Sylhet Today 24 PRINT

বিতর্কের জালে বন্দি বিয়ানীবাজার মুক্ত দিবসের সঠিক ইতিহাস!

শাবুল আহমেদ |  ০৬ ডিসেম্বর, ২০১৫

হাজার বছরের গৌরব ও ঐতিহ্যের লালনভূমি পঞ্চখণ্ড তথা বিয়ানীবাজারের অবস্থান সিলেট জেলার পূর্ব সীমান্তে। সুরমা, কুশিয়ারা ও সুনাই নদীবেষ্টিত প্রাচীন এই জনপদ। আদি জনবসতির ভূখন্ড বিয়ানীবাজার খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতাব্দী থেকে বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার বছর ‘পঞ্চখণ্ড’ নাম ধারণ করে বিত্ত-বৈভব আর ঐশ্বর্যে জ্যোতির্ময় জনপদ হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। ঐতিহ্যপূর্ণ এই জনপদ পঞ্চখণ্ডের রয়েছে সভ্যতা-কৃষ্টির এক সুদীর্ঘ ও গৌরবময় অধ্যায়।

ব্রিটিশ শাসনামলের ১৭৯৩ খ্রি. ‘থানা’ ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হলে প খণ্ড ও তার বি¯তৃত এলাকা নিয়ে জলঢুপ থানা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪০ খ্রি. জলঢুপ থানাকে ভেঙে বিয়ানীবাজার ও বড়লেখা নামে পৃথক দুটি থানা প্রতিষ্ঠা করা হয়। বিয়ানীবাজার উপজেলাটি মুক্তিযুদ্ধকালে ৪ নম্বর সেক্টরের অন্তর্ভূক্ত ছিল। সে সময় মেজর জেনারেল (অব:) সি আর দত্ত সেক্টর কমান্ডের দায়িত্ব পালন করেন। এ সদর দফতর ছিল ভারতের করিমগঞ্জে প্রয়াত এমপি দেওয়ান ফরিদ গাজীর নেতৃত্বে। বড়লেখা উপজেলার পাশ্ববর্তী বারপুঞ্জি ও কুকিরতলে সাব-সেক্টর স্থাপন করা হয়। পাকহানাদারের বিরুদ্ধে অসংখ্য ছোট-বড় আক্রমন চালিয়েছে এ সাব সেক্টরের মুক্তি সেনারা। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকহানাদার বাহিনী এবং তাদের দোসর এ দেশীয় রাজাকার হাতে প্রাণ দিতে হয়েছে এ অ লের অসংখ্য মানুষকে। ইজ্জত হরণ অনেক মা-বোনের। এ যুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে প্রায় ৫৮০জন মুক্তিযোদ্ধা। এ যুৃদ্ধে প্রায় ১৮০ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ জন। পাকবাহিনী পৌর শহরে ডাকবাংলোয় তাদের ক্যাম্প স্থাপন করে হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠনসহ নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায় উপজেলার প্রত্যন্ত অ লে। পৌরশহরের শহীদ টিলায় অবস্থিত বধ্যভূমি এবং উপজেলার কাঠালতলার বধ্যভূমি এখনো সে সময়ের ঘটনার স্বাক্ষী বহন করে চলেছে।

তথ্যসূত্রে জানা যায়, ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ সারা দেশে পাকবাহিনীর নিপীড়নের ধারাবাহিকতায় এপ্রিলের প্রথম দিকেই বিয়ানীবাজার তাদের দখলে চলে যায়। পাকবাহিনীর এদেশীয় দোসর বিয়ানীবাজার উপজেলার কয়েকজন কুখ্যাত রাজাকারের সহায়তায় হানাদাররা বিয়ানীবাজারে শুরু করে নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা, লুণ্ঠন ও রাহাজানি। প্রায় ১৯ টি পরিবার রয়েছে যাদের একাধিকজন গণহত্যার শিকার হন।

যদিও স্থানীয়ভাবে বিয়ানীবাজার মুক্ত দিবস নিয়ে রয়েছে নানা তর্ক-বির্তক। কেউ কেউ মনে করেন ৬ ডিসেম্বর আবার কারোও মতে ৭ ডিসেম্বর এ অঞ্চল সম্পূর্ণ শত্রু মুক্ত হয়েছে। সঠিক তারিখ নিয়ে লেখক-গবেষক, রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা রয়েছেন দ্বিধাবিভক্ত। বির্তর্কের এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে আগামীতে মুক্তদিবস পালন নিয়ে বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে বলে আশংকা করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

জানা যায়, বিগত কয়েক বছর থেকে স্থানীয়ভাবে ৬ এবং ৭ ডিসেম্বর বিয়ানীবাজার মুক্ত দিবস পালন করে যাচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মুক্তিযোদ্ধা সংগঠন। তবে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডের উদ্যোগে ৭ ডিসেম্বর নানা আযোজনে দিবসটি উদযাপন করা হয়।

তৎকালীন বিয়ানীবাজার ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এম.এ মুছব্বির বলেন, ‘আমি হলফ করে বলতে পারি ৭ই ডিসেম্বর বিয়ানীবাজার মুক্ত দিবস। ৬ই ডিসেম্বর যাঁরা বলে বেড়াচ্ছে তারা ইতিহাসের বিকৃতি ঘটাচ্ছে। তিনি বলেন, ৬ ডিসেম্বর রাত সাড়ে এগারটার দিকে ক্যাপ্টেন গন্দলসহ পাকবাহিনী বিচ্ছিন্নভাবে বিয়ানীবাজার থেকে চলে যায়। আমি এবং মুক্তিযোদ্ধা শফিক উদ্দিন, আবু বকর, মতিউর রহমান, আমির উদ্দিনসহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ৬ তারিখ মধ্য রাতে জয়বাংলা স্লোগান দিয়ে বিয়ানীবাজারে প্রবেশ করি। পরবর্তীতে কয়েকটি গ্র“পে বিভক্ত হয়ে আমরা কয়েকটি পয়েন্টে অবস্থান নেই। পাকবাহিনী যাতে ফিরে এসে আক্রমন চালাতে না পারে সেজন্য আমরা নদীপথের নৌকাগুলো ওপার থেকে এপারে নিয়ে আসি। সকালে ডাকবাংলোয় ক্যাপ্টেন গন্ধলের চেয়ারে আমিই প্রথম বসি। তখনও দোকানপাঠ পুরোপুরি খুলেনি। পরবর্তীতে সকাল এগারটার দিকে বিয়ানীবাজার থেকে বাংলার মানচিত্র খচিত একটি পতাকা নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আমরা উত্তোলন করি।’ বীরমুক্তিযোদ্ধা আবদুল মালীক ফারুক বলেন, ‘সে সময় আমি ছাতকক্যাম্পে ছিলাম। পরবর্তীতে এসে শুনেছি ৬ ডিসেম্বর বিয়ানীবাজার মুক্ত হয়েছে; ইদানিং শুনছি ৭ ডিসেম্বর।’ তিনি বলেন যাই হোক সঠিক ইতিহাস জেনে যে কোনো একটা দিন পরিস্কার হওয়া উচিত।’

কবি ফজলুল হক বলেন, ‘পিএইচজি হাই স্কুলের ছাত্র থাকাকালীন ৭ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পতাকা উত্তোলনে সময় জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনে আমরা অংশ নিই। ৭ ডিসেম্বর বিয়ানীবাজার মুক্তদিবস এখানে বির্তকের কোনো সুযোগ নেই। প্রয়োজনে এ বির্তক এড়াতে মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র অনুসন্ধান করা যেতে পারে।’

শিক্ষক ও সাংবাদিক খালেদ সাইফুদ্দিন জাফরী বলেন ‘ ৬ ডিসেম্বর বিয়ানীবাজার মুক্ত হয়েছে এতে কোন সন্দেহ নেই।’ তিনি বলেন, ৫ তারিখ দুপুর দুইটায় ভারতীয় যুদ্ধ বিমান আমাদের এলাকা দিয়ে চলে যায়, তখন খুব জোরে গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। পরবর্তীতে জানা গেল ভারতের সাথে পাকিস্থানের যুদ্ধ শুরু হয়েছে। জানার পর একটা কৌতুহল ছিল সবার মধ্যে। ৬ তারিখ ভোরে উঠে বিয়ানীবাজারে কোন সৈন্য আর দেখা যায়নি; ৫ তারিখ গভীর রাতেই তারা চলে যায়। অতএব বলার অপেক্ষা থাকে না ৬ তারিখই বিয়ানীবাজার মুক্ত দিবস।’

‘‘একাত্তরের গণহত্যা : রাজধানী থেকে বিয়ানীবাজার’’ গ্রন্থের লেখক গবেষক সাংবাদিক আজিজুল পারভেজ বলেন, বিয়ানীবাজার সশস্ত্র যুদ্ধে মুক্ত হয়নি। মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করে এ অঞ্চল দখল নেন নি। ৬ ডিসেম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর ডালিমের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা বিয়ানীবাজারে প্রবেশ করলে পাকবাহিনী এ অঞ্চলের দখল ছেড়ে দেয়। ঐতিহাসিক এ বিজয় নিয়ে বিতর্কের কিছু নেই বলে তিনি জানান।

তরুণ প্রজন্মের সমাজকর্মী কর্মী মাছুম আহমদ বলেন, ‘স্বাধীনতার ৪৪ বছর পেরিয়ে গেল অথচ এখনো আমরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাসটি জানতে পারিনি। এটা নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য পীড়াদায়ক।’ তরুণপ্রজন্মরা অনতিবিলম্বে স্থানীয় সুশীল সমাজ, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, গবেষক ও মুক্তিযোদ্ধারা একত্রিত হয়ে বর্তমান তথা নতুন প্রজন্মের কাছে বিয়ানীবাজার মুক্ত দিবসের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার আহবান জানান।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ [email protected] ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.