Sylhet Today 24 PRINT

‘বন্যার কথা মনে হলে মন চায় হাউমাউ করে কাঁদি’

ভয়াবহ বন্যার এক বছর

ইয়াকুব শাহরিয়ার, শান্তিগঞ্জ |  ১৬ জুন, ২০২৩

‘বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত। পাগলার দক্ষিণের হাওরে (পাখি হাওর) পানি আর পানি। দখিনা বাতাসে আফালের প্রচণ্ড গর্জন। ঘরে পানি ঢুকবে কল্পনাও করিনি। রাত ৯/১০টার দিকে প্রতিদিনের মতো ঘুমিয়ে পড়ি। ১টা থেকে ঘরে পানি ঢুকতে শুরু করে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ি। কী করবো। বাড়িতে পুরুষ লোক নেই। একটিমাত্র কিশোর ছেলে। ঘরে প্রতিবন্ধী ছোট বোন। প্রবল গতিতে বাতাস বইছে, সেই সাথে আফালের কী আস্ফালন! ভাঙা ঘরের পূর্ব ও দক্ষিণের বেড়া ততক্ষণে তছনছ হয়ে গেছে। ঘরের পানি হাঁটুর সমান হয়ে যাচ্ছে। একটি কক্ষেই তিনটি চৌকি, রান্না ঘর। ঢেউয়ে সব কিছু এলোমেলো করে ফেলেছে। আমার কান্না চলে এসেছে। আল্লাহকে ডাকছি আর চিৎকার করে কান্নাকাটি করছি। বৃষ্টি-বাতাসে আমাদেরকে অসহায় করে দিয়েছিল। সেদিন মনে হয়েছিল আর বাঁচবোই না। পাশের এক আত্মীয় রাতের আঁধারে আমাদের বের করে নিয়ে যান তার বাড়িতে। সব কিছু ফেলে জান নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলাম। সকালে দেখি ঘরের চালের সাথে পানি। ঘরের কোনো বেড়াই নেই। চৌকি, মিসরিব (কাপড়, কাপ-পিরিচ রাখার বাক্স বিশেষ), কলস, হাঁড়ি-পাতিল কোনো কিছুই নেই। কয়েকটি ভাঙা বাঁশের উপর কোনো ক্রমে ঘরের চালটি দাঁড়িয়ে আছে।’

এভাবেই গত বছরের বন্যার বিভীষিকাময় দিনের বর্ণনা দিচ্ছিলেন মধ্যবয়সী বিধবা গৃহকর্মী সোহেনা বেগম। তিনি বলেন, সেসব দিন-রাতের কথা মনে হলে মন চায় হাউমাউ করে কাঁদি। শরীরে কাঁপন ধরে; ভাবলেই লোম দাঁড়িয়ে যায়। আর কখনো এমন দিন দেখার কল্পনাও করতে পারেন না তিনি। তবে, যখন আকাশে মেঘ জমে, হাওরে পানি প্রবেশের খবর শোনা যায় তখন মলিন হয়ে উঠে তার মুখ। এমন দুর্বিষহ দিন দেখতে চান না আর।

তিনি জানান, বন্যার পর একসপ্তাহ পরে যখন বাড়িতে এসেছেন তখন তার আর কোনো কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। যে চাল দাঁড়ানো ছিল বন্যা পরবর্তী তুফানে সে চালও উপড়ে গিয়েছিল৷ আত্মীয়দের সহায়তায় কোনোক্রমে চালকে টিকিয়ে রেখেছিলেন তিনি। এমন দুরূহ দিনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় সরকারিভাবে ১০ হাজার টাকা আর্থিক সহযোগিতা পেয়েছিলেন তিনি। এই টাকা তার জন্য ‘সাঁতারে জিরিয়ে নেওয়ার’ মতো কাজ করেছিলো। সে টাকায় কিছু টিন, বাঁশ কিনে আনেন। পরে শ্রমিক ধরে কোনো রকমে ঘরকে দাঁড় করিয়েছিলেন। ১০ হাজারে সম্পূর্ণ কাজ না করাতে পারলেও ঘরের চাল ঠিক করিয়েছিলেন। চারপাশের বেড়া তিনি ছালা দিয়ে ঢেকে দিয়েছেন। বাকি টাকার ব্যবস্থা করতে না পেরে এখনো বসবাস করছেন ছালার বেড়ার ঘরে।

