নিজস্ব প্রতিবেদক | ১৯ জুন, ২০২৩
দীর্ঘদিন ঘরোয়া পরিবেশে সভা-সমাবেশ করতে গিয়ে পুলিশের বাধার মুখে পড়ত জামায়াতে ইসলামী। তবে সম্প্রতি এই দৃশ্যপট পাল্টেছে। বিশেষ করে রাজধানীতে ১০ জুনের সমাবেশের পর থেকে তারা অনেকটা ফুরফুরে মেজাজে আছেন। সারাদেশের মতো সিলেটেও এখন স্বস্তিতেই জামায়াত।
আগামী ২১ জুন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) নির্বাচন। এ সিটির নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে জামায়াতের বেশকিছু নেতাকর্মী অংশ নিয়েছেন। আর তারা অনেকটা ‘চাপমুক্ত’ পরিবেশেই তাদের প্রচার-প্রচারণা চালাতে পেরেছেন এবং পারছেন।
তবে এই বিষয়টিই কিছুটা হলেও অস্বস্তি আর বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের।
সিলেট বাধাহীন প্রচারণার সুযোগে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক দলীয় প্রার্থী বিজয়ী হওয়ার আশা করছে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন বাতিল হওয়া দলটি। নগরীর ৪২টি সাধারণ ওয়ার্ড ও সংরক্ষিত ১৪টি ওয়ার্ডে জামায়াতের অন্তত ২৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন।
সিলেট নগরের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী হয়েছেন জামায়াতের সায়ীদ মো. আব্দুলাহ। তার অভিযোগের ভিত্তিতে ওই ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর আফতাব হোসেন খানের প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। সম্প্রতি সায়ীদের বাসার সামনে সশস্ত্র মহড়া দেওয়ার অভিযোগে প্রার্থিতা হারান মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি আফতাব। গত ৬ জুন নৌকার মেয়র প্রার্থী আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর পোস্টার নিয়ে যাওয়ার সময় আফতাবের কর্মী শাহানুরকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। সে ঘটনায় কাউন্সিলর প্রার্থী সায়ীদসহ জামায়াতের ৯৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা হলেও পুলিশ মাত্র দুজনকে গ্রেপ্তার করে। অভিযুক্তদের অধিকাংশ সায়ীদের প্রচারে মাঠে তৎপর রয়েছেন।
চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিএনপি ভোট বর্জনের পাশাপাশি নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলীয় নেতাকর্মীদের আজীবনের জন্য বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে বিএনপির দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী জামায়াত প্রথম থেকেই উল্টো পথে হেঁটেছে। প্রকাশ্যে মেয়র পদে নির্বাচন বর্জনের কথা বললেও কাউন্সিলর পদে দলীয় প্রার্থীদের নানাভাবে সহযোগিতা করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মহানগর জামায়াতের একজন নেতা বলেন, যেসব ওয়ার্ডে দলীয় প্রার্থী কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, সেসব ওয়ার্ডে নিজস্ব কর্মীবাহিনী প্রচারে রয়েছে। এ ছাড়া ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতারা সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির দায়িত্ব পালন করছেন।
এক দশক পর রাজধানীতে জামায়াতের সমাবেশ রাজনৈতিক মহলে আলোচিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে সিসিক নির্বাচনে তাদের নেতাকর্মীদের পুলিশি হয়রানি বন্ধের নেপথ্যেও এরই প্রভাব বলে মনে করেছেন দলটির স্থানীয় নেতারা। যদিও প্রকাশ্যে বিষয়টিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতির প্রভাবের কথা বলছেন। নগরীর ১০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী জামায়াত নেতা মো. আব্দুল হাকীম বলেন, এখন পর্যন্ত তারা পুলিশের কোনো হয়রানির শিকার হননি।
জামায়াত নেতাদের মধ্যে নগরীর ২ নম্বর ওয়ার্ডে সাবেক কাউন্সিলর রাজিক মিয়া, ৭ নম্বর ওয়ার্ডে সায়ীদ মো. আব্দুল্লাহ, ১০ নম্বর ওয়ার্ডে মো. আব্দুল হাকীম, ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে বর্তমান কাউন্সিলর আব্দুল মুহিত জাবেদ, ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে বর্তমান কাউন্সিলর সুহেল আহমদ রিপন, ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে সাবেক কাউন্সিলর আব্দুল জলিল নজরুল, ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে মো. সুহেল রানা, ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডে মঞ্জুর রহমান ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ডে মঞ্জুর আহমদ নির্বাচন করছেন। এদের মধ্যে রাজিক মিয়া ও আব্দুল মুহিত জাবেদকে কৌশলগত কারণে তারা সরাসরি দলীয় প্রার্থী হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন মহানগর জামায়াতের একজন নেতা।
নগরীর আরও কয়েকটি সাধারণ ও সংরক্ষিত ওয়ার্ডে দলীয় প্রার্থীর বিষয়ে গোপনীয়তার কৌশল নিয়েছে জামায়াত। সব মিলে তাদের দলীয় ২৫ জনের মতো নেতা নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেন মহানগর জামায়াতের দায়িত্বশীল এক নেতা।
চাপমুক্তভাবে তিনি নির্বাচনী প্রচার চালাতে পারার বিষয়টি স্বীকার করেছেন নগরীর সবচেয়ে আলোচিত ৭ নম্বর ওয়ার্ডের জামায়াতের প্রার্থী সায়ীদ মো. আব্দুল্লাহ।
তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে প্রতিদ্বন্দ্বী কাউন্সিলর প্রার্থী আফতাবের প্রার্থিতা বাতিল হওয়ার পর ভয়ের পরিবেশ অনেকখানি কেটে গেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। জাতীয় পর্যায়ের প্রভাব ভোটের মাঠে পড়েছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে জাতীয় রাজনীতির প্রভাব পড়তে সময় লাগে। বিদেশিদের চাপে সরকার হয়তো নির্বাচনী পরিবেশ ভালো দেখানোর চেষ্টা করছে। তবে সার্বিকভাবে তার কর্মী-সমর্থকরা স্বস্তিতে আছেন বলে জানান সায়ীদ।’
এ বিষয়ে মহানগর জামায়াতের আমির মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘স্থানীয়দের চাপে ও ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতার কারণে অনেকে প্রার্থী হয়েছেন। তবে তাদের সঙ্গে দলের সম্পৃক্ততা নেই।’