নিজস্ব প্রতিবেদক: | ২৭ আগস্ট, ২০২২
‘‘বাচ্চাকাচ্চারে নিয়া খুব কষ্টে চলতে আছি। আন্দোলন চলছে। তো মালিকরা মজুরিও বন্ধ রাখিছে। দোকান যেগুলো আছে, এগুলো থেকে ঋণ করে চলেছি কিছু দিন। এখন দোকানও ঋণ দিতে চায় না (বাকিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র)।
‘‘দোকানি বলে তোমরা কবে কাজ করবা বেতন পাইবা, তার তো নির্দিষ্ট সময় নাই। টাকা দিবা কিভাবে। তারারতো মাজনের কাজ থেকে জিনিস আনতে লাগে। এখন খেয়ে না খেয়েই দিন কাটছে আমাদের।’’
কথাগুলো বলছিলেন মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নের শাহবাজপুর চা বাগানের নিয়মিত নারী চা-শ্রমিক মাধুরী নায়েক। শুক্রবার বিকেলে কথা হয় তার সাথে।
মাধুরী বলেন, ‘‘যাদের ছেলে আছে তারা বাইরে গিয়ে কাজ করে সংসার চালাইতে আছে। তাও কোনো মতে। আর যাদের পরিবারে পুরুষ মানুষ নাই, তারার তো কষ্টের শেষ নাই। মেয়েগুলোতো আর বাইরে (গ্রামে) যাইতে পারে না কাজে। যার বাড়িতে ছেলে নাই সে খুব দুঃখ-কষ্টে আছে।’’
একই রকম কথা জানালেন শাহবাজপুর ইউনিয়নের শাহবাজপুর চা বাগানের পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি মেঘনাথ নায়েক ও উদয়ন যুবক সংঘের সভাপতি শ্যাম রায় কর্মকার।
শাহবাজপুর চা-বাগান পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি মেঘনাথ নায়েক বলেন, ‘‘আমরা অনেক কষ্টে আছি। কাজ বন্ধ থাকায় আমাদের রেশন-মজুরিও বন্ধ করে দিয়েছে। শেখ মুজিব সাহেবের শোক দিবসের ছুটির টাকা দিয়েছে। ওই সোমবার দিনের। ওইটা পাইয়েছি একদিনের। আজকে ১৪ টা দিন। কত কষ্ট করছি আমরা। আমাদের বাগানে নিয়মিত শ্রমিক ৪৫০। তাদের ছেলে-মেয়েসহ তো আরও অনেক।
‘‘কেই ঋণ করে চলছে। কেউ বাকিতে দোকান থেকে কিছু জিনিস কিনে টানাটানির মাঝে চলছে। যারা বাকিতে নিতে পারছে না তারা বাগানের বাইরে গিয়ে কাজ করছে। বাইরের দিনমজুরির টাকায় কোনমতে চলছে। কারো জমানো টাকা থাকলে ওটা ভেঙে খাচ্ছে। তবে ওটা অল্প কয়েকজনের হবে।’’
শাহবাজপুর ইউনিয়নের শাহবাজপুর চা বাগানের উদয়ন যুবক সংঘের সভাপতি শ্যাম রায় কর্মকার শুক্রবার বিকেলে বলেন, ‘‘আজ আন্দোলনের ১৪ দিন। গতকালকে তো বৃহস্পতিবার ছিল-না। এদিন বাগান আমাদের মাত্র ১২০ টাকা দিয়েছে। আন্দোলনের মাঝে বঙ্গবন্ধুর শোক দিবসের ছুটি ছিল। ওই ছুটির টাকাই খালি দিয়েছে। আর কোনো টাকা কিংবা রেশন কিছুই দেয়নি মালিক পক্ষ।
‘‘খুব কষ্ট করে চলছে লোকজন। কেউ কেউ বাহিরে (বাগানের বাইরে) দিন মজুরির কাজ করে সংসার চালাচ্ছে। কোনোমতে খাইয়া পইরা দিন যার। অনেকে আছে এক বেলা খাইলে আরেক বেলা উপাস থাকে। দুই বেলা খেতে পারছে না অনেকে। গরিব শ্রমিক অল্প মজুরিতেই কষ্ট করে চলতে হয়। তার মধ্যে দুই সাপ্তার রেশন-মজুরি সব বন্ধ।’’
৩০০ টাকা মজুরির দাবিতে চা–শ্রমিকদের ধর্মঘট ১৪তম দিন শেষ হয়েছে শুক্রবার। ফলে তারা সাপ্তাহিক মজুরি ও রেশন থেকে পাচ্ছেন না। এতে খুব কষ্টে আছেন চা-শ্রমিকেরা। চা জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগ পরিবারের খেয়ে না খেয়ে তাদের দিন চলছে। এরই মধ্যে ক্ষুদ্র ঋণ প্রদানকারী এনজিও সংস্থা ঋণগ্রহীতাদের কিস্তি দেওয়ার জন্য চাপ শ্রমিকদের জন্য মরার উপর খাঁড়ার ঘা হয়েছে।
মৌলভীবাজার জেলার ৯২টি চা বাগানের সবগুলোতেই প্রায় একই অবস্থা। মজুরি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও চা বাগান মালিকদের মধ্যে শনিবারের বৈঠকে কী আলোচনা হয় সেদিকে এখন নজর রাখছেন আন্দোলনরত শ্রমিকরা।
