Sylhet Today 24 PRINT

‘ভোট লইয়া বিপদে আছি, হখলউ মুখ চিনা’

পৌর নির্বাচন: বড়লেখা

তপন কুমার দাস, বড়লেখা |  ২৪ ডিসেম্বর, ২০১৫

মৌলভীবাজারের বড়লেখায় পৌরসভা নির্বাচনকে ঘিরে প্রচারণা এখন তুঙ্গে। প্রার্থীরা ছুটছেন ভোটারদের বাড়ি বাড়ি। পৌর এলাকার বাজারগুলোতে এখন সুতোয় ঝুলছে পোস্টারের সারি। পোস্টারের সারিতে বাজারগুলোর রঙই পাল্টে গেছে। বড়লেখা পৌরসভার গ্রাম ও পাড়ার একই অবস্থা।

তবে এ পৌরসভায় ভোটের আলোচনায় প্রার্থী ও প্রতীকের বিষয়টি ছাপিয়ে অনেক জায়গায় উন্নয়ন না হওয়া, ভাঙা সড়ক, জলাবদ্ধতার ক্ষোভই বড় হয়ে ওঠেছে। গত (২৩ ডিসেম্বর) বড়লেখা পৌর এলাকার বিভিন্ন গ্রাম ও স্থান ঘুরে পৌরবাসীর সাথে কথা বলে এ ধারণাটি পাওয়া গেছে।

বড়লেখা সদরের কাছেই মহুবন্দ এলাকা। শহর থেকে একটু ভেতরে গেলেই খোলা মাঠ। পাকা সড়কের দুপাশে সদ্য কেটে নেওয়া ধানের নাড়া পৌষের দুপুরবেলার রোদে ঝকমক করছে। এই পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে পাওয়া গেল ষাটোর্ধ আজমল মিয়াকে। পৌরসভায় থাকার সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে কথা ওঠতেই তিনি সামনের একটি রাস্তা দেখিয়ে বলেন। সামনের যে রাস্তা দেখছইন। রাস্তাত কোমর সমান পানি অয়। একটা ড্রেন নাই। নিজেরা মাটি কাটি পানি যাওয়ার ব্যবস্থা করছি।’ আজমল মিয়া আরো বলেন, ‘পৌরসভার ভিতর আমরা আছি। ঘরও কারেন্টই নাই।

মহুবন্দের পাশের এলাকা সোনাপুরের একটি বাড়ির সামনের রাস্তার এক পাশে বসে জ্বালানি কাঠ কাটছেন সাফিয়া খাতুন (৬০)। ভোটের প্রসঙ্গ ওঠতেই ছফিয়া বেগম বললেন, ‘ভোট লইয়া বিপদে আছি। হখলউ (সব প্রার্থীই) নিজের। হখলরউ মুখ চিনা। রাইতে দিনে চিন্তাত আছি কারে যে ভোট দেই কারে না। ভাবছি ৮-১০টা ভোট আছে আমার (পরিবারের সদস্যদের)। বউরারে  (ছেলেদের স্ত্রী) কইমু বাটিয়াচাটিয়া (ভাগ করে) দিলাইতা। হখলউ (সবাই) খোশ থাউককা।’

পৌরসভার হিনাইনগর এলাকার ব্যবসায়ী জামাল আহমদ বলেন, ‘পৌরসভায় থাকলে কিতা (কি) অইতো। ইউনিয়ন থাকি উন্নত অওয়ার (হওয়ার) কথা। কিন্তু পাঁচ বছরে কোনো উন্নয়ন অইছে না। রাস্তা ভাঙা। আমরার এলাকায় কোনো ড্রেন নাই। ভোট আইছে। অনেকেই আইরা। দেখা যাউক কিতা অয়।’

ধানক্ষেতের বুক চিরে আসা আহমদপুর-পাখিয়ালা সড়ক ধরে এসে পাখিয়ালা চৌমোহনার একটি চা-স্টলে বসে চা খেতে খেতে শোনা গেল নির্বাচন নিয়ে অনেকের চুপিচুপি হিসাব-নিকাশ।

পাখিয়ালা চৌমোহনা থেকে দরগাবাজার যাওয়ার জন্য একজন রিকশাওয়ালাকে ডাক দিলে রিকশাওয়ালা দরগাবাজার শুনেই বেঁকে গেল। সে অপথে যাবে না। কোনোরকম বেশি ভাড়ার কথা বলে তাঁকে রাজি করালাম। কথায় কথায় রিকশাওয়ালা জমির উদ্দিন বলেন, ‘এদিকে আমার বাড়ি। সকালে আই। আর একবারে বিকালে যাই। ভাঙা রাস্তা দিয়া কেউ যাইতে চায় না। টন টন করি সিক (চাকার শিক) ভাঙে। এ রাস্তায় ছয়বার গেলে নয়বার ভাত খাওয়া লাগে।’

রিকশা চড়তে গিয়ে ঝাঁকুনিতে তাঁর কথার সত্যতা হাড়ে হাড়ে টের মিলল। ভোটের প্রসঙ্গ তুলতেই জমির উদ্দিন বলেন, ‘ভোট দিয়া কিতা করতাম। রিকশা চালাই খাই। সরকারি রিলিফটিলিপ কুনতাইতো  (কোনোকিছু) পাই না। মনে অয় আমরা লন্ডনি টাকা রুজি করি। কারে ভোট দিতাম। দেখা যায়তো সবাই ভালা।’

দরগাবাজারে একটি খোলা চা-ষ্টলে বসে চা খাচ্ছিলেন পৌরসভার মুড়িরগুল এলাকার নিজাম আহমদ (৮০) ও জহির উদ্দিন (৭৫)। তাঁদের কথায়ও উন্নয়ন না হওয়ার ক্ষোভ। তাঁরা দুজনই জানালেন, পৌরসভা হওয়ার পরপর যথেষ্ট উন্নয়ন হয়েছিল (২০০১ সালে পৌরসভার প্রতিষ্ঠা)। গত পাঁচবছর কোনো উন্নয়ন হয়নি। তাঁরা দোকানের দেয়ালে সাঁটা তিনটি পোস্টার দেখিয়ে জানালেন, নৌকা, নারকেল গাছ ও মোবাইল ফোনের মধ্যে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে।

বড়লেখা পৌরসভায় মেয়র পদে প্রার্থী হয়েছেন ছয় জন। আওয়ামী লীগের আবুল ইমাম মোঃ. কামরান চৌধুরী  (নৌকা), বিএনপির আনোয়ারুল ইসলাম (ধানের শীষ), জাতীয় পার্টির মীর মুজিবুর রহমান (লাঙল), জামায়াত সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থী খিজির আহমদ (মোবাইল ফোন), আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আব্দুর নূর (নারিকেল গাছ) ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মতিউর রহমান (জগ)।

বড়লেখা পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, বড়লেখা পৌরসভা জনসংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। ভোটার ১৩ হাজার ৩৩৫জন। ৬৫ কিলোমিটার রাস্তার মধ্যে ৩৩ কিলোমিটার কাঁচা। ২২ কিলোমিটার ড্রেনের মাত্র ২ কিলোমিটার পাকা।
উন্নয়ন না হওয়া প্রসঙ্গে বর্তমান চেয়ারম্যান মোঃ. ফখরুল ইসলাম অসুস্থ থাকায় বেশি কথা বলতে চাননি। তবে তিনি জানিয়েছেন, ভাঙা সড়কের অনেকটির দরপত্র হয়েছে। পর্যায়ক্রমে কাজ হবে।

ঘুরতে ঘুরতে ততক্ষণে বেলা বিকেলের দিকে গড়িয়ে গেছে। প্রার্থীদের প্রচারের মাইক বেরিয়েছে। পৌর শহরের উত্তরবাজারে দেখা হওয়া পৌরসভার বারইগ্রামের গ্রামের খলিল আহমদ বলেন, ‘কে যাইব অখনো বোঝতাম পাররাম না। সেকেন্ডে সেকেন্ডে ভোট ঘুরের।’ তিনি জানান, স্থানীয় নির্বাচন হিসেবে এলাকাভিত্তিক ভোট হয়ে থাকে। কিন্তু এবার দলীয় প্রতীক থাকায় অনেকের পক্ষেই এলাকাভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.