Sylhet Today 24 PRINT

বড়লেখার দক্ষিণভাগ স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের নজিরবিহীন শিক্ষা বাণিজ্য

তপন কুমার দাস, বড়লেখা |  ০৭ ডিসেম্বর, ২০১৫

মৌলভীবাজারের বড়লেখার দক্ষিণভাগ হাইস্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শাহীদুল ইসলামের বিরুদ্ধে স্কুলকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা, নিজের নামে প্রতিষ্ঠিত কে.জি স্কুলে মেধাবী শিক্ষার্থী স্থানান্তর, তথ্য গোপন করে অনৈতিক সুবিধা ভোগ, জনৈক সচিবের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে দাপট, চাকুরীবিধি লঙ্ঘন করে দায়িত্ব পালনসহ পাহাড়সম অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষা বিভাগ ও সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে একাধিক লিখিত অভিযোগ দেয়া সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াতো দুরের কথা তদন্ত পর্যন্ত না হওয়ায় এ শিক্ষকের খুঁটির জোর নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠছে।  

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ১৯৯০ সালে ফাজিল পাস শাহীদুল ইসলাম’ ৯১ সালের ৬ জুলাই সহকারী মৌলানা পদে দক্ষিণভাগ এনসিএম হাইস্কুলে যোগদান করেন। স্কুল কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতিরেকে ’ ৯৫ সালে তিনি বিএ (প্রাইভেট) পাস করেন। বেসরকারি স্কুলের চাকুরী বিধি অনুযায়ী কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতীত উচ্চতর ডিগ্রী অর্জনের নিয়ম না থাকলেও তিনি নিয়ম কানুনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিএ শ্রেণীর পড়াশুনা চালিয়ে যান এবং একই সময়ে কর্মস্থল থেকে নিয়মিত বেতন ভাতাসহ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন। ’৯৫ সালে প্রাইভেট বিএ পাস করা এ শিক্ষক স্কুলের তথ্য বিবরণীতে ’৯০ সালে স্নাতক পাস উল্লেখ করে বিশেষ সুবিধা ভোগ করছেন। পাবলিক পরীক্ষায় নিজের সন্তান পরীক্ষার্থী থাকলে কেন্দ্র সচিবের দায়িত্ব পালনের নিয়ম না থাকলেও তথ্য গোপন করে গত দুই বছর তিনি অবৈধভাবে পিএসসি পরীক্ষায় কেন্দ্র সচিবের দায়িত্ব পালন করেন।



ফৌজদারি মামলার আসামী হওয়ার কারণে বড়লেখার চারজন শিক্ষক সাময়িক বরখাস্ত হলেও তার ক্ষেত্রে এ আইন প্রযোজ্য হয়নি। নিয়োগ বিধি মোতাবেক পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও ২০০৪ সালে প্রধান শিক্ষক পদের নিয়োগ পরীক্ষায় চার দলীয় জোট সরকারের স্থানীয় নেতাদের আর্শিবাদপুষ্ট সহকারী মৌলানা পদের শিক্ষক শাহীদুল অংশ নেন। প্রার্থী বাছাইয়ে বাতিল হওয়ার কথা থাকলেও রহস্যজনক কারণে নিয়োগ কমিটি তাকে নিয়োগ পরীক্ষায় সুযোগ দেয় এবং নির্বাচিতও করে। পরে ম্যানুয়েল খতিয়ে বিধিবদ্ধ না হওয়ায় তাকে নিয়োগ না দেয়ায় তিনি কমিটির বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করে স্কুলের কয়েক লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতি করেন। মামলা চলাকালীন জোট সরকারের প্রভাবশালী কয়েকজন নেতাদের চাপে তাকে সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ দেয়ার শর্তে মামলা তুলে নেন ক্লাসিক্যাল টিচার শাহীদুল ইসলাম।

স্কুলের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে মামলা করে লাখ লাখ টাকা ক্ষতি সাধন করলেও ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পরিবর্তে পুরস্কার স্বরূপ তাকে ২০০৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ উপহার দেয়ায় এলাকার অভিভাবকসহ সচেতন মহলে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।  

সূত্র জানায়, শিক্ষক শাহীদুল ইসলামকে সহকারী প্রধান শিক্ষক নিযুক্ত করতে পাহাড়সম অনিয়মের আশ্রয় নেয় তৎকালীন স্কুল ম্যানেজিং কমিটি। শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী যে কোন শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি একটি জাতীয় ও একটি স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশ করার নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু এ সময় কেবল একটি স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। বিধিমালা অনুযায়ী কোন ক্লাসিক্যাল টিচার পদ পরিবর্তন না করে প্রশাসনিক পদে আবেদন করতে পারেন না। তিনি সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে আবেদন করে লিখিত পরীক্ষায় ৩য় স্থান অর্জন করেও নানা তেলেসমাতিতে প্রথম হন। ২০০৬ সালের ২ নভেম্বরের কমিটি সভায় তার নিয়োগ অনুমোদন করেনি কমিটি। পরে জোট নেতাদের চাপে ৬ নভেম্বরের সভায় কমিটি তার নিয়োগ অনুমোদন করতে বাধ্য হয়।