এই বৈঠক নিয়ে চা বাগানের শ্রমিকদের মধ্যে শুক্রবার দিনভর আলোচনা হয়। বৈঠক থেকে কী ফলাফল বা ঘোষণা আসে সেদিকে অনেকেরই নজর রয়েছে।
শ্রীমঙ্গলের আমরইল চা বাগানের শ্রমিক জনিস বলেন, “প্রধানমন্ত্রী আমাদের শেষ ভরসার স্থল। প্রধানমন্ত্রীর দিকেই এখন আমরা তাকিয়ে আছি।”
জনিসের আশা, প্রধানমন্ত্রী তাদের নিরাশ করবেন না।
এ দিকে চা শ্রমিকদের করুণ অবস্থার মাঝে সংশ্লিষ্ট ক্ষুদ্র ঋণ প্রদানকারী কর্তৃপক্ষকে চাপ না দেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক।
চা শ্রমিক ফেডারেশনের পাঠানো প্রেসবিজ্ঞপ্তি সূত্রে জানা যায়, চা শ্রমিক ইউনিয়ন নেতাদের নেতৃত্বে কর্মবিরতিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছেন চা শ্রমিকরা। ফলে বাগানে কাজ না করায় মজুরি এবং রেশন পাচ্ছেন না তারা। এ দিকে বাগানে অচলাবস্থা চলায় ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতা শ্রমিকরা পরিবার-পরিজন নিয়ে দু’বেলা খাবার জোগাতে হিমশিম খাচ্ছেন সেখানে সাপ্তাহিক কিস্তির দেওয়ার কথা ভাবতেই পারছেন না।
মৌলভীবাজারের ৯২টি চা বাগানকেন্দ্রিক আশা, টিএমএসএস, গ্রাম উন্নয়ন, সঞ্চয়নসহ বিভিন্ন এনজিও সংস্থা শ্রমিকদের মাঝে ক্ষুদ্র ঋণ প্রদান করে থাকে। এসব প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ চা শ্রমিকদের সাম্প্রতিক কঠিন দুঃসময়ে মধ্যে সাপ্তাহিক কিস্তির টাকা উত্তোলনে চাপ দিচ্ছে। ঋণগ্রহীতারা বলছেন চা বাগানের পরিবেশ স্বাভাবিক হলে তখন বকেয়া সমন্বয় করে দেওয়া হবে তা মানছেন না মুনাফাভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর ফিল্ড অফিসাররা।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ফেডারেশন কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি বিপ্লব মাদ্রাজি পাশী এবং সম্পাদক দীপংকর ঘোষ এক যুক্ত বিবৃতিতে বলেন, চা জনগোষ্ঠী তাদের যৌক্তিক দাবিতে একযোগে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় তারা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে এক ধরনের কর্মহীন। তাই মানবিক বিবেচনায় আপাতত সাপ্তাহিক কিস্তির উত্তোলনে চাপ না দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানান ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে।
টিএমএসএস মুন্সিবাজার শাখা ম্যানেজার মোবাশ্বির হানিফিল্লাহ রানা জানান, চা বাগানের অচলাবস্থার মাঝে কিস্তি পরিশোধের জন্য কাউকে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে না। ফিল্ড অফিসার রুটিনওয়ার্ক অনুযায়ী ঋণগ্রহীতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে থাকে। যারা কিস্তি দিতে পারে তাদের টাকা গ্রহণ করা হয়। যারা অক্ষম তাদেরকে চাপ দেওয়া হচ্ছে না।
শ্রীমঙ্গল উপজেলার কালাপুর ইউনিয়নের ফুলছড়ি চা বাগানের বাগান পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি লক্ষ্মণ বাউরি বলেন, “আমরা আন্দোলন করছি পেটের দায়ে। আমাদের যে মজুরি দেওয়া হয় তা থেকে বিদ্যুৎ বিল, রেশন, ভবিষ্যৎ তহবিল ও চা শ্রমিক ইউনিয়নের চাঁদা সব কিছু কেটে নগদ হাজরি দাঁড়ায় ১০০ টাকারও কম।
“এই টাকা দিয়ে দৈনন্দিন চাহিদা পূরণ করতে হয়। ছেলেমেয়ের লেখাপড়া, পোশাক, মাছ, সবজি, তেল, লবণ, ডাল সবই এ দিয়ে। এটা কী করে সম্ভব?”
লক্ষ্মণ বাউরি আরও বলেন, দুই টাকা কেজিতে আটা দেওয়া হয়, যা সকালে রুটিতেই চলে যায়। দুপুরে ও বিকেলে ভাত রান্না করলে ৪/৫ জনের একটি পরিবারে দুই কেজি চাল লাগে। চালের দামেই দৈনিক হাজরি চলে যায়।