পরিবর্তন করে ঢাকার একটি গার্মেন্টেসে চাকরি করতেন। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে খবর পেয়ে গত ১৩ সেপ্টেম্বর বিকেলে ঢাকার কদমতলী থেকে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হবিগঞ্জ সদর মডেল থানায় নিয়ে আসে।
১২ বছর আগে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার রাজিউড়া ইউনিয়নের রতনপুর গ্রামের মৃত রমজান আলীর ছেলে ফুল মিয়ার সঙ্গে জমি সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে একই গ্রামের মৃত হোসেন আলীর ছেলে হারুন মিয়ার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। কিন্তু এলাকার কিছু কুচক্রী মহলের প্ররোচনায় ফুল মিয়ার স্ত্রী আমিনা খাতুন হারুন মিয়ার লোকজনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ চেষ্টার মামলা দায়ের করে।
মামলাটি দুইবার তদন্তে মিথ্যা প্রমাণিত হলে হারুন মিয়াকে ঘায়েল করতে ২০১২ সালের ৯ নভেম্বর আমিনা খাতুন তার নাবালিকা মেয়ে জফুরা খাতুনকে অপহরণ করা হয়েছে মর্মে হবিগঞ্জ সদর থানায় অপহরণ মামলা দায়ের করেন।
এই ঘটনার দীর্ঘদিন পর জানা যায় ভিকটিম জফুরা খাতুন ফাতেমা নাম ধারণ করে ঢাকার কদমতলীর এএসটি এ্যাপারেল নামক গার্মেন্টে চাকরি করে। পরে হবিগঞ্জ সদর থানার এসআই সনত চন্দ্র দাস ঢাকার পুলিশের সহায়তায় ভিকটিমকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসেন।
১ বছরে ৫০টি খুন:
২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত হবিগঞ্জে খুনের ঘটনা ঘটেছে অন্তত ৫০টি। এর মধ্যে ৩৪ জন পুরুষ ও ১৬ জন নারী রয়েছেন।
সবচেয়ে বেশি খুনের ঘটনা ঘটেছে জেলার বানিয়াচং উপজেলায়। এই উপজেলার নিশ্চিন্তপুর গ্রামে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে নিজের মাকে ফিকল দিয়ে হত্যার মতো ঘটনাও ঘটেছে। নিহতদের মধ্যে দুই পক্ষের সংঘর্ষের ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ৯ জনের ও বাকিদের অধিকাংশই খুনের পর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
জেলা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বানিয়াচংয়ে ১৩ জন, বাহুবলে ৭ জন, হবিগঞ্জ সদর উপজেলায় ৬ জন, নবীগঞ্জে ৬ জন, চুনারুঘাটে ৬ জন, লাখাইয়ে ৫ জন, মাধবপুরে ৪ জন, আজমিরীগঞ্জে ২ জন ও শায়েস্তাগঞ্জে ১ জন।
খুনের ঘটনা বিশ্লেষন করে দেখা যায়, অধিকাংশ হত্যাকণ্ড ঘটেছে ছোটখাটো বিষয় নিয়ে।
হবিগঞ্জের অতিরিক্তি পুলিশ সুপার মাহমুদুল হাসান বলেন, ছোটখাটো অনেক ঘটনাকে কেন্দ্র করেই হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে পারিবারিক ও গ্রাম্য দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছে।
সড়কে প্রাণ ঝরেছে ১১০ জনের:
২১ সালের জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত হবিগঞ্জে ৭৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হরিয়েছেন ১১০ জন। জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, দুর্ঘটনায় মাধবপুর ও শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
সূত্র জানায়, নিহতদের মধ্যে, মাধবপুরের ৩৫ জন, শায়েস্তাগঞ্জের ২৪ জন, সদরের ১২ জন, বাহুবলের ১১ জন, বানিয়াচংয়ের ১০ জন, নবীগঞ্জের ৯ জন, চুনারুঘাটের ৩ জন, আজমিরীগঞ্জের ৩ জন ও লাখাই উপজেলার ৩ জন। দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সিএনজি চালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল আরোহীরা। দুর্ঘটনাগুলো অধিকাংশই মহাসড়কে হয়েছে। নিহতদের বেশি প্রাণ ঝড়েছে তরুণদের। এর মধ্যে মাধবপুর উপজেলার বেশির ভাগ মানুষ মারা গেছেন।
ধর্ষণের অভিযোগ ৬২টি মামলা দায়ের:
জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ধর্ষণের অভিযোগে ৬২টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে ৪টি সংঘবদ্ধ ধর্ষণসহ অন্তত ২২টি ধর্ষণের ঘটনার পুরোপুরি সত্যতা পেয়েছে পুলিশ। এর মধ্যে ২ জন নারী ও ৬ জন শিশু বাকি ১৪ জন তরুণী।
এসব ঘটনায় পুলিশ ৩৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছেন ও জড়িত ১৭ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
ধর্ষণের ঘটনায় চুনারুঘাটে বন্ধুকে সাথে নিয়ে মেয়েকে ধর্ষণের ঘটনায় সারাদেশে আলোচিত হয়েছে। এ ছাড়া লাখাইয়ে স্বামীকে নৌকায় বেধে নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে।
১৮০ অগ্নিকাণ্ড:
হবিগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কর্মকর্তা নুরুল ইসলামের তথ্যানুযায়ী ২১ সালের জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত হবিগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায় ১৮০টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে পুড়েছে প্রায় ১ কোটি ৬৩ লাখ ৯৩ হাজার টাকার মালামাল। তিনি জানান, অগ্নিকাণ্ডের বেশির ভাগ বৈদ্যুতিক সট সার্কিট থেকে সূত্রপাত হয়েছে।
বেড়েছে অপমৃত্যু:
জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত হবিগঞ্জে ১৬২টি অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে অধিকাংশই ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার, বিষাক্রান্ত হয়ে মৃত্যু, বজ্রাঘাতে, পানিতে ডুবে, বিদ্যুতায়িত হয়ে মারা যান।
এর মধ্যে মাধবপুরে ৪৩, বানিয়াচংয়ে ২৯, সদরে ২০, চুনারুঘাটে ১৬, বাহুবলে ১৪, নবীগঞ্জে ১৯, লাখাইয়ে ১১, আজমিরীগঞ্জে ৬ ও শায়েস্তাগঞ্জে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এর আগে ২০২০ সালে জেলায় অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল ১৩১ জনের। ২০২১ সালে ৩১ জন বেড়ে তা দাঁড়িয়েছে ১৬২ জনে।
হবিগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহমুদুল হাসান জানান, পারিবারিক কলহ, প্রেম সংক্রান্ত বিষয়, অতি রাগ থেকে মানুষ আত্মহত্যার পথ বেঁচে নেন।