Sylhet Today 24 PRINT

কষ্টার্জিত অর্থে প্রতিষ্ঠিত করা সেই সন্তানদের কাছে বাবা আজ বোঝা!

বড়লেখা প্রতিনিধি: |  ২৩ মে, ২০২৩

দুবাই ও যুক্তরাষ্ট্র মিলিয়ে দীর্ঘ ২৫ বছর প্রবাস জীবন কেটেছে রইয়ব আলীর। প্রবাস জীবনের রোজগারের সকল অর্থে প্রথম পক্ষের স্ত্রী-সন্তানদের ভরণপোষণ, বাড়ি তৈরি, সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করার পাশাপাশি জমিজমা কিনেছেন। ছোট দুই ছেলেকে জমি বিক্রি করে পাঠিয়েছেন ফ্রান্সে। বড় ছেলের পেছনে অর্ধকোটি টাকা ব্যয় করেছেন। তখন স্ত্রী-সন্তানের কাছে তার মূল্যায়ন ছিল। স্বপ্ন ছিল শেষ বয়সে সন্তানরা তার ভরসার আশ্রয়স্থল হবে। তবে এ স্বপ্ন ফিকে হয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে অসুস্থ হয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরলে। দেশে ফেরার কয়েক বছরের মধ্যে রইয়ব আলী নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হন। বুঝতে পারেন, এতদিন স্ত্রী-সন্তানদের কাছে মূল্যায়ন ছিল শুধু টাকার জন্য। এখন টাকা না থাকায় প্রথম পক্ষের স্ত্রী-সন্তানদের কাছে তিনি নিগৃহীত হচ্ছেন। বড় ছেলে রইয়ব আলীকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তার দ্বারা নির্যাতন ও মামলায় হয়রানির শিকার হচ্ছেন হতভাগ্য এই বাবা।

অমানবিক এই ঘটনাটি ঘটেছে মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নে। ভুক্তভোগী রইয়ব আলী ওই ইউনিয়নের বাদেপুকুরিয়া গ্রামের মৃত ছইদ আলীর ছেলে।

সম্প্রতি রইয়ব আলী বড় ছেলে আলী হোসেন (৩৩) ও তার স্ত্রী (ছেলের) ফরিদা বেগমকে (২৮) আসামি করে বড়লেখা সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেছেন।

মামলার বিষয়টি মঙ্গলবার (২৩ মে) বিকেলে নিশ্চিত করেছেন বাদী পক্ষের আইনজীবী ইয়াছিন আলী।

তবে বাবার এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত ছেলে আলী হোসেন। তিনি মুঠোফোনে বলেন, ‘বাবাই আমাদের সম্পত্তি থেকে বিতাড়িত করতে চাচ্ছেন। এনিয়ে স্থানীয় চেয়ারম্যানসহ এলাকার লোকজন একাধিক শালিস করেছেন। কিন্তু বাবা আমাদের সম্পত্তি দিতে চাচ্ছেন না। নির্যাতনের বিষয়টি সঠিক নয়,’ যোগ করেন আলী হোসেন।

মামলা ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রইয়ব আলী ১৯৮৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যের দুবাই রাষ্ট্রে গিয়ে সেখানে প্রায় ১৪ বছর উপার্জন করে প্রথম পক্ষের স্ত্রী-সন্তানদের ভরণপোষণ, সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যয় করেন। এরইমধ্যে দুবাই থাকাকালীন একজন শ্রীলঙ্কান নারীর আর্থিক সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সুযোগ সামনে আসে রইয়ব আলীর। বিষয়টি নিয়ে তিনি তার পরিবারের অর্থাৎ প্রথম পক্ষের স্ত্রী ও সন্তানদের সাথে পরামর্শ করেন। এতে শ্রীলঙ্কান নারীকে বিয়ে করার জন্য প্রথম পক্ষের স্ত্রী মতামত দেন। এরপর শ্রীলঙ্কান নারীকে বিয়ে করে বাংলাদেশে পাঠান এবং তার (শ্রীলঙ্কান নারীর) টাকায় যুক্তরাষ্ট্রে যান রইয়ব আলী। সেখানে (যুক্তরাষ্ট্রে) থাকেন আরও প্রায় ১১ বছর।