সোহেনা বেগম শান্তিগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের ব্রাহ্মণগাঁও গ্রামের বাসিন্দা। তার স্বামী রমিজ আলীকে হারিয়েছেন ৬ বছর আগে। একমাত্র সন্তান শান্তিগঞ্জের একটি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পড়ছেন। মানুষের বাসায় বাসায় কাজ করে টেনেটুনে কোনো রকমে চলছে তার দুঃখের সংসার। শারীরিক প্রতিবন্ধীত্বের কারণে ছোট বোন সেলু বেগম (৩৫) আজও অবিবাহিত রয়ে গেছেন।

গত বন্যার চিরধরা দুঃখের এমন ইতিহাস আর লোমহর্ষক অভিজ্ঞতা শুধু সোহেনা বেগমেরই নয়। শান্তিগঞ্জ উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের এমন শতাধিক সোহেনা বেগমরা আছেন যাদের ২২-এর বন্যা এখনো দুর্বিষহ স্মৃতি। কত সম্পদ, ঘরবাড়ি, আত্মীয় আর সন্তান সমতুল্য গৃহপালিত পশুকে হারানোর স্মৃতি স্মরণ করে আজও ভিতরে ভিতরে কাঁদের অনেক কৃষক। ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও ঘাস আর রাখার জায়গার অভাবে পানির দরে বিক্রি করতে হয়েছিল প্রিয় গরুকেও। ঘরের বাইরে বেরোয়নি যে কিশোরী তাকে নিয়েও রাস্তার ধারে দিনরাত্রি যাপন করতে হয়েছে মা-বাবার। কত মসজিদ মন্দির আশ্রয়স্থান হয়েছে হাজারো মানুষের তার কোনো হিসাব নেই। একমুঠো চালও যিনি ধার করে খাননি কখনো তাকেও নিতে হয়েছে অন্যের ত্রাণ।

এতদিন বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠেও বৃষ্টি ছিলো না। গত বছরের এই দিনে সুনামগঞ্জ জেলা পুরোপুরিভাবে প্লাবিত হয়ে যায়। তার এক বছর পূর্তির দিনেও পাহাড়ি ঢল আর বৃষ্টিপাতে পানি বাড়ছে জেলার নদ নদীগুলোতে। এতে জনসাধারণের মুখ মলিন হচ্ছে, বাড়ছে চিন্তা। কেউ কেউ মনে মনে প্রস্তুতি নিয়ে রাখছেন বন্যা মোকাবিলার। অধিকাংশজনেই বিষয়টিকে ছেড়ে দিয়েছেন ভাগ্যের উপর। তবে দুশ্চিন্তা আছে সকলের।

পশ্চিম বীরগাঁও ইউনিয়নের কৃষক আবদুর রহিম জানান, আমরা হাওরাঞ্চলে থাকি। বন্যার সাথে আমাদের পুরনো সম্পর্ক৷ বন্যাকে মোকাবিলা করেই বেঁচে আছি। তবে, ২০২২ সালের মতো বন্যা কখনোই আশা করি না। গত বছরের কষ্টের দিনের কথা মনে হলে গায়ে কাটা দেয়।

এ প্রতিবেদন তৈরি করতে উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের একাধিক বাসিন্দাদের সাথে কথা হয় প্রতিবেদকের। এমন দুর্বিষহ দিন দেখতে চান না কেউই। তবে তাদের দাবি, যদি এমন দিন আসেও তাহলে সরকারি ভাবেই হোক কিংবা ব্যক্তিগত অথবা সাংগঠনিক। যারাই মানুষের পাশে সহযোগিতার উদ্দেশ্যে দাঁড়াবেন তারা যেন গ্রামের ভিতরে প্রবেশ করেন। রাস্তার ধারে বা আশপাশে যারা থাকেন তাদেরকে যে কেউই সহযোগিতা করেন কিন্তু যারা গ্রামের ভিতরে আশ্রিত থাকেন তাদেরকে কেউ সহযোগিতা করেন না। তাদের কথাও যেন মাথায় রাখা হয়। তবে, কেউই এমন দিন দেখতে চান না।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.