সিলেটটুডে ডেস্ক | ২৩ ডিসেম্বর, ২০১৫
দক্ষিণ সুরমায় মুন্নী দেবনাথ শিল্পী হত্যাকান্ডের ঘটনায় মোগলাবাজার থানা পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা না নেয়ার অভিযোগ করেছেন নিহতের বড় বোন । তিনি তার ছোট বোন শিল্পীর স্বামী, শশুর, শাশুড়ি, ননদ ও তার ভাবীকে হত্যাকান্ডের জন্য দায়ী করে তাদেরকে গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন।
আজ বুধবার সিলেট প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি করেন দক্ষিণ সুরমা উপজেলার তেতলী ইউনিয়নের ধরাধরপুর গ্রামের জয়ন্তী বালা দেবী।
লিখিত বক্তব্যে জয়ন্তী বালা দেবী বলেন, আমার ছোট বোন মুন্নী দেবনাথ শিল্পী লেখাপড়া শেষ করে যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিউটিশিয়ান পেশায় নিয়োজিত হয়। শুরুতে তার দুই সহপাঠী নিয়ে সে দক্ষিণ সুরমা ডিগ্রি কলেজের সন্নিকটে গোল্ডেন মাকের্টে ‘জি হারবাল বিউটি পার্লার’ নামে মহিলা ও শিশুদের একটি রূপচর্চা প্রতিষ্ঠান চালু করে। এই সুবাদে একপর্যায়ে দক্ষিণ সুরমা উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের গোজারকান্দি গ্রাম নিবাসী ক্ষিরোদ চন্দ্র নাথ ও শেফালী রাণী দেবনাথের ছেলে লিটন চন্দ্র দেবনাথের সাথে মুন্নীর পরিচয় হয়। উভয়ের ইচ্ছানুযায়ী এই পরিচয়কে পরিণয়ে রূপান্তর করতে দুই পরিবার সম্মত হয়ে সামাজিকভাবে তাদের বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়।
এই সিদ্ধান্তের আলোকে ২০১৩ সালের ২৬ জানুয়ারি সনাতন ধর্মীয় শাস্ত্রমতে তারা বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়। বিয়ের সময় আমার প্রিয় ছোট বোনের নতুন সংসার সাজানোর জন্য যা যা প্রয়োজন তার প্রায় সবকিছুই আমরা উপহার হিসেবে দিয়েছি। একই সাথে আমি ব্যক্তিগতভাবে উপহার হিসেবে তিন ভরি ওজনের স্বর্ণালংকার প্রদান করি। বিয়ের পর কিছুদিন তাদের দাম্পত্য জীবন খুব সুখ ও শান্তিতে চলছিল।
কিন্তু বিয়ের পূর্বে না জানলেও পরবর্তীতে ক্রমান্বয়ে আমরা জানতে পারি, আমার ভগ্নিপতি লিটন একজন মাদকসেবী। মদ-গাঁজা সেবন ছিল তার নিত্যদিনের অভ্যাস। এ জন্য পার্লার ব্যবসায়ী স্ত্রীর নিকট থেকে প্রায়ই চেয়ে হোক, ধমক দিয়ে বা জোরপূর্বক টাকা-পয়সা নিতে শুরু করে। ক্রমান্বয়ে এ চাওয়া-পাওয়া নিয়মিত পর্যায়ে এসে উপনীত হয়।
একপর্যায়ে লিটনের দেখাদেখি তার বাবা, মা ও বোনরাও মুন্নীর নিকট থেকে টাকা-পয়সা চেয়ে নিতে থাকে। চাপের মুখে মুন্নীও পরিবারে যাতে সুখ-শান্তি বিরাজ করে সে লক্ষ্যে তার সাধ্যানুযায়ী স্বামী, শ্বশুড়, শাশুড়ি ও ননদকে চাহিদা অনুযায়ী অর্থ প্রদান করতে থাকে। এভাবেই কোনরকমে সুখ-শান্তির মধ্য দিয়ে মুন্নীর দাম্পত্য ও সাংসারিক জীবন চলছিল।
কিন্তু বিঘন্ন সৃষ্টি হয় আমার সহোদর মেঝো ভাই অভিনয় দেবনাথ মিন্টুর স্ত্রী ৪ সন্তানের জননী রত্না রাণী দেবনাথের কারণে। রত্নাকে অতিশয় চতুর এবং অসৎ ও নষ্টা চরিত্রের মহিলা উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ভাবী রত্না কু-মন্ত্রণায় ভাই মিন্টু বৃদ্ধ বাবা-মা’কে রেখে আকস্মিক পৃথক হয়ে যান। ভাবী ননদ মুন্নীর স্বামী লিটনের মোবাইল নাম্বার সংগ্রহ করার পর মোবাইলে লিটনকে নানারকমের কু-মন্ত্রণা দিতে শুরু করে। ঘন্টার পর ঘন্টা উভয়ে মোবাইলে কথা বলতো। আমার কথার সত্যতা উভয়ের মোবাইলের কল লিস্ট চেক করলেই প্রমাণিত হবে।
রত্নার প্ররোচনায় এবং তার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে লিটন ক্রমশঃ বেপরোয়া হয়ে উঠে। বিয়ের কিছুদিন পর লিটন আমার দেয়া ৩ ভরি ওজনের স্বর্ণালংকার মুন্নীর নিকট থেকে জোরপূর্বক কেড়ে নিয়ে বিক্রি করে দেয়। স্বর্ণ বিক্রির টাকা শেষ হয়ে গেলে লিটন স্ত্রী মুন্নীকে প্রতিদিন টাকা দেয়ার জন্য জোর-জবরদস্তি করতো। টাকা না দিলে মুন্নীকে নানাভাবে নাজেহাল বা টানা-হেঁচড়া করতো। মাতাল অবস্থায় বাড়ি এসে আমার বোনের সাথে অশালীন আচরণ এমনকি মারপিটও করতো। অশ্রাব্য গালিগালাজ করে পিত্রালয় থেকে টাকা নিয়ে যাওয়ার জন্য বলত।
গত ২৫ জুন বৃহস্পতিবার রাতে লিটন এবং তার পরিবারের লোকজন মুন্নীকে বাপের বাড়ী অথবা আমার নিকট থেকে ৫০ হাজার টাকা নিয়ে দেয়ার জন্য চাপাচাপি করতে থাকে। এ সময় মুন্নী প্রায় ৭ মাসের গর্ভবতী। সে আমাদের পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে টাকা এনে দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে স্বামীর পরিবারের সবাই মিলে তাকে বেধড়ক মারপিট করে।
স্বামী ও শ্বশুড়বাড়ির লোকজনের অমানবিক ও পৈচাশিক অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে পরদিন ২৬ জুন শুক্রবার মুন্নী পিত্রালয়ে চলে যায়। এ অবস্থায় সে আর স্বামীর সংসারে ফিরে যেতে চায়নি। শেষপর্যন্ত অনাগত সন্তানের ভবিষ্যত চিন্তা করে আমাদের এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং নিকটাত্মীয়রা তাকে স্বামীর সংসারে ফিরে যেতে অনুরোধ করেন। সকলের মুখের দিকে চেয়ে একান্ত অনিচ্ছাস্বত্ত্বেও শেষপর্যন্ত আতঙ্কিত মুন্নী স্বামীর সংসারে ফিরে যেতে বাধ্য হয়।
শুধুমাত্র অনাগত সন্তান এবং এলাকার মুরব্বিদের সম্মানের দিকে চেয়ে সে স্বামী ও শ্বশুড়বাড়ির লোকজনের অব্যাহত অত্যাচার মুখ বুঝে সহ্য করেছিল। এ অসহনীয় অবস্থার মধ্যেই সে একটি কন্যা সন্তানের জননী হয়, যার বর্তমান বয়স মাত্র ২ মাস।
জয়ন্তী বালা দেবী আরো বলেন, গত ৪ ডিসেম্বর শুক্রবার স্বামী ও ছোটভাইকে নিয়ে আকস্মিক আমি মুন্নীর শ্বশুড়বাড়ি গিয়ে হাজির হই। সে আমাদের দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। আমাকে জড়িয়ে কান্নাজড়িত কন্ঠে বলতে থাকে, ‘দিদিরে আমারে এখান থেকে নিয়ে যা, না হয় ওরা আমাকে মেরে ফেলবে।’ তার এসব কান্নায় কান না দিয়ে শ্বশুড়-শাশুড়ি এবং তাদের পরিবারের লোকজন মুন্নীর বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় তুলে ধরেন। এমনকি কেউ কেউ তাকে পাগল সাজাতেও সচেষ্ট ছিলেন। এ অবস্থায় আমি বোনকে সাথে করে নিয়ে আসতে চাইলে এতে বাঁধ সাধেন তার শ্বশুড় ক্ষিরোদ দেবনাথ।
তিনি বলেন, এভাবে নিয়ে যাওয়া যাবে না। ‘কাগজে-কলমে’ লিখে, তবেই নিয়ে যেতে হবে। শেষপর্যন্ত আমি, আমার স্বামী ও ছোটভাই মুন্নীর শ্বশুড় ক্ষিরোদ চন্দ্র দেবনাথ ও শাশুড়ি শেফালী দেবনাথের জেদের কাছে হার মেনে পরের শুক্রবার অর্থাৎ গত ১১ ডিসেম্বর মুন্নীকে চিরতরে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত হয়। এ অবস্থায় আমি, আমার স্বামী ও ছোটভাই চলে আসতে চাইলে মুন্নী বারবার আকূল হয়ে কেঁদে কেঁদে বলছিল, ‘দিদি, দিদিরে আমাকে তোর সাথে করে নিয়ে যা, তা না হলে ওরা আমাকে মেরে ফেলবে। হয়তো তোর মুন্নীর কণ্ঠে আর কোনদিন দিদি ডাক শুনতে পাবি না’। আমি তাকে মাত্র ১টি সপ্তাহ ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষার কথা বলে পাষন্ডের মতো চলে এসেছিলাম। আমার এই দেখাই তাকে শেষ দেখা।
৫ ডিসেম্বর শনিবার আমার পিত্রালয়ের পাশের বাড়িতে একটি গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান চলছিল। রাত সাড়ে ১১টার দিকে মুন্নীর স্বামী লিটন আমার ভাবী রত্নার ঘরে আসে। তাকে অত্যন্ত অস্থির ও বিহ্বল দেখাচ্ছিল। বার বার পানি পান করতে দেখা গেছে। শেষ পর্যন্ত প্রেয়সী রত্নার সাথে শলাপরামর্শ করে রাত অনুমান ২টার দিকে লিটন আমার মায়ের ঘরে এসে বলে, ‘তোমাদের বোন মুন্নী গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। আমি এইমাত্র মোবাইল ফোনে জানতে পেরেছি।’ খবর পেয়ে আমিসহ আমাদের আত্মীয়-স্বজন সবাই মিলে লিটনদের বাড়ীতে গিয়ে দেখতে পাই গলায় একটি বিকট দাগ নিয়ে মুন্নীর নিথর দেহ একটি খাটে শুয়ানো। কিন্তু সাধারণতঃ গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার যে সব ‘আলামত’ থাকে, মুন্নীর বেলায় তার কোনটিই চোখে পড়ে না। পাশাপাশি মুন্নীর শ্বশুড়বাড়ির সকলের অতিমাত্রার ‘স্বাভাবিক’ আচার-আচরণ আমাকে আরো সন্দিহান করে তুলে। ঘটনাটি আমার কাছে ক্রমশঃ রহস্যজনক বলে মনে হতে থাকে।
পরদিন সকাল ১১টায় এসএমপি’র মোগলাবাজার থানার এসআই কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে পুলিশ এসে লাশের সুরতহাল রিপোর্ট করে এবং ফাঁসির আলামত হিসেবে মাত্র ২ হাত অর্থাৎ ৩ ফুট লম্বা একটি পাটের রশি উদ্ধারপূর্বক জব্দ করে। মাত্র ২ হাত রশি দিয়ে একজন মানুষ কিভাবে ফাঁসিতে ঝুলতে পারে, তা আমার ক্ষুদ্র মস্তিস্কে বোধগম্য হচ্ছে না। মুন্নীর শ্বশুড়বাড়ির লোকজনের ‘স্বাভাবিক’ এবং পুলিশের ‘রহস্যজনক’ আচরণে যতই সময় যাচ্ছিল, ততই আমরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছিলাম। আমার কাছে বারবার মনে হচ্ছিল মুন্নীকে ওর শ্বশুড়বাড়ির লোকজন-ই যোগসাজশ করে হত্যা করেছে। এসব চিন্তা করতে করতে আমার অবস্থা অনেকটা পাগলপ্রায়।
এ রকম অস্বাভাবিক অবস্থায় এসআই কামরুজ্জামান লাশ ময়না তদন্তে পাঠাবার কথা বলে একটি সাদা কাগজের নীচের দিকে আমি ও আমার ভাইসহ আমার পিত্রালয় থেকে আসা অন্য সদস্যদের স্বাক্ষর নিয়ে যান। অনেকটা অবচেতন মনে এবং সরল বিশ্বাসে আমরা সাদা কাগজে স্বাক্ষর দেই। পরে জানতে পারি আমাদের সাদা কাগজে স্বাক্ষর দেয়াই নাকি মুন্নীর হত্যার বিচারের সব পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে? এসআই কামরুজ্জামান আমাদের স্বাক্ষর দেয়া উক্ত সাদা কাগজে থানায় অপমৃত্যুর মামলা নথিভূক্ত করেছেন।
খবর পেয়ে আমরা সাথে সাথে মোগলাবাজার থানায় হত্যা মামলা দায়ের করতে গেলে ওসি খায়রুল ফজল অজ্ঞাত কারণে আমাদের মামলাটি গ্রহণ করেনি। আমরা মনে করি মুন্নীর ঘাতক স্বামী লিটন প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের যোগসাজশে এবং অর্থের বিনিময়ে থানা পুলিশকে বশীভূত করেছে। থানায় মামলা দায়েরে ব্যর্থ হয়ে আমি গত ১০ ডিসেম্বর সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের নিকট একটি অভিযোগ দায়ের করি।
সংবাদ সম্মেলনে জয়ন্তী বালা দেবী পুলিশ কমিশনার বরাবরে দেয়া তার অভিযোগটি এজাহাররূপে গণ্য এবং ঘাতক স্বামী লিটন দেবনাথ, শ্বশুড় ক্ষিরোদ দেবনাথ, শাশুড়ি শেফালী দেবনাথ, ননদ জ্যোতি দেবনাথ, মিথিলা দেবনাথ, তৃপ্তি দেবনাথ এবং তার ভাবী রত্নার দেবনাথসহ মুন্নী হত্যায় জড়িত সকলকে অবিলম্বে গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন।