নিজস্ব প্রতিবেদক | ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২২
সড়কের পাশের খুঁটিতেই ফেস্টুনটা টানানো। যাতে লেখা- ‘কুরিয়ান ভাষা শিখতে চাইলে আজই চলে আসুন’। পাশেই দেয়ালে সাঁটানো আরেকটি পোস্টার,- ‘এখানে ফরাসি ভাষা শিখানো হয়’।
সিলেটের জিন্দাবাজার এলাকার এই সড়ক পেরোনোর সময় এসব ফেস্টুন-পোস্টার দেখিয়ে মণিপুরী তরুণ সঞ্জয় সিংহ আফসোস করে বলেন- ‘দেশে এখন ইংরেজি ছাড়া আরো অনেক বিদেশি ভাষাই শিখানো হয়। কিন্তু দেশের ভেতরের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাষাগুলোতে শিক্ষালাভের কোন সুযোগ নেই।’
সঞ্জয়ের এই আফসোসের সাথে একমত পোষণ করে বাংলাদেশ মণিপুরী সাহিত্য সংসদের সভাপতি কবি একে শেরাম বলেন, আমাদের তো সাংবিধানিক স্বীকৃতিই নেই। আমাদের যে নিজস্ব ভাষা আছে, ঋদ্ধ সংস্কৃতি আছে। তা বাংলাদেশের সংবিধান স্বীকার করে নি। সংবিধানের মতে, আমরা উপজাতি। একে তো রাষ্ট্রিয়ভাবে ভাষা শিক্ষার কোন উদ্যোগ নেই। এছাড়া অর্থনৈতিক উপযোগীতা না থাকায় মণিপুরী তরুন প্রজন্ম এখন এই ভাষাটা শিখতেও আগ্রহী নয়।
কেবল মণিপুরী নয়, মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত দেশের বেশিভাগ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুরাই। যদিও ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে ‘প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে আদিবাসীসহ সকল ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার জন্য স্ব স্ব মাতৃভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা করার’ কথা বলা হয়েছে। আর ১৯৯৯ সালে ২১ ফেব্রুয়ারিকে ইউনেস্কো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষনাকালে উল্লেখ করা হয়- সকল ভাষাকে পৃষ্টপোষকতা, সংরক্ষন ও সমানাধিকার প্রধানই এই দিবসের উদেশ্যে।
তবে এখন পর্যন্ত দেশে উপেক্ষিত ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠীদের ভাষা। শিক্ষানীতিতে সকল জাতিসত্ত্বার মাতৃভাষায় শিক্ষা প্রদানের সুযোগের কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত তার তেমন বাস্তবায়ন নেই। শিক্ষানীতি প্রণয়নের ১২ বছর পেরিয়েছে। তবে এ পর্যন্ত মাত্র ৫টি নৃ-গোষ্ঠীর ভাষায় প্রাক প্রাথমিকের কিছু বই প্রকাশ করা হয়েছে। যদিও দেশে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী রয়েছে প্রায় ৪৫ টি। এদের অনেকের নিজস্ব ভাষার লিপি ও বর্ণমালা রয়েছে। তবে শিক্ষা ও চর্চার সুযোগ না থাকায় এই ভাষার বেশিরভাগই এখন হারিয়ে যাচ্ছে।
জানা যায়, ২০১৭ সাল থেকে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও সাদরি ভাষায় সরকারি উদ্যোগে প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত কিছু বই প্রকাশিত হয়। তবে প্রশিক্ষিত লোকের অভাবে এসব ভাষায় শিক্ষাকার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। আর বাকি জনগোষ্ঠির ভাষায় বইই এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে প্রকাশিত হয়নি।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের হিসেব মতে, এ বছর বিভাগে ত্রিপুরা, গারো, সাদরি ভাষার ৬৭৫ শিক্ষার্থীকে তাদের মাতৃভাষায় বই প্রদান করা হয়েছে। তবে সিলেটে মণিপুরী আর খাসিয়া জনগোষ্ঠিই আছে প্রায় দুই লাখ। কিন্তু এই দুই গোষ্ঠির শিশুরা তাদের মাতৃভাষায় বই পায়নি।
এ প্রসঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের উপ পরিচালক মো. মোসলেম উদ্দিন গত শনিবার বলেন, সরকার এই ব্যাপারে খুবই আন্তরিক। উপজেলা পর্যায় থেকে চাহিদা পাঠালে সরকার বই প্রস্তুত করে চাহিদা মাফিক বিতরণ করে।