যুক্তরাষ্ট্রে থাকাকালে রইয়ব আলী তার প্রথম পক্ষের স্ত্রীর বড় ছেলে আলী হোসেনকে ২০০৪ সালে প্রায় ৫ লক্ষাধিক টাকা ব্যয় করে দুবাই পাঠান। সেখানে গিয়ে আলী হোসেন তারই গ্রামের এক ব্যক্তিকে ছুরিকাঘাত করে গুরুতর আহত করেন। এ ঘটনায় সেখানে তার ১৪ বছরের সাজা হয়। পরবর্তীতে রইয়ব আলী ২০ লাখ টাকা ব্যয় করে আহত ব্যক্তির পরিবারের সাথে সমজোতায় আইনজীবীর মাধ্যমে অব্যাহতি করে বড় ছেলে আলীকে দেশে ফেরত আনান। ২০০৭ সালে পুনরায় ৫ লাখ টাকা ব্যয় করে তাকে কাতার পাঠান। সেখান থেকে দুই বৎসর পর দেশে ফিরে আসেন।

এরপর চাপ প্রয়োগ করে বাবার কাছ থেকে আরও ১০ লাখ টাকা দিয়ে ডিলারশিপ ব্যবসা শুরু করেন। এই ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হলে বাবা আরও ৬ লাখ টাকা দিয়ে সিএনজি চালিত অটোরিকশা কিনে দেন। এভাবে প্রায় অর্ধকোটি টাকা তার বড় ছেলের পেছনে ব্যয় করেন।

এরপর ২০১০ সালে অসুস্থ হয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে স্থায়ীভাবে দেশে ফেরার কয়েক বছরের মধ্যে রইয়ব আলীর ওপর প্রথম পক্ষের স্ত্রী ও সন্তানের অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চলতে থাকে। লোকলজ্জার ভয়ে তিনি বিষয়টি গোপন রাখেন। এরই মধ্যে তার ছোট ২ ছেলেকে (প্রথম পক্ষের) প্রায় ৮ বিঘা জমি বিক্রি করে ফ্রান্সে পাঠান। কিন্তু সেই ছেলেরাও প্রতিষ্ঠিত হয়ে তার দিকে আর ফিরেও থাকাচ্ছে না। তার প্রথম স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে একই বাড়িতে পৃথক ঘরে থাকেন।

এ অবস্থায় এক সময়ের আর্থিকভাবে স্বচ্ছল জীবন কাটানো রইয়ব আলী পড়ে যান জীবন-জীবিকার সংকটে। আর্থিক টানাপোড়নে লজ্জায় না পারছেন কারো কাছে হাত পাততে, না পারছেন কাজ করতে। এক পর্যায়ে জীবিকার দায় মেটাতে স্থানীয় বাজারে মশলা গুড়ো করার (ভাঙা) মেশিন কিনে দোকান দেন। এই প্রতিষ্ঠানের আয়ে কোনোমতে তার সংসার চালান।

তবে বড় ছেলে নানাভাবে নির্যাতন ও মামলা দিয়ে হয়রানি করে। এরকম একটি মামলায় সম্প্রতি দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীসহ গ্রেপ্তার হন রইয়ব আলী। পরে আদালত থেকে জামিন নেন। এমন পরিস্থিতিতে নিরূপায় হয়ে বড় ছেলে ও তার স্ত্রীর নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পেতে আদালতে সম্প্রতি মামলা করেন। ইতিপূর্বে ২০১৪ ও ২০১৬ সালে ছেলের নির্যাতন থেকে রক্ষা পেতে ২টি মামলা করেন রইয়ব আলী। পরে স্থানীয়ভাবে আপোষ মিমাংষায় নিজেই ছেলেকে ছাড়িয়ে আনেন।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.