Sylhet Today 24 PRINT

‘চাপের মুখে’ পাথর উত্তোলনের অনুমতি না দেয়ার আহ্বান

সিলেটের ২০ নাগরিকের বিবৃতি

নিজস্ব প্রতিবেদক |  ৩০ অক্টোবর, ২০২২

পরিবেশের সুরক্ষার জন্য সিলেটের কোয়ারিগুলো থেকে পাথর উত্তোলনের অনুমতি প্রদান করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। রোববার এক বিবৃতিতে এমন জানিয়েছেন বিভিন্ন অঙ্গনের সিলেটের ২০ নাগরিক। পাথর উত্তোলন শুরু করতে সরকারের উপর অনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

বাংলাদেষ পরিবেশ আন্দোলন (বেলা) সিলেটের সমন্বয়ক শাহ শাহেদা আক্তার প্রেরিত এই বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়- বাংলাদেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলের সিলেট জেলা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ যা সারা দেশের পর্যটকদের একটি প্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। সিলেটের জাফলং এ পিয়াইন ও ডাউকী নদীসহ ধলাই নদী, রাংপানি নদী, বিছানাকান্দি, উৎমাছড়া, লোভাছড়া ও ভোলাগঞ্জ পাথরের উপর প্রবাহিত স্ফটিক পানির জন্য অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন স্থান যা বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত পর্যটনস্থল।

'২০০৫ সাল থেকে যান্ত্রিকভাবে পাথর উত্তোলনের ফলে সিলেটের পিয়াইন ও ডাউকী নদী তাদের  সৌন্দর্য্য হারিয়েছে, ফলে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে পর্যটনশিল্প। বিধ্বংসী পাথর উত্তোলনের ফলে পিয়াইন ও ডাউকী নদীতে বিভিন্ন স্থানে পানি ঘোলা হয়ে যায় এবং নদীর বুকে বালুর স্তুপ ও ট্রাকের মিছিল নিয়মিত হয়ে পড়ে। তাছাড়া বেপরোয়া পাথর উত্তোলনে সিলেটে ২০০৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ১০৬ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ৩৫ জন।'

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, উচ্চ আদালতের রায় এবং সরকারের  সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো ২০২০ সালের ৮ জুন (স্মারক নং-২৮.০৭.০০০০.০০৪.১৬.০০২.৫৯.৪০ ) স্বাক্ষরিত পত্রের মাধ্যমে সরকারিভাবে তালিকাভুক্ত ৮টি পাথর কোয়ারির ইজারা স্থগিত করে এবং পাথর উত্তোলন বন্ধ করে। ফলে সিলেটের পিয়াইন ও ডাউকী নদীসহ পাথর মহাল হিসেবে পূর্বে ঘোষিত নদী ও ছড়ায় প্রাণ ও প্রকৃতি ফিরতে শুরু করেছে। পর্যটকের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু পাথর উত্তোলনকারীরা নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থে আদালতের নির্দেশে পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন ঘোষিত পিয়াইন ও ডাউকী, ধলাই নদীসহ সিলেটের অন্যান্য স্থানে পাথর উত্তোলনের অনুমতি প্রদানে সরকারের উপর অনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে।

বিবৃতিদাতারা বলেন, পাথর উত্তোলনকারীরা সিলেটের সাম্প্রতিক বন্যার জন্য পাথর না তোলায় নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্থ হওয়াকে দায়ী করলেও প্রকৃত সত্য হচ্ছে যে, তাদের বোমা মেশিনের দ্বারা পাথর উত্তোলনের ফলেই পিয়াইন ও ডাউকী, ধলাই নদীর পাড় ভেঙেছে যা সরকারিভাবে স্বীকৃত। এসব পাথর উত্তোলনকারী ব্যবসা পরিচালনাকালে কখনো শ্রমিকদের সুরক্ষার কোনোরকম ব্যবস্থা গ্রহণ না করলেও, আদালতের নির্দেশে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় (ইসিএ) পাথর উত্তোলন বন্ধ হলে তার বিরুদ্ধে শ্রমিকদের উষ্কে দিচ্ছেন।

তারা এমনকি পাথর উত্তোলনের দাবীতে পরিবহন ধর্মঘট আহবান করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি এবং আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছেন। ইতোমধ্যে বিভিন্ন পরিসংখ্যানে প্রমানীত যে, দেশের পাথরের চাহিদার খুব অল্পই পাথর উত্তোলনের মাধ্যমে যোগান হয় এবং পাথর উত্তোলনে লাভের চাইতে ক্ষতির পরিমাণ আর্থিক হিসেবে অনেক বেশি।

এ প্রেক্ষিতে এটি স্পষ্ট করা প্রয়োজন যে, প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় এমনকি অযান্ত্রিক পদ্ধতিতেও খনিজ সম্পদ আহরণ আইনত অনুমোদিত নয়। সাম্প্রতিক সময়ে জাফলং- এ পর্যটন ফিরে আসার প্রেক্ষিতে সরকার নিশ্চিতভাবেই পিয়াইন ও ডাউকী নদীসহ  রাংপানি নদী, ধলাই নদী, বিছানাকান্দি, উৎমাছড়া, লোভাছড়া ও ভোলাগঞ্জ পর্যটন শিল্পের একটি রুপরেখা ও মাস্টারপ্লান প্রণয়ন করে উল্লেখিত জায়গাগুলোর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেমন রক্ষা করতে পারে তেমনি পরিবেশ বিধ্বংসী পাথর উত্তোলনে ও অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন থেকে এলাকাগুলোকে রক্ষা করতে পারে।

বিবৃতিতে বলা হয়, পরিবেশ রক্ষা যেহেতু সরকারের সাংবিধানিক অধিকার তাই আগামী প্রজন্মের স্বার্থে পিয়াইন ও ডাউকী নদীসহ ধলাই,  রাংপানি নদী,  বিছানাকান্দি, উৎমাছড়া, লোভাছড়া ও ভোলাগঞ্জ পাথর উত্তোলনকারীদের হাত থেকে রক্ষা করে তা আগামী প্রজন্মের জন্য সুরক্ষিত রাখতে আহবান জানাচ্ছি। একই সাথে আদালতের আদেশ ও সরকারের নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আন্দোলনরত পাথর উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে যথাযত আইনী ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি। কোন অবৈধ চাপের মুখে নতি শিকার নয় বরং আগামী প্রজন্মের জন্যই যাতে পিয়াইন ও ডাউকী নদীসহ ধলাই, রাংপানি নদী, বিছানাকান্দি, উৎমাছড়া, লোভাছড়া ও ভোলাগঞ্জ সুরক্ষিত থাকে এ পত্রের মাধ্যমে সে দাবিই জানাচ্ছি।

বেলা সমন্বয়ক শাহ সাহেদা আখতার ছাড়াও বিবৃতিতে সাক্ষর করেন সিলেট-৪ আসনের সাবেক সাংসদ নাজিম কামরান চৌধুরী, সুজন সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ মাহমুদ চৌধুরী, সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এমাদ উল্লাহ শহীদুল ইসলাম, সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি ইকবাল সিদ্দিকী, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পেট্রোলিয়াম এন্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ বিভাগের অধ্যাপক
ড. সফিকুল ইসলাম, সমাজ কর্ম বিভাগের অধ্যাপক তাহমিনা ইসলাম, শিক্ষাবিদ ও গবেষক ড. আবুল ফতেহ ফাত্তাহ, মণিপুরি সাহিত্য সংসদের সভাপতি এ কে শেরাম, সনাক সিলেটের সভাপতি সমিক শহিদ জাহান, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সিলেট বিভাগীয় প্রধান সৈয়দা শিরীন আক্তার, সম্মিলিত নাট্য পরিষদ সিলেটের সভাপতি মিশফাক আহমদ মিশু, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম, এফআইভিডিবি'র নির্বাহী পরিচালক বজলে মুস্তাফা রাজী, এডকোর নির্বাহী পরিচালক লক্ষ্মীকান্ত সিংহ, উদীচী সিলেট জেলা সংসদের সভাপতি এনায়েত হাসান মানিক, পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাশমির রেজা, বাসদ (মাকর্সবাদী), সিলেট জেলা শাখার আহ্বায়ক উজ্জল রায়, হাওর বাচাঁও আন্দোলন, সিলেট জেলার সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিন ও গণজাগরণ মঞ্চ সিলেটের মুখপাত্র দেবাশীষ দেবু।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ [email protected] ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.