তিনি বলেন, মণিপুরী ভাষা ও কৃষ্টির ঐতিহ্যর কথা তো আমিও জানি। এই ভাষায় এখন পর্যন্ত কেন বই তৈরি হলো না তা আমারও বোধগম্য নয়। আমি বছরখানেক হয় এখানে এসেছি। কালকেই আমি জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের এ ব্যাপারে চাহিদা তৈরি করতে বলবো। এবং আগামী ব্ছরই যাতে মণিপুরীসহ প্রধান কয়েকটি গোষ্ঠির শিশুরা নিজ ভাষায় বই পায় সে চেষ্টা করবো।
পার্বত্য চট্টগ্রামের ৩ জেলার বাইরে সবচেয়ে বেশি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বাস সিলেট অঞ্চলে। এই বিভাগে প্রায় ৩৭টি ক্ষদ্র জাতি গোষ্ঠি আছে। চা বাগানেই রয়েছে ২৫/২৬টি জনগোষ্ঠি। তবে সিলেটের ৩৭ জনগোষ্ঠির মধ্যে এখন পর্যন্ত দু’-তিটা ছাড়া আর কারোরই সরকারিভাবে মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের সুযোগ মেলেনি। যদিও বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগি সংস্থা ক্ষুদ্র পরিসরে এ চেষ্টা চালাচ্ছে।
সিলেটের একটি প্রাচীন জনগোষ্ঠি পাত্র সম্প্রদায়। সিলেট দিল্লীর সুলতানের আওতায় যাওয়ার আগে সর্বশেষ রাজা গৌড় গোবিন্দও ছিলেন এই সম্প্রদায়ের। তবে সাম্প্রতিক সময়ে একেবারেই কোনঠাসা অবস্থায় আছে এই জনগোষ্ঠির বাসিন্দারা। দারিদ্রতা, জমি দখলসহ নানা কারণে বেশিরভাগই দেশ ছেড়েছেন। এখন সিলেট অঞ্চলে টিকে আছেন প্রাত্র সম্প্রদায়ের প্রায় ৪০০০ হাজার মানুষ। তাদের ভাষার নাম লালেনটার। কিন্তু সরকারি এই উদ্যোগে পাত্র সম্প্রদায়ের শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষাপ্রদানের কোন উদ্যোগ নেই।
তবে পাত্র সম্প্রদায় কল্যান পরিষদ (পাসকপ) নামে একটি সংগঠনের উদ্যোগে নিজেরা মিলে তিনটি কমিউনিটি স্কুল স্থাপন করেছেন তারা। সেখানে পাত্র শিশুদের লালেনটার ভাষা শেখানো হয়।
পাসকপ’র সভাপতি গৌরাঙ্গ পাত্র বলেন, আমাদের নিজেদের বর্ণমালা নেই। তাই বাংলা হরফে আমরা নিজেদের ভাষায় বই তৈরি করেছি। আমাদের ভাষা শেখানোর জন্য সিলেট সদর ও জৈন্তাপুর উপজেলায় তিনটি কমিউনিটি বিদ্যালয়ও করেছি। যেখানে পাত্র শিশুরা লালেনটার ভাষা শিখতে পারে। তবে সরকারি উদ্যোগ ছাড়া এই কাজ দীর্ঘদিন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব না।
সিলেট বিভাগে খাসিয়া সম্প্রদায়ের প্রায় ৩০ হাজার লোকের বাস। বিভাগে ৭৫ টি পুঞ্জি রয়েছে খাসিয়াদের। সিলেটের সীমান্ত লাগোয়া ভারতের খাসিয়া অধ্যুষিত রাজ্য মেঘালয়। সেখানে খাসিয়া ভাষার বইপুস্তক রয়েছে। তবে এখানে এখনো বাংলায়ই পড়তে হয় খাসিয় শিশুদের । ফলে নিজ ভাষা শিখতে পারছে না খাসিয়া শিশুরা।
এ ব্যাপারে খাসি সোশ্যাল কাউন্সিলের প্রচার সম্পাদক সাজু মারচিয়াং বলেন, আমাদের শিশুরা খাসি ভাষায় কথাই বলতে পারে না। কারণ এই ভাষা শিক্ষার তেমন সুযোগ নেই।
বিভিন্ন খাসিয়া পুঞ্জিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের দ্বারা পরিচালিত কমিউনিটি বিদ্যালয়ে খাসি ভাষা শেখানোর কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রয়োজনের তুলনায় এগুলো একেবারে যৎসামান্য।
সিলেটের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠির মধ্যে সামাজিক অবস্থানে সবচেয়ে এগিয়ে আছে মণিপুরীরা। সংখ্যার দিক দিয়েও তারা বেশি। মণপুরী ভাষা ও সংস্কৃতির রয়েছে সুপ্রাচীন ঐতিহ্য। নিজস্ব লিপিও রয়েছে তাদের। পণ্ডিত অতোম্বাপু শর্মা’র মতে, মণিপুরী ভাষার বয়স অনূন্য সাড়ে তিনহাজার বছর।
ভারতীয় সংবিধানেও মণিপুরী ভাষাকে অন্যতম ভাষা হিসেবে স্বীকৃত। তবে বাংলাদেশে সে স্বীকৃতি নেই। সরকারি উদ্যোগে মণিপুরী ভাষার বইও ছাপা হয়নি এখন পর্যন্ত। ফলে মাতৃভাষায় শিক্ষা থেকে বঞ্চিত মণিপুরী শিশুরা।
সিলেট সরকারী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে ৪র্থ শ্রেণীতে পড়ে মণিপুরী প্রভাতপ্রতিম সিংহ সঙ্গীত। নিজেদের ভাষা বলতে পারলেও পড়তেও লিখতে পারে না সে।
এ প্রসঙ্গে সঙ্গীতের বাবা সংগ্রাম সিংহ বলেন, শেখার কোন সুযোগ না থাকায় আমার ছেলে নিজের মাতৃভাষাও পড়তে পারে না। এটা যে কত কষ্টের না ভূক্তভোগী ছাড়া কেউ বুঝবে না।
তিনি বলেন, এনজিওদের উদ্যোগে মণিপুরী ভাষা শেখার কিছু প্রতিষ্ঠান মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে রয়েছে। তবে এগুলো দাতাদের ফান্ড নির্ভর। ফান্ড শেষ হলে স্কুলের কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়।
‘মণিপুরী ল্যাংগুয়েজ সেন্টার’ নামে কমলগঞ্জে মণিপুরী ভাষা শিক্ষার তিনটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে উন্নয়ন সহযোগি সংস্থা' এথনিক কমিউনিটি ডেভেলাপমেন্ট অর্গানাইজেশন (একডো)। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক লক্ষীকান্ত সিংহ বলেন, শিক্ষানীতিতে থাকলেও সরকারীভাবে বেশিরভাগ ক্ষৃদ্র নৃ গোষ্ঠির ভাষা শিক্ষার কোন ব্যবস্থা নেই। ২০১৫ সাল থেকে আমরা তিনটি স্কুল পরিচালনা করি। নিজেরাই বই ছাপাই আমরা।
তিনি বলেন, বইপুস্তক তৈরির জন্য দক্ষ মানুষ পাওয়া যায় না। মণিপুরী ছাড়া এখানকার অন্য নৃ গোষ্ঠির ভাষার বর্ণমালাও নেই। শিক্ষকরেও অভাব রয়েছে। ফলে এই কার্যক্রম চালানো খুবই দুরুহ।
সিলেটের চা বাগানগুলোতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠীর প্রায় ৩ লাখ লোক। এদের একসাথে চা জনগোষ্ঠি বলা হলেও তারা সকলে এক জাতির নয়। চা বাগান ২৪ থেকে ২৫ টি ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠির বাস বলে জানা গেছে। তবে তাদের কারোরই ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা নেই। তাদের ভাষার নিজস্ব বর্ণমালাও নেই।
শিক্ষা ও ব্যবহারের সুযোগ না থাকায় চা জনগোষ্ঠির অনেক ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে বলে জানান মিন্টু দেশোয়ারা। এই জনগোষ্ঠির তরুণ মিন্টু কাজ করেন একটি ইংরেজি দৈনিকে। নিজে দেশওয়ালি জনজাতির বলে জানান তিনি।
মিন্টু বলেন, ভাষা শিক্ষার তো ব্যবস্থা নেই-ই। এমনকি সংরক্ষণেরও উদ্যোগ নেই। ফলে অনেক ভাষায়ই এখন বিলুপ্তির পথে।
মিন্টু বলেন, উচ্চারণগত ভিন্নতার কারণে চা বাগানের বাসিন্দারা ভালো বাংলা বলতে পারে। আবার তাদের নিজস্ব ভাষারও স্বীকৃতি নেই। ফলে বাইরের লোকজনের সাথে কথা বলার সময় তারা একটা হীনমন্যতায় ভূগে। একরণে এই জনগোষ্ঠি বাগান থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না।
ভাষার বর্ণমালা না থাকলেও বই প্রকাশে কোন সমস্যা নেই জানিয়ে মণিপুরী ভাষার কবি একে শেরাম বলেন, দেশের মধ্যে মণিপুরী, ¤্রাে, রাখাইন, চাকমা, সাঁওতাল- এরকম ৫/৬টি নৃত্তাত্বিক গোষ্ঠির বর্ণমালা আছে। বাকীদের কেউ বাংলা বর্ণমালায় আবার কেউ ইংরেজি বর্ণমালায় নিজেদের ভাষায় লিখে। যেমন খাসিয়ারা লিখে ইংরেজি বর্ণমালায়। ফলে বাংলা বা ইংরেজি বর্ণমালা ব্যবহার করেও স্ব স্ব ভাষার বই প্রকাশ করা যায়।
সব শিশুকে মাতৃভাষায় শিক্ষা প্রদানে সরকারে ঢিলেমি রয়েছে উল্লেখ করে একে শেরাম বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু কাজ হচ্ছে না।
মাতৃভাষায় শিশুদের শিক্ষালাভের গুরুত্ব উল্লেখ করে শিক্ষাবিদ ডক্টর আবুল ফতেহ ফাত্তাহ বলেন, শিশুরা জন্মের পর মায়ের কাছ থেকে যে ভাষা শুনে সেই ভাষায়ই তার স্বপ্ন বুনে। কিন্তু এই ভাষাটা যদি সে না শিখতে পারে তবে তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ বাধাগ্রস্ত হয়। সে অন্ধকারে হাতড়াতে থাকে।
ফাত্তাহ বলেন, কেউ মাতৃভাষাটা ভালো করলে শিখলে তার জন্য অন্য ভাষা শেখাটা সহজ হয়ে যায়। তাই সকল শিশুর এই সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।