নিজস্ব প্রতিবেদক | ১০ মার্চ, ২০২২
সিলেটে প্রায় দেড় বছর ধরে চলছে জ্বালানী তেলের সঙ্কট। চলতি বোরো মৌসুমে এই সঙ্কট আরও তীব্র হয়েছে। চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে জ্বালানী ব্যবসায়ীদের।
দীর্ঘ সময়েও জ্বালানী সঙ্কটের সমাধান না হওয়ায় বুধবার থেকে আন্দোলনে নেমেছে এই খাতের মালিক ও শ্রমিকদের পাঁচটি সংগঠন। ছয় দফা দাবিতে বুধবার নগরে তেলবাহী ট্যাংক লরি নিয়ে মিছিল করেছে তারা।
জানা যায়, হাওর প্রধান সিলেট অঞ্চলের হাওরগুলোতে বোরো চাষ হয়। বোরো ধানে সেচের জন্য এই সময়ে সিলেটে ডিজেলের চাহিদা প্রায় দিগুণ বেড়ে যায়। কিন্তু জ্বালানী তেলের অব্যাহত সঙ্কটের কারণে এই বাড়–তি চাহিদা পুরণ করতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা।
সিলেট পেট্রোলিয়াম ডিলার্স ডিস্ট্রিবিউটর এজেন্ট এবং পেট্রোলপাম্প ওনার্স এসোসিয়েশনের নেতারা জানান, শুষ্ক মৌসুমে সিলেটে প্রতিদিন ১০ লাখ লিটার জ¦ালানী তেলের চাহিদা রয়েছে। তবে এখন তারা সপ্তাহেও ১০ লাখ লিটারের জোগান পাচ্ছেন না। ফলে চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
সংগঠনটির নেতারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে সিলেটে রাষ্ট্রায়ত্ত পরিশোধনাগার বন্ধ থাকা এবং চট্টগ্রাম থেকে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল না আসায় এ সংকট তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে সিলেটের কয়েকটি রিফুয়েলিং স্টেশন জ্বালানি সংকটের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে।
জ¦ালানীসঙ্কট দূর সহ ছয় দফা দাবিতে বুধবার থেকে আন্দোলনে নেমেছে ‘সিলেট বিভাগীয় পেট্রোলপাম্প, সিএনজি, এলপিজি, ট্যাংকলরি মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ’। তাদের ৬ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে- চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ, গ্যাসের লোড বৃদ্ধি, সিএনজি পাম্পের সংযোগ বিচ্ছিন্ন কার্যক্রম বন্ধ করা, বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত শোধনাগার পুণরায় চালু ইত্যাদি।
সিলেটের জ্বালানী তেল ব্যবসায়ীরা জানান, আগে সিলেটের গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রাপ্ত উপজাত দিয়ে স্থানীয় শোধনাগারগুলোর মাধ্যমে পেট্রোল ও অকটেন উৎপাদন করে চাহিদা মিটিয়ে দেশের অন্যান্য স্থানে পাঠানো হতো। কিন্তু ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে বিএসটিআইর মান অনুসরণ করতে না পারার অজুহাতে রাষ্ট্রমালিকানাধীন সিলেটের ছয়টি শোধনাগার বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এই ছয়টি শোধনাগারের মধ্যে গোলাপগঞ্জের রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড-আরপিজিসিএলের দুটি প্ল্যান্ট থেকে ৮০০ ও ৫০০ ব্যারেল, সিলেট গ্যাস ফিল্ড লিমিটেডের আওতাধীন হরিপুরে ৬০ ব্যারেল, কৈলাসটিলায় ৩০০ ব্যারেল এবং রশিদপুরের দুটি প্ল্যান্টে যথাক্রমে ৩ হাজার ৭৫০ ও ৪ হাজার ব্যারেল পেট্রোল, ডিজেল ও এলপিজি উৎপাদন হতো।
সিলেটের শোধনাগারগুলো বন্ধ করে দেওয়ার পর গ্যাসক্ষেত্র থেকে উপজাত হিসেবে পাওয়া কনডেনসেটগুলো চট্টগ্রামের বিভিন্ন বেসরকারি শোধনাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। সেখান থেকে রেলের ওয়াগনে করে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিন সিলেটে এনে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা এ তিনটি কোম্পানির মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। সিলেটের শোধনাগারগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরই দেখা দেয় জ্বালানি সংকট।
এ নিয়ে জ্বালানি ব্যবসায়ীরা লাগাতার কর্মসূচি ঘোষণা করলে গত বছরের ১০ মার্চ সিলেটে আসেন বিপিসির তৎকালীন চেয়ারম্যান আবু বকর ছিদ্দিক। তিনি সংস্কারের মাধ্যমে সিলেটের সব কটি শোধনাগার চালুর আশ্বাস দিলেও এ পর্যন্ত শুধু রশিদপুরের প্ল্যান্টটি চালু হয়। বাকিগুলো এখনো বন্ধ রয়েছে।
পেট্রোলিয়াম ডিলারস, ডিস্ট্রিবিউটরস, এজেন্টস্ অ্যান্ড পেট্রোলপাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিলেট বিভাগীয় সভাপতি জুবায়ের আহমদ চৌধুরী বলেন, একে তো সিলেটের প্লান্টগুলো বন্ধ। তারউপর রয়েছে রেলের ওয়াগন সঙ্কট। তাই চাহিদার অর্ধেকও সরবরাহ পাই না আমরা।
তিনি জানান, এখন সিলেটে প্রতিদিন ১০ লাখ লিটার জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু সপ্তাহে চট্টগ্রাম থেকে ৩টি তেলবাহি ওয়াগন আসে। ৩ ওয়াগনে তেল আসে মাত্র ৯ লাখ লিটার। চাহিদা পুরণে আমরা বাধ্য হয়ে নিজ খরচে চট্টগ্রাম ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে সড়কপথে তেল নিয়ে আসি। এতে খরচ অনেক বেশি পড়ে। আর চাহিদাও পুরণ করা যায় না। তাই অনেকেই এখন পাম্প বন্ধ করে দিচ্ছেন।
সিলেট বিভাগের চার জেলায় ১১৪টি পেট্রল পাম্প ও সিএনজি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। এর মধ্যে সিলেট মহানগরীতে ৪৫টিসহ জেলায় মোট ৭০টি পাম্প রয়েছে। জেলার অন্তত ৩টি গত দেড় বছরে বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানান জুবায়ের।
দাবি আদায়ে জ্বালানীখাতে সিলেটের সংশ্লিস্ট ব্যবসায়ী ও শ্রমিক সংগঠনগুলো মিলে গড়ে তুলেছে ‘সিলেট বিভাগীয় পেট্রোলপাম্প, সিএনজি, এলপিজি, ট্যাংকলরি মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ’।
বুধবার এই সংগঠনের উদ্যোগে ছয় দফা দাবিতে ২শত ট্যাংকলরি নিয়ে নগরে বিক্ষোভ মিছিল করে তারা। দুপুরে মিছিলটি নগরের দক্ষিণ সুরমার হুমায়ূন রশিদ চত্বর থেকে শুরু হয়ে বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
এই সংগঠনের আহ্বায়ক আহ্বায়ক সিরাজুল হোসেন আহমদ বলেন, দীর্ঘদিন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করেও কোনো সমাধান পাইনি। তাই বাধ্য হয়ে আন্দোলনে নেমেছি। এতেও সমস্যৗার সমাধান না হলে আরও কঠোর আন্দোলন ডাকা হবে।