রুমেল আহসান, ফেঞ্চুগঞ্জ | ০২ মার্চ, ২০২৩
ষাটোর্ধ্ব নাজিব আলী। চুল-দাঁড়িতে পাক ধরেছে। ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ছত্তিশ এলাকার দিনমজুর তিনি। কাকে ভোট দেবেন জানতে চাইলে বলেন, ‘যোগ্য ব্যক্তি দেখিয়া ভোট দিমু। যারা খাড়া (প্রার্থী) হয়ছেন তারার মাঝে কোনো বাদ (খারাপ) মানুষরে ভোট দিলে খেসারতও তো দিতে অইবো।’
ফেঞ্চুগঞ্জ পূর্ব বাজারে পারভেজ আহমদ এর চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছেন কয়েকজন তরুণ ভোটার। সেখানে ভেতরে বেঞ্চ পেতে স্থানীয় ব্যবসায়ী সহ বিভিন্ন বয়সী জনা দশেক ভোটার জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছিলেন। ভোটের আলাপ-আলোচনা করে চায়ের কাপেও ঝড় তুলছিলেন। ‘সবখানেই তো অহন ভোটের আলাপ। ইলেকশনও জমছেও ভালা। নৌকা আর স্বতন্ত্র প্রার্থী ওকলোর ফাইট হইবো’, বলছিলেন ১নং ফেঞ্চুগঞ্জ ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা বাসিন্দা আরিফ।
এতোক্ষণ পাশে বসে নীরব থাকা তরুণ ইমরান হাঁক দিলেন, ‘নৌকা, ধান বুঝি না, যোগ্য প্রার্থীরেই সিল মারমু।’ ইমরানের সঙ্গে ‘হ হ’ করে কণ্ঠ মেলাতে দেখা গেলো আড্ডায় শামিল হওয়া প্রায় সবাইকেই।
উপজেলার কটালপুর এলাকায় বাজার সড়কের সামনেই রোদের তাপে গা গরম করছিলেন শামীম ও শিপন। তারা দু’জনেই ৬ নং ওয়ার্ডের ভোটার। বাড়ি দিমপুর এলাকায়। ভোটের হিসাব-নিকাশ কষতে দেখা গেলো তাদেরকেও। চেয়ারম্যান পদে দু’প্রার্থীর ব্যবচ্ছেদ করছেন তারা।
শামীম যখন বলে ফেললেন, ‘নৌকা মার্কায় ভোট টানবো বেশি।’ তখন শিপনের কণ্ঠে উচ্চারণ, ‘বর্তমান চেয়ারম্যান প্রার্থীই তো খারাপ না। ভোটাভুটিত তারা ফালাইয়া দিবার পারাবা না। ১৬ মার্চ দেখো না কী অয়। ফজলু চেয়ারম্যানের লগে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়বো দু'জনের'।
এদিকে, ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনকে সামনে রেখে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় প্রচার-প্রচারণা এখন তুঙ্গে। কাকডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ভোটারের বাড়ি বাড়ি ছুটছেন প্রার্থীরা। রাত-দিন ঘুম হারাম করে চষে বেড়াচ্ছেন নির্বাচনী এলাকা। বসে নেই কর্মী সমথর্করাও। সমানতালে ছুটছেন তারাও। ভোটারের গায়ে প্রার্থীদের হাত, দোয়া চাওয়া, উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি, চা-নাস্তা-পান খাওয়ানো, সবই চলছে। ভোটাররাও সাড়া দিচ্ছেন। তবে দেশের জনগণ এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে আরো বেশি সচেতন। তাই মুখ খুলছেন না কেউই। তাদের বক্তব্য, মার্কা দেখে নয়, যোগ্য প্রার্থী দেখে ভোট দেবেন তারা।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, ফেঞ্চুগঞ্জের মানুষের কাছে এবারের ইউপি নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই সঙ্গে দলীয়ভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও আওয়ামী লীগ ব্যতীত বিএনপি অংশ নেয়নি। বিএনপি নেতাকর্মীরা স্বতন্ত্র কৌশলে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধিতা করছেন।
দিন যতই ঘনিয়ে আসছে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা ততই জমে উঠছে। দিনরাত ভোটারদের বাড়ি বাড়ি ছুটছেন প্রার্থী ও সমর্থকরা। হোটেল-রেস্টুরেন্ট, চায়ের কাপে বইছে ভোটের ঝড়। পোস্টারে পোস্টারে ছেয়ে গেছে ইউনিয়নগুলোর পুরো এলাকা।
মোহাম্মদ আলী, আব্দুল জব্বার, ইদ্রিস আলীসহ একাধিক স্থানীয় ব্যক্তি জানান, চেয়ারম্যান প্রার্থীরা উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। ভোটাররাও কৌশলে প্রার্থীদের ভোট দেবার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
জাবেদ হোসেন ও মোজাহার আলী জানালেন, আওয়ামী লীগের আমলে বেশ উন্নয়ন হলেও গত ২০১৮ সালে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের মধ্যে তিনটি ইউনিয়নে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী বিজয়ী হন। তাই নৌকা ও স্বতন্ত্র কোনো প্রার্থীকেই এখানে খাট করে দেখার সুযোগ নেই। সবমিলিয়ে ভোটের ফলাফল কি দাঁড়ায়, তা দেখতে শেষদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
তারা বলেন, বিপদে-আপদে যাদের কাছে পাবো, যারা গরীবের দুঃখ-কষ্ট বুঝবেন, ভোটে জেতার পর এলাকায় থাকবেন, তাদেরকেই ভোট দেবো আমরা।
উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ৫টি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ দলীয় ৫ জনসহ মোট ২৪ জন প্রার্থী চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।