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও সাবেক স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আজির উদ্দিন জানান, অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে সহকারী প্রধান শিক্ষক নিযুক্ত হওয়া শাহীদুল ইসলাম এ স্কুলটিকে ধ্বংসের ষড়যন্ত্র করছেন। প্রায় ৬ বছর ধরে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের পদ আঁকড়ে ধরে তিনি স্কুলে শিক্ষক সংকট, মামলা মোকদ্দমাসহসহ নানা কৃত্রিম জটিলতা সৃষ্টি করে শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত করছেন। নিজের নামে প্রতিষ্ঠিত এমরান শাহীদুল কেজি স্কুলে ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শ্রেণী খোলে এ স্কুলের মেধাবী শিক্ষার্থীকে পাচার করছেন এবং রমরমা শিক্ষা বাণিজ্য চালাচ্ছেন। তার এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ডের তদন্তপুর্বক ব্যবস্থা নিতে ২-৩ বছর ধরে আমিসহ একাধিক অভিভাবক শিক্ষা বিভাগের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেছেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত একটি অভিযোগেরও তদন্ত হয়নি। নানা তথ্য গোপন করে দুর্নীতিবাজ এ ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক প্রায় ৯ বছর ধরে সরকারী সুযোগ সুবিধা ভোগ করছে। তিনি অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত অযোগ্য একাধিক ফৌজদারি মামলার আসামী দুর্নীতিবাজ এ শিক্ষকের বিরুদ্ধে অবিলম্বে তদন্ত পূর্বক ব্যবস্থা নেয়ার দাবী জানান।

রোববার দক্ষিণভাগ হাইস্কুলে সরেজমিনে গিয়ে, বার্ষিক পরীক্ষায় অংক বিষয়ের পরীক্ষা চলতে দেখা গেছে। তিনটি পরীক্ষা হলে এমরান শাহীদুল একাডেমীর নিজস্ব ড্রেস পরা ৬ষ্ঠ ও ৭ম শ্রেণীর ৮জন শিক্ষার্থীকে পরীক্ষা দিতে দেখা যায়। কক্ষ পরিদর্শক শিক্ষকরা জানান, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক একক ক্ষমতাবলে গত ৩-৪ বছর ধরে মেধাবী শিক্ষার্থীদের এ স্কুলের নামে পাঠ্যবই উত্তোলন করে নিজের প্রাইভেট কেজি স্কুলে ভর্তি করেন। সারাবছর এ স্কুলের ভর্তি ফি ও বেতন না দিয়েও বার্ষিক পরীক্ষায় অংশ নেয়ার সুযোগ দিচ্ছেন। সাধারণ শিক্ষকদের মতে এটি অনৈতিক শিক্ষা বাণিজ্য ও এ প্রতিষ্ঠানের মেধাবী শিক্ষার্থী পাচারের সামিল।      
       
এ বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষক শাহীদুল ইসলাম জানান, তার বিরুদ্ধে আদালতে যেসব মামলা রয়েছে সেগুলো মিথ্যা মামলা। প্রমাণের আগে মামলাগুলো মিথ্যা বলা সঠিক কি-না প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন চাকুরিবিধিতে এমনটি রয়েছে বলে তার জানা নেই। কর্তৃপক্ষ তো তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি। তার প্রতিষ্ঠিত এমরান-শাহীদুল কেজি স্কুলের শিক্ষার্থীদের (ষষ্ঠ থেকে অষ্টম পর্যন্ত) নিজ বিদ্যালয়ে ভর্তি, বেতন ও ফি ছাড়া এবং সারা বছর ক্লাস না করেই বার্ষিক পরীক্ষায় অংশ নেয়ার সুযোগ দেয়া অনৈতিক উপায়ে শিক্ষা বাণিজ্য নয় কি? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন এখানে অনৈতিকতার কিছু নেই। যে কোন অভিভাবক চাইলে এমন সুযোগ তিনি দিতে পারেন, এখানে শিক্ষানীতির কোন বাধ্যবাধকতা নেই। নিজের সন্তান পরীক্ষার্থী থাকলে কেন্দ্র সচিব থাকায় যায় না এ নিয়মও তার জানা নেই।  

স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আব্দুল মুকিত লুলু জানান, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শাহীদুল ইসলামের বিরুদ্ধে আদালতে ফৌজদারি মামলা রয়েছে তা তিনি জানেন না। মামলার আসামী হলে চাকুরিবিধি অনুযায়ী সাময়িক বরখাস্তের নিয়ম রয়েছে এমনটিও তার জানা নেই। তবে শিক্ষা বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কেন ব্যবস্থা নেয়নি বলে তিনি পাল্টা প্রশ্ন রাখেন।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.