Sylhet Today 24 PRINT

আর্ট দিয়ে অটিজমকে জয়

শাকিলা ববি |  ০২ এপ্রিল, ২০২৩

আফরোজা আক্তার লামিসা; বয়স ১৪। অটিজম আক্রান্ত শিশু সে। একদিকে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু, তারওপর চলমান আর্থিক দৈন্যের কারণে ওকে লালন পালন করাটা পরিবারের জন্য খুব স্বাভাবিক ছিল না। ওকে বড় করে তোলার জন্য অনেক সংগ্রাম করছেন লামিসার বাবা-মা। এ মেয়ের মধ্যকার সুপ্তপ্রতিভা যে তাদের অনেক উঁচুতে নিয়ে যাবে সেটা কখনো ভাবেননি তারা। ২০২২ সালে সেই কাজটিই করেছে লামিসা। গত বছরের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাংলা নববর্ষের (১৪২৯ বঙ্গাব্দ) শুভেচ্ছাকার্ডে স্থান পায় শিশু লামিসার আঁকা ছবি। লামিসা সিলেট আর্ট এন্ড অটিস্টিক স্কুলের বিশেষ বিভাগের ছাত্রী।

২০০৯ সালে সিলেট নগরীর কুমারপাড়া ঝর্ণারপাড় এলাকার পান্না বেগম ও সৈয়দ মোহাম্মদ ইমনের ঘর আলো করে জন্ম নেয় আফরোজা আক্তার লামিসা। লামিসার বাবা জানান, প্রথম সন্তান লামিসাকে নিয়ে তাদের উচ্ছ্বাসের কমতি ছিল না। কিন্তু বছর পাঁচেক যেতেই তারা বুঝতে পারেন তাদের মেয়ে অন্য বাচ্চাদের মত স্বাভাবিক না। কিন্তু তারপরও লামিসার বাবা মা তাকে মাদ্রাসা, সরকারি প্রাইমারিসহ বিভিন্ন স্কুলে লেখাপড়া করানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু কোথাও সে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারছিল না। পরে ২০২১ সালে সিলেট আর্ট এন্ড অটিস্টিক স্কুলে ভর্তি করান তাকে। লামিসা আঁকতে পছন্দ করে। প্রথম নিজে থেকেই শিখে সে। পরে সিলেট আর্ট এন্ড অটিস্টিক স্কুলে গিয়ে চারুকলা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারনা নেয়।

সাধারণত অটিজম নিয়ে মানুষের ধারনা খুবই কম। বছর দশেক আগে সিলেটেও কেউ অটিজম নিয়ে তেমন কিছু জানতেন না। ছিল না এ সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানও। তখন সিলেট জেলায় চারুকলা সংশ্লিষ্ট স্বীকৃত কোনো প্রতিষ্ঠানও ছিল না। তাই সেসময় সিলেটের শিল্পমনা কয়েকজন চারুকলা এবং অটিজমকে সমন্বয় করার চিন্তা করলেন। ২০১১ সালে সিলেটের তৎকালীন জেলা প্রশাসক খান মোহাম্মদ বিল্লালের সভাপতিত্বে সিলেট আর্ট এন্ড অটিজম ফাউন্ডেশন নামে জেলা সমন্বয় মিটিংয়ের মাধ্যমে যাত্রা শুরু হয়। জেলা প্রশাসক খান মোহাম্মদ বিল্লাল, ইসমাইল গনি হিমন, ঈশিতা রায়, প্রীতি দেব এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।

যাত্রার শুরুতেই এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে একটি অটিজম আক্রান্ত শিশুদের জন্য বিদ্যালয় এবং একটি সাধারণ শিশুদের জন্য চারুকলা বিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়। পাঁচজন শিক্ষক, ১৬ জন অটিজম আক্রান্ত শিশু নিয়ে ২০১১ সালের নভেম্বর মাসে নগরীর উপশহরে ভাড়াবাড়িতে যাত্রা শুরু করে ‘সিলেট আর্ট এন্ড অটিস্টিক স্কুল’।

সিলেট আর্ট এন্ড অটিস্টিক স্কুলে বর্তমানে শিক্ষক কর্মচারীর সংখ্যা ২৬ জন, ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা ৭৫ জন। ২০১৫ সালের বিদ্যালয়টি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ স্কুল হিসেবে স্বীকৃতি পায় এবং ২০২০ সালের বিদ্যালয়টি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ বিদ্যালয় হিসেবে এমপিওভুক্ত হয়।

সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বিকাশে বিশেষ অবদান জন্য ২০১৮ সালে জয় বাংলা অ্যাওয়ার্ড অর্জন করে এই প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে বিদ্যালয়টি কুমারপাড়াস্থ একটি সরকারি বাসায় পরিচালিত হচ্ছে। এবং বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস নগরের টিবিগেট, শাহী ঈদগাহতে চারতলার ভবন নির্মাণাধীন রয়েছে।

সিলেট আর্ট এন্ড অটিজম ফাউন্ডেশন সদস্য সচিব ইসমাইল গনি হিমন সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোরকে বলেন, আমরা একটি রোগের সাথে শিল্পের সমন্বয় করে কীভাবে ভাল কিছু করা যায় সেই চেষ্টা করছি। সিলেট আর্ট এন্ড অটিজম ফাউন্ডেশনের লক্ষ্যের অন্যটি ছিল চারুকলার বিকাশ। সে কথা মাথায় রেখে ২০২০ সালে যাত্রা শুরু করে সিলেট আর্টস কলেজ। বর্তমানে সিলেট আর্টস কলেজের বিভাগ ছয়টি। চারুকলা, সংগীত, ড্রামস, গিটার পিয়ানো তবলা এই ছয় বিভাগে ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা ৮০ জন। শিক্ষক সংখ্যা ১২ জন। সিলেট আর্টস কলেজে নিজস্ব ভবনের জন্য সিলেট সদর উপজেলায় জমি বরাদ্দ রয়েছে এক একর। সিলেট আর্ট এন্ড অটিজম ফাউন্ডেশন এর অধীনে আরও একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে যার নাম সিলেটের অকাল প্রয়াত চিত্রশিল্পী শাহ আলমের নামানুযায়ী সিলেট বিভাগের প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র আর্ট গ্যালারি ‘শাহ আলম গ্যালারি অব ফাইন আর্টস’।

ইসমাইল গনি হিমন বলেন, অটিজম আক্রান্ত শিশুর জন্য পুরো বাংলাদেশে ৭৩টি স্কুল রয়েছে। তারমধ্যে সিলেট আর্ট এন্ড অটিস্টিক স্কুল অন্যতম। প্রধানমন্ত্রীর নববর্ষের কার্ডের ডিজাইন করে সেরা হয় শিশু চিত্রশিল্পী আফরোজা আক্তার লামিসা সে অটিজম আক্রান্ত শিশু। আমাদের স্কুলের ১৬ বছরের জিজাজ ই রসুল চৌধুরী বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিশু। সে গত ২০১৭ সালে ও লেবেল আর্ট অ্যান্ড ডিজাইন, ২০২০ সালে এ লেবেল আর্ট এন্ড ডিজাইন সম্পন্ন করে। বর্তমানে সে সিলেট আর্টস কলেজে চারুকলা বিভাগে অধ্যয়নরত। তাদের মত অনেক অটিজম আক্রান্ত শিশু আমাদের স্কুলে এসে নিজেদের মত করে শিখছে, এগিয়ে যাচ্ছে।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.