Sylhet Today 24 PRINT

বাড়ছে পানি: এসএসসি পরীক্ষা নিয়ে উদ্বেগ শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের

নিজস্ব প্রতিবেদক, ও শান্তিগঞ্জ প্রতিনিধি |  ১৬ জুন, ২০২২

সিলেট ও সুনামগঞ্জে বেড়েই চলছে বন্যার পানি। বৃহস্পতিবারও পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। তলিয়ে গেছে দুই জেলার পাঁচশতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এ অবস্থায় মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।

আগামী ১৯ জুন (রবিবার) থেকে সারা দেশে শুরু হবে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা।

বন্যার পানিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তলিয়ে যাওয়ার বিষয়টি মন্ত্রঅনলয়ে জানানো হয়েছে জানিয়ে সিলেট শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক অরুণ চন্দ্র পাল বলেন, বন্যায় সিলেট ও সুনামগঞ্জের ৯টি উপজেলার অনেকগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তলিয়ে গেছে। বন্যার এই চিত্র্র শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জানানো হয়েছে। এসএসসি পরীক্ষার ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ই সিদ্ধান্ত নেবে।

সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া ইউনিয়নের সুরমা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, আমাদের উপজেলায় এসএসসি পরীক্ষা কেন্দ্র ৩টি ও সাব-সেন্টার ১টি। দাখিল মাদ্রাসা সেন্টার ১টি। পরীক্ষা কেন্দ্রে এখনও পানি না উঠলেও বন্যার কারণে শিক্ষার্থীরা আসা যাওয়ায় খুবই সমস্যা হবে। প্রায় ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থীদের বাড়িঘরে কিংবা ঘর হতে বের হওয়ার রাস্তায় পানি।

নোয়াখালী সপ্তগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিশেন্দু কুমার দেব বলেন, কেন্দ্রে পরীক্ষা নিতে কোনো অসুবিধা হবে না। স্কুলে এখনো পানি উঠেনি।  কেন্দ্রসহ আমরা পুরোদমে প্রস্তুত আছি। বন্যা পরিস্থিতির যদি আরো অবনতি হয় তাহলে বলা যায় না। তবে, অফিস থেকে এখনো বন্যাজনিত কোনো নির্দেশনা  আমাদের দেওয়া হয়নি। আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি।

এরচেয়ে করুণ দৃশ্য বীরগাঁও ইমদাদুল হক উচ্চ বিদ্যালয়, ইশাখপুর-শ্রীরামপুর উচ্চ বিদ্যালয়, হলদারকান্দি অথবা সলফ কিংবা জেবিবি উচ্চ বিদ্যালয়ের। পাগলা সরকারি মডেল স্কুল ও ডুংরিয়া হাইস্কুল এন্ড কলেজ উঁচু স্থানে বাজারের কাছে প্রপার এলাকায় হলেও প্রতিষ্ঠানটির সকল শিক্ষার্থী আসেন বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল থেকে। দরগাপাশা হাইস্কুল, আলমপুর, পূর্ব পাগলা ও পঞ্চগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়েরও একই দশা। তারা পরীক্ষা দেওয়ার জন্য পাগলা সরকারি মডেল হাইস্কুল এন্ড কলেজ সেন্টারে আসবেন। ডুবন্ত রাস্তা, হাওর আর বন্যাক্রান্ত এলাকা পাড়ি দিয়ে তারপর গাড়ি করে আসতে হবে। পরীক্ষা কেন্দ্রে আসার আগেই ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত রীতিমতো একেকজন পরীক্ষার্থীকে মুখোমুখি হতে হবে একেকটা যুদ্ধের। এতে পরীক্ষা দেওয়ার  মানসিক ভারসাম্যতা হারাবে শিক্ষার্থীরা। এ অবস্থা নিয়ে চরম চিন্তায় পড়েছেন পরীক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকেরা।

দাখিলের একমাত্র কেন্দ্র আক্তাপাড়া আলিম মাদ্রাসা কেন্দ্রে পানি ছুঁইছুঁই। নতুন ভবন বাদে বাকী সবগুলোই ভবন শঙ্কায় আছে। পানি বাড়লে কক্ষগুলো ডুবে যাবে। পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হবে না। এ নিয়ে চিন্তি শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

উপজেলার সকল কেন্দ্র সচিবদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এ বছর শান্তিগঞ্জ উপজেলায় মাধ্যমিক পর্যায়ে মোট ১ হাজার ৬শ ১৯ জন শিক্ষার্থী অংশ নিবেন। এদের মধ্যে পাগলা সরকারি মডেল হাইস্কুল এন্ড কলেজ কেন্দ্রে ৮শ ১০জন, সরকারি জয়কলস উজানীগাঁও রশিদীয়া উচ্চ বিদ্যালয় ৪শ ১৮জন, গনিনগর (ষোলগ্রাম) উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে মোট ৩শ ৯১ জন (গনিনগর কেন্দ্রে ২১৩ ও সাব-সেন্টার নোয়াখালী উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৭৮ জন) পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিবেন। এদিকে, উপজেলার ৬টি দাখিল মাদ্রাসার একমাত্র কেন্দ্র আক্তাপাড়া আলিম মাদ্রাসা কেন্দ্রে মোট ১শ ৬৯ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করবেন।

মাদ্রাসার কেন্দ্র সচিব ও আক্তাপাড়া আলিম মাদ্রাসার সুপার মো. ময়নুল হক বলেন, সকালে উপজেলায় একটি মিটিং-এ যখন যাই তখন দেখলাম মাঠে সামান্য পানি। মিটিং শেষে এসে দেখি মাঠ পানিতে টইটুম্বুর। নতুন ভবনে পানি উঠতে একটু সময় লাগলেও আর ৬ইঞ্চি পানি বাড়লে বাকী রুমগুলোর বারান্দায় পানি উঠে যাবে। কীভাবে পরীক্ষা নেব তা নিয়ে কিছুটা শঙ্কিত।

কেন্দ্র সচিব ও গনিনগর ষোলগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাও. তদবীর আলম বলেন, আমার কেন্দ্রে এখনো পানি উঠেনি৷ তবে সব জায়গা-ই ইতোমধ্যে প্লাবিত হয়ে গেছে। রাস্তাঘাট ডুবে গেছে। শিমুলবাক, রঘুনাথপুর, গোমিনপুর, ধলকুতুব, শ্রীনাথপুর, জাহানপুর ইত্যাদি গ্রাম থেকে শিক্ষার্থীরা কীভাবে আসবে তা নিয়ে চিন্তা করছি।

নোয়াখালী সপ্তগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেবে ফাইমা আক্তার রুমা। তার বাড়ি জামলাবাজ গ্রামে। ফাইমা জানান, আমাদের এলাকার ব্রিজ থেকে বাজার ও স্কুলের এলাকা এখনো ভাসমান। কিন্তু আমাদের বাড়ি থেকে বের হওয়ার কোনো উপায় নেই। রাস্তাঘাট সব পানিতে তলিয়ে গেছে। নৌকায় করে স্কুলে যেতে হবে। এ ছাড়া কোনো উপায় নেই। যে ভাবে বাসাত থাকে নৌকায় উঠলে খুবই ভয় লাগে।

আস্তমা গ্রাম থেকে এবছর পরীক্ষা দেবেন ইভা আক্তার। তিনি পাগলা সরকারির বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। আস্তমা গ্রামের প্রধান সড়ক দু’চারদিন আগেই তলিয়ে গেছে। তেচারকোনা নাম একটি ছোট হাওর পাড়ি দিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে আসতে হবে তাকে। প্রবল বাতাসে যে ঢেউ তোলে তাতে পরীক্ষার আগেই জীবনের নিরাপত্তা প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়ায় সবার আগেই।

অভিভাবক আইনুল হক। তার ছেলে জোবায়ের এবছর জেবিবি থেকে সরকারি জয়কলস উজানীগাঁও স্কুলে এসে পরীক্ষা দেবেন। তিনিও বন্যার পানি নিয়ে শঙ্কিত। আইনুল হক বলেন, আবহাও খুব খারাপ৷ বন্যায় ঘরবাড়ি সব তলিয়ে গেছে। আবাসিক হোটেল আমাদের এলাকায় নেই। আমার ছেলেকে আত্মীয় কারো বাড়িতে পাঠানো ছাড়া উপায় দেখছি না।

শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আনোয়ার উজ্ জামান বলেন, আমি প্রতিটি কেন্দ্র সচিবের সাথে কথা বলেছি। তারা জানিয়েছেন- কেন্দ্রগুলো এখনো নিরাপদ। যেহেতু কেন্দ্রিয়ভাবে আমরা কোনো নির্দেশনা এখনো পাইনি তাই এ ব্যপারে আমাদের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতিই থাকবে। আমরা ডিসি স্যারকে লিখিতভাবে পানি বৃদ্ধির কথা জানিয়েছি। দেখি কী সিদ্ধান্ত আসে। তবে পরীক্ষা স্থগিত হবে এমন সম্ভাবনা কম। যদি আরো পানি বাড়ে তখন হয়তো এমন সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

সুনামগঞ্জ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, পরীক্ষা স্থগিত করার মতো কোনো নির্দেশনা এখনো আমরা পাইনি। ডিসি স্যারের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ে জানিয়েছি। দেখি কি সিদ্ধান্ত আসে। কোনো সিদ্ধান্ত না আসলে পরীক্ষা চলবে।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.