Sylhet Today 24 PRINT

বনবিভাগের দেয়া আগুনেই পুড়ে পাথারিয়ার সংরক্ষিত বন!

রিপন দে, মৌলভীবাজার |  ১৬ মার্চ, ২০২৩

মৌলভীবাজারের জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলার উত্তর পূর্ব প্রান্ত জুড়ে রয়েছে পাথারিয়া হিলস রিজার্ভ ফরেস্ট। প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে এ বনে টিকে আছে চারটি বন্য হাতি, যা সিলেটের আর কোথাও নেই। সম্প্রতি এই বনে আগুন লাগানোর বিষয়টি সারাদেশের গণমাধ্যমে আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ উঠেছে খোদ বনবিভাগের উপরই।

বনবিভাগের উপর এ অভিযোগ উঠেছে যে, সামাজিক বনায়নের নামে এই আগুন লাগিয়ে তারা সংরক্ষিত বনের বিশাল একটি অংশ পুড়িয়ে দিয়েছে। স্থানীয় পরিবেশকর্মীরা বলছেন, আগুন লাগার স্থানটি ছিল প্রাকৃতিক হাতির আবাসস্থল। তাছাড়া এখানে যে বাঁশবাগান ছিল, তা ছিল হাতির খাবার।

পাথারিয়া হিলস রিজার্ভ ফরেস্টের বড়লেখা রেঞ্জের সমনভাগ এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, আট দিন ধরে আগুন জ্বলে বন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

বিষয়টি জেনেও আগুন নেভানোর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বন বিভাগের বিরুদ্ধে। উল্টো বিভিন্নভাবে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে তাদের উপর। প্রথমে তারা দাবি করেছিল বিষয়টি বড় নয়। কিন্তু যখন এটি আলোচনায় আসে তখন ধামাচাপা দিতে নানা উদ্যোগ নেয় বন বিভাগ।

বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, "আমি বনে আগুন লাগার বিষয়টি জেনেছি। এটি সাধারণ বন বিভাগের অধীনে। তবে যেহেতু সংরক্ষিত বন এলাকায় আগুন লেগেছে, এতে সরীসৃপ প্রজাতির প্রাণীসহ বিভিন্ন কীটপতঙ্গ, পাখির বাসার ব্যাপক ক্ষতি হবে। বিশেষ করে হাতির খাবার নষ্ট হওয়ার কারণে মানুষ-হাতির দ্বন্দ্ব বাড়তে পারে। খাদ্যাভাবে হাতি যদি লোকালয়ে আসে অনেক বড় ক্ষতিও হতে পারে।"

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, বড় গাছের গুঁড়ি পড়ে মাটির সাথে মিশে আছে। ছোট-বড় মিলিয়ে অন্তত ২০ হাজার গাছ পুড়েছে, কাটা হয়েছে লাখ লাখ বাঁশ। আগুন লাগানোর আগে বনবিভাগ গাছগুলো কেটে নেয় বলে জানা গেছে। তাছাড়া, স্থানীয়দের সাথে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতেও কৌশলে বাধা দিচ্ছে বনবিভাগ।

সেখানে নিয়মিত যাওয়া-আসা করা কামাল আহমদ বলেন, "এক সপ্তাহ আগে বনে আগুন দেখতে পাই। আগুনের তীব্রতা বেশি থাকায় তা বনের অনেক জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি বন বিভাগকে জানালেও তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।"

এর আগে গত শনিবার ১১ মার্চ সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মিশ্র চিরহরিৎ সমনভাগ এলাকায় ধলছড়ি ও মাকাল জোরা এলাকায় বনভূমি আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। একপাশে দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন। আগুনে পুড়ে অজগর সাপ, চশমাপরা হনুমান, মায়া হরিণ, কচ্ছপ, বনরুই, সজারুসহ বিভিন্ন সরীসৃপ প্রজাতির আবাস্থল এবং বিরল কীটপতঙ্গ ও বেশ কিছু প্রজাতির বৃক্ষের ক্ষতি হয়।

সেদিন আরো দেখা যায়, বনের আরেক পাশে চলছে বাঁশ কাটার মহোৎসব। প্রায় ৪০ জন শ্রমিক দিয়ে সরকারি সম্পত্তিগুলোকে বিনষ্ট করা হচ্ছে। এসব বাঁশ পরবর্তীতে আগুন দিয়ে পোড়ানো হবে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, লাঠিটিলা, সমনভাগ, বড়লেখা, মাধবছড়া বিট নিয়ে এই সংরক্ষিত বন। পরিবেশগতভাবে মিশ্র চিরহরিৎ সমনভাগ বনাঞ্চলের এ অংশটি ইন্দো-বার্মা জীববৈচিত্র্য হটস্পটের একটি অংশ এবং এটি ভারত-বাংলাদেশের আন্তঃসীমান্তব্যাপী ছয়টি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মধ্যে একটি।

পরিবেশকর্মীরা বলছেন, স্থানীয় বন বিভাগ বনায়নের নামে অর্থ আত্মসাতের জন্য এই কাজ করছে। গত বছরও তারা একই কাজ করেছে কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

বিলুপ্তির পথে বন্য হাতি

বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বনে পুরুষ হাতি নেই। ফলে হাতির বংশবৃদ্ধি হচ্ছে না। বংশবৃদ্ধি না হলে এই বন থেকে হাতি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এই বনে অন্তত একটি পুরুষ হাতির ব্যবস্থা করা গেলে বন্যহাতি বিলুপ্তি থেকে রক্ষা পাবে। কিন্তু যাদের কাছে এই দাবি ছিল তারা উল্টো হাতির খাবার ও বাসস্থান নষ্ট করে দিয়েছে।

মানুষের চলাচল ও বসতি করার ফলে এখানকার হাতিগুলো বনের গভীরে চলে গেছে। তবে, খাবারের খোঁজে এরা একা কিংবা দল বেঁধে মাঝেমধ্যে লোকালয়ে আসে। ভারতের আসাম রাজ্যের বেশকিছু জায়গায় তাদের বিচরণ।

স্থানীয় অধিবাসীরা জানান, এই দলে নয়টি হাতি ছিল। এরমধ্যে আটটি মাদী হাতি ও একটি পুরুষ হাতি। দলের রাজা ছিল পুরুষ হাতিটি। উচ্চতার দিক থেকে সেটি ছিল সবচেয়ে বড়। এরপর প্রজননক্রমে দুটি হাতি বেড়েছিল, সেই দুটিও ছিল মাদী হাতি।

সর্বশেষ ২০১৯ সালে দুটি হাতি ভারতের করিমগঞ্জ জেলার চম্পাবাড়ী এলাকায় বৈদ্যুতিক তারে শক খেয়ে ঘটনাস্থলে একটি মারা যায়। আরেকটি অসুস্থ হয়ে পড়ে। সেসময় দলে ছিল ৭টি হাতি। এরপর আহত হাতিটিকে ভারতের বনবিভাগের অধীনে চিকিৎসা করার পর বনে ছেড়ে দেওয়া হয়। এই এলাকার বিজয় সূত্রধর (৩৫) জানান, ২০২১ সালের আগস্ট মাসে ভারতের চম্পাবাড়ী এলাকায় অসুস্থ সেই হাতিটি মারা যায়। বর্তমানে এই দলে মাত্র ৪টি হাতি দেখা যায়।

পাথারিয়ার বনে সব সময় আসা-যাওয়া করেন ডুমাবাড়ী এলাকার সফিক উদ্দিন। তিনি বলেন, "আগে আমরা সব সময় বনে থাকতাম। তখন ৭টা হাতি দেখতে পেতাম। আমরা এক পাশে বসে আছি, হাতিগুলো আরেক পাশে বিচরণ করছে। এমনই ছিল। তখন হাতিগুলো মানুষকে আক্রমণ করতো না।"

"হাতিগুলো আগে যেসব জায়গায় বিচরণ করতো, সেখানে এখন মানুষের আনাগোনা বেশি। বনের ভেতরে যে বাঁশবন ছিলো, তা পরিষ্কার করে গাছ বাগান করা হচ্ছে। হাতিগুলোকে এখন তেমন দেখা যায়না," বলেন তিনি।
 
স্থানীয় বাসিন্দা ইদ্রিস আলী বলেন, "আমি জ্বালানি কাঠ ও নিজের কাজের জন্য বাঁশ নিতে মাঝেমধ্যে বনে আসা-যাওয়া করি। এই বনটি এমন ছিল না। এটি প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো। বনটি পরিপাটি ছিল। তবে এখন আর আগের মতো নেই। বনে হাতিও থাকে না, থাকার কোনো পরিবেশ নেই। যা আছে তাও ধ্বংস করা হচ্ছে।"
 
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম জানান, "হাতি একটি রাজকীয় প্রাণী যা আমাদের দেশ থেকে প্রায় বিলুপ্তির পথে। বনবিভাগ কতটা দায়িত্বহীন হলে যেখানে তাদের প্রাণী ও বন রক্ষা করার কথা সেখানে উল্টো বন পোড়াচ্ছে, হাতির খাবার নষ্ট করছে। হাতির খাবার পুড়িয়ে ফেলার কারণে তারা খাদ্যাভাবে পড়বে। পরে লোকালয়ে এসে মানুষের উপর আক্রমণ করবে।"

অতিসত্তর বনবিভাগের বনায়ন বন্ধ করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, "প্রাকৃতিক বন পুড়িয়ে কৃত্রিম বন কোনভাবেই মানা যায়না। গত বছরও আমরা একই সংবাদ পেয়েছি, কিন্তু তখন যারা দায়িত্বে ছিলেন তারাই এই কাজ করেছিলেন বলে জেনেছিলাম। যেহেতু তারা এখনো বর্তমান আছেন, তাই এই কাজ যে তাদের দ্বারাই হয়েছে তা নিয়ে সন্দেহ নেই। বনবিভাগ নতুন বনায়ন করে আর্থিক সুবিধা নিতে প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করছে, এটা হতাশাজনক।"

উল্লেখ্য, এই আগুন লাগার ঘটনায় বনবিভাগ তদন্ত কমিটি করেছে। তবে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তারাই রয়েছেন তদন্ত কমিটিতে।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ [email protected] ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.