জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়া, তাহিরপুর | ০৪ মে, ২০২৩
কষ্টে ফলানো সোনালী ধান বৈশাখী উৎসবের আমেজ নিয়ে ঘরে তুলেছেন সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের হাওরবাসী। হাওরপাড়ের প্রতিটি গ্রামের কৃষক পরিবারের শিশু কিশোর, বয়স্ক সবাই নতুন ফসল ঘরে তোলার আনন্দে মেতে উঠেছেন।
বৈশাখের শুরু থেকেই হাওরে পাকা বোরো ধানের মৌ মৌ গন্ধ বাতাসে। সোনালী বোরো ধানের ঘ্রাণে কৃষকের মুখে সুখের হাসি দেখা গেছে। প্রখর রোদে দিনভর ব্যস্ত সময় পার করছেন ধান কাটা, মাড়াই, ধান সিদ্ধ করা ও শুকানোর কাজে কৃষক-কৃষাণীরা। তৈরি করেছেন খলায় অস্থায়ী বসতঘর।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাওরকে ঘিরেই এই সময়টায় কৃষক ও তাদের পরিবারের সকল সদস্যের ধ্যানজ্ঞান। ছোট-বড় হাওরগুলোতে সরকারের ভর্তুকি মূল্যে হারভেস্টার মেশিনে ধান কাটায় একদিকে যেমন স্বল্প সময়ে ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে, তেমনি শ্রমিক সংকটও অনেকটাই নিরসন হয়েছে। ফলে কিছুটা লাভের আশা করছেন চাষিরা।
হাওরপাড়ের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উপজেলার শনি, মাটিয়ান হাওরসহ ছোট বড় ২৩টি হাওরে এই সময়ে গতবছর বৃষ্টি ঝড় তুফান আর পাহাড়ি ঢলের পানির চাপে বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় আশংকায় উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা বিরাজ করলেও এ বছর উল্টো। হাওরপাড়ের যে দিকে চোখ শুধু ধান কাটা মাড়াইয়ের উৎসবমুখর পরিবেশ। এবছর মেঘ মুক্ত নীল আকাশে প্রখর রোদে কষ্টে ফলানো বোরো ধান হাওরের জমি থেকে কেটে ধান শুকানোর খলায় নিয়ে এসে শুকাতে পেরে কৃষকের মুখে দেখা গেছে হাসির ঝিলিক।
এ পর্যন্ত হাওর এলাকার প্রায় ৮৫ ভাগের বেশি জমির ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। ধান সংগ্রহের পাশাপাশি চলছে গো-খাদ্য (খের) শুকিয়ে সংরক্ষণের কাজও।
মাটিয়ান হাওরের কৃষক শফিক মিয়া, রাকিব মিয়াসহ অনেকেই বলছেন, এ বছর কৃষি সংশ্লিষ্টসহ সকল পণ্যের মূল্য অতিরিক্ত ছিল। ব্যয় করতে হয়েছে অতিরিক্ত টাকা। অন্যদিকে বৈরি আবহাওয়ায় শিলাবৃষ্টি ও অতিরিক্ত গরমে আগাম জাতের ধান ২৮ নষ্ট হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অসংখ্য কৃষক। অন্যান্য জাতের ধানে বাম্পার ফলন হওয়ার কারণে কিছুটা ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় মাঠে নেমেছি।
শনির হাওরের কৃষক সাদেক আলী অভিযোগ করে বলেন, হাওরের ঝাঙ্গালগুলো (ধান পরিবহনের সড়ক) দিয়ে যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা না থাকায় কাটা ধান ট্রলি ও ঠেলাগাড়ি দিয়ে বহন করে বাড়ি নিতে গিয়ে খুবই কষ্ট করছেন কৃষকরা। হাওরের সড়কগুলো বার বার নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসলেও কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন না সংশ্লিষ্টরা। আর হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণেও দেরি হয় হয় অনিয়ম। কৃষকদের দাবি, এসব সমস্যা সরকার দুর করলে তারা চিন্তামুক্ত হয়ে হাওরের ধান ঘরে তুলতে পারবেন।
তাহিরপুর উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. হাসান উদ দোলা জানান, এবছর উপজেলার বাম্পার ফলন হয়েছে। ধান কাটা প্রায় শেষের পথে। উপজেলার স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত ফসল জাতীয় খাদ্য ভাণ্ডারে যুক্ত হয়। উপজেলায় এবার বোরো ধানের উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৭ হাজার ৪২০ হেক্টর। এতে প্রায় তিনশত কোটি টাকার ধান উৎপাদনের আশা করছি। হাওরে যে পরিমাণ ধান উৎপন্ন হয় জন প্রতি ৪৫০ গ্রাম দৈনিক হিসাবে যা সমগ্র দেশের ৩ দিনের খাবারের জোগান হয়। এবছর উপজেলায় উৎপাদিত ধানে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুনা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল জানান, এ বছর হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যা, ঝড়, তুফানসহ নানা প্রতিকূলতা আর শঙ্কা কাটিয়ে আধুনিক প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে বাম্পার ফলন হয়েছে। সোনালী বোরো ধানের ঘ্রাণ নিয়ে ফসল ঘরে তুলতে পেরে সুখের হাসি কৃষকের মুখে।