Sylhet Today 24 PRINT

৮০বর্ষ পূর্তিতে জলঢুপ দ্বি-পাক্ষিক উচ্চ বিদ্যালয়ে নতুন পুরাতনের মিলন মেলা

শাবুল আহমেদ, বিয়ানীবাজার |  ১৭ ডিসেম্বর, ২০১৫

‘আজ দুঃখ ভুলার দিন, আজ মন হবে যে রঙিন। আজ প্রাণ খুলে শুধু গান হবে, সুখ হবে সীমাহীন।’

এমনি সুরের মূর্ছনায় বৃহস্পতিবার (১৭ ডিসেম্বর) প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেটের বিয়ানীবাজারে বিহানের সূর্যটা যেন ভিন্নরূপে আবির্ভূত  হয়েছিল। এমন একটি দিনকে স্মরণীয় করতে সকাল থেকেই হাজারো মানুষ ব্যস্ত হয়ে ছুটতে থাকেন; সবার গন্তব্য সুনাই তটিনীর তীরঘেষা চিরচেনা বিদ্যাপীঠ জলঢুপ দ্বি-পাক্ষিক উচ্চ বিদ্যালয়ের সবুজ প্রাঙ্গণ।

দেশ এবং দেশের বাহিরে থেকে আগত মানুষের পদভারে মুখরিত হয়ে ওঠে বিদ্যালয়ের চারিদিক। অভূতপূর্ব এই মিলন মেলায় শীতের সুনাইও যেন মেতে উঠে উচ্ছ্বাসে। সকাল ১০ টায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে জাতীর পতাকার সঙ্গে বিদ্যালয়ের পতাকা উত্তোলন করে বিয়ানীবাজার উপজেলার ঐতিহ্য ভূমি জলঢুপের প্রাচীন বিদ্যাপীঠ জলঢুপ দ্বি-পাক্ষিক উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ৮০ বর্ষপূর্তি উৎসবের উদ্বোধন ঘোষণা করেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ।


এর পূর্বে সকাল ৯ টায় এক আনন্দ শোভাযাত্রা বের করা হয়। এতে অংশ গ্রহণ করেন স্কুলের বর্তমান এবং প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীসহ এলাকার বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের ব্যক্তিবর্গ। শোভাযাত্রায় চিরায়ত বাংলার বিভিন্ন ঐতিহ্যের পাশাপাশি জাতীয় পতাকার সঙ্গে বিদ্যালয়ের পতাকা প্রদর্শিত হয়। কমলা-আনারস খ্যাত জলঢুপের সোনালী ঐতিহ্যের প্রতীক বহন করে সকলে কমলা রঙের টি-শার্ট পরে হাতে বিভিন্ন রকমের প্ল্যাকার্ড, বেলুন নিয়ে অংশ গ্রহণ করেন। র‌্যালীটি বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয়ে এলাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে আবার স্কুল প্রাঙ্গণে এসে শেষ হয়। এরপর সকাল সাড়ে ১০ টায় অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা।

৮০ বর্ষপূর্তি উৎসব পর্ষদের আহবায়ক দ্বারকেশ চন্দ্র নাথের সভাপতিত্বে ও বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র সরকারি অগ্রগামী বালিকা বিদ্যালয়ের সহকারি প্রধান শিক্ষক কবির খান ও উৎসবের যুগ্ম সচিব কামিল আহমদ এর সঞ্চালনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ।

বিশেষ অতিথি ছিলেন জাতীয় সংসদের হুইপ মোঃ শাহাব উদ্দিন, সিলেট মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) গোলাম কিবরিয়া তাপাদার, সিলেট মদন মহন কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক আবুল ফতেহ ফাত্তাহ, সিলেট শাহজালাল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ফারুক আহমদ, সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী এড. তবারক হোসেন, এড. আব্দুস শহীদ, এড. অরুন কুমার দাস, অবঃ জেলা কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম প্রমুখ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী নাহিদ বলেন, মানব জীবনের উন্নয়নে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। আর এই শিক্ষা প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে শুরু হয় স্কুল থেকে। তাই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় স্কুলের প্রতি শিক্ষার্থীদের আবেগ এবং ভালোবাসা একটু বেশী থাকে। শিক্ষার অগ্রযাত্রায় সবাই একত্রিত হওয়ার আহবান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, বিশ্বমানের শিক্ষা ব্যবস্থায় ঠিকে থাকতে হলে তথ্য-প্রযুক্তি সমন্বয়ে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে নতুন প্রজন্মকে সুশিক্ষিত যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

বিশেষ অতিথি হুইপ শাহাব উদ্দিন এমপি বলেন, বড়লেখা ও বিয়ানীবাজার উপজেলা একসময় প্রশাসনিক থানা ‘জলঢুপ’ এর আওতাধীন থাকার ফলে এই উচ্চ বিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষও একই সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ ছিল, বংশ পরম্পরায় যা অদ্যাবধি অটুট রয়েছে। আশা করি অতীতের মতো এতো লের শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক উন্নয়নের প্রসারে বিদ্যালয়টি অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে যুগ-যুগান্তর।

‘৮০ বছর পূর্বে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী জ্ঞান-বিজ্ঞানে এগিয়ে যাওয়ার যে স্বপ্ন দেখেছিলেন আজকে নতুন প্রজন্মের হাত ধরে তাদের সেই স্বপ্ন এখন সবার ভেতর দিয়ে হাঁটাচলা করছে।’ উল্লেখ করে অধ্যাপক আবুল ফতেহ ফাত্তাহ বলেন, আলোকিত সমাজ গঠনে চাই আলোকিত মানুষ। এজন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষায় জাতিকে এগিয়ে যেতে হবে।

দুপুরে স্মৃতিচারণ পর্বের মে এসে অনেকে আবেগ-আপ্লুত হয়ে পড়েন। প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রী ছাড়াও এ পর্বে অনুভূতি প্রকাশ করেন প্রাক্তন-শিক্ষক, শিক্ষিকাবৃন্দ।

স্কুলের পুরনো বন্ধুদের দীর্ঘদিন পর কাছে পেয়ে আনন্দের মাত্রা যেন আরো বেড়ে যায়। বিদ্যালয়ে ৫৪ সালের এসএসসি ব্যাচের ছাত্র প্রবীণ মুরব্বী হাজী ফৈয়াজ খান ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলেন, তখন আমাদের শ্রেণীতে ছাত্র সংখ্যা ছিল মাত্র ১৮ জন তাদের মধ্যে আমরা দু’জন মাত্র বেঁচে আছি। আজকের এই উৎসবে তাদের উপস্থিতি থাকলে সত্যিই আরো বেশী প্রাণবন্ত হতো। এই বিদ্যাপীঠের আলো-বাতাশ আমার কাছে খুব চিরচেনা বন্ধু মনে হয়। এখানে আসতে পেরে সত্যিই অসম্ভব ভালো লাগছে।

ঢাকা থেকে আগত ’৮৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী ছাত্র সাংবাদিক ও গবেষক আজিজুল পারভেজ অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, এ উৎসব আমাদের আগামী দিনের এগিয়ে চলার প্রেরণা হয়ে থাকবে। মেধা বিকাশের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক বিকাশে এ বিদ্যালয়কে আরো বেশী কাজ করতে হবে।

আবেগ আপ্লুত কণ্ঠে বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক আজির উদ্দিন বলেন, আজকে সত্যিই আমি গর্বিত। বিদ্যালয়ের সঙ্গে আমার একটি নাড়ির সম্পর্ক রয়েছে যা কোনদিন ছেদ হবার নয়।

উৎসব কমিটি যুক্তরাজ্য শাখার সদস্য সচিব কবি ও সাংবাদিক আনোয়ারুল ইসলাম অভি জানান, ‘স্কুলটা আমার কাছে মায়ের মতো। ঘুম থেকে উঠে প্রথম যে দুটি অসম্ভব ভালো দৃশ্য আমাদের পরিবার দেখে, তা হলো- সামনে বড় পুকুর এবং আমাদের আরেক মা- প্রাণের এই বিদ্যালয়। দূর থেকে যুক্তরাজ্য শাখা কমিটির সদস্য সচিব হিসাবে কতটুকু করতে পেরেছি জানিনা। তবে মনের শুদ্ধতাকে পুঁজি করে বলছি- আমি আমার শ্রম ও মননে শতভাগ দিতে চেষ্টা করেছি। পরীক্ষা থাকার কারণে দেশে আসতে পারিনি তবে আজকের অভূতপূর্ব আনন্দঘন দিনটিকে খুব মিস করছি।’

অনুষ্ঠানে আগত ২০১১ ব্যাচের এসএসসি পরীক্ষার্থী ওয়াহিদা পারভিন জানান, ‘যখন এই অনুষ্ঠানের কথা শুনি তখন সাথে সাথে-ই রেজিস্ট্রেশন করেছিলাম, কারণ জানতাম স্কুলের পুরনো বন্ধুদের কাছে পাওয়ার এটাই একমাত্র সুযোগ তাছাড়া আমাদের এই বিদ্যালয় অসংখ্য গুণীজনকে সৃষ্টি করেছে যাদের পরিচয় জানার এবং তাদের অনেকের সঙ্গে দেখার সৌভাগ্য হলো এই উৎসবের মাধ্যমে।’ একই ব্যাচের ফারহানা, প্রভা, নাছিমা ও উম্মে কুলছুমার অভিব্যক্তি একই রকম।

২০০৪-’র ব্যাচের ছাত্র ডা. খায়রুল বাসার রুমান জানান, ‘ফেসবুক, টুইটারের মাধ্যমে মাঝে মধ্যে স্কুলের অনেক বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ হয় কিন্তু সবাইকে স্কুলের আঙিনায় কাছে পেয়ে মনে হচ্ছে আবারও স্কুলের সেই দিনগুলোতে ফিরে এসেছি।’

অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের প্রতিবেদন পাঠ করেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জালাল উদ্দিন এবং স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র দৈনিক সমকালের নির্বাহী সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি সম্পাদিত উৎসব স্মারক ‘সুনাইধ্বনী’র মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এছাড়া স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র মিছবাহ উদ্দিন ও জাবেদ আহমদ এর পরিকল্পনায় প্রজেক্টরের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের আর্কাইভ থেকে বিশেষ মুহূর্তের কিছু ছবি প্রদর্শন করা হয়। এছাড়া সমছুল-করিমা ফাউন্ডেশন প্রকাশ করেছে বিদ্যালয় সম্পর্কে গুণীজনদের মন্তব্য ও বিভিন্ন সময়ের আলোকোজ্জ্বল কর্মকাণ্ড সমূহের ছবি সম্বলিত বিশেষ ক্রোড়পত্র- ‘মোদের জলঢুপ স্কুল’।

বিকেল সাড়ে ৫ টায় শুরু হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে অংশ গ্রহণ করেন ক্লোজআপখ্যাত তারকা বন্যাসহ স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীরা। নাচে-গানে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠেন সবাই।
প্রসঙ্গত, সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার উপজেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার লীলাভূমি ঐতিহ্যবাহী জলঢুপে ১৯৩৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী এই প্রাচীন বিদ্যাপীঠ।